প্রেম যা দেয়, তার চেয়ে আরও নাকি বেশি কেড়ে নেয়’—হাসানের জনপ্রিয় গানের এই লাইনটি আজও অনেকের মুখে মুখে ফেরে। প্রেমে পড়লে মানুষ বদলে যায়, এমন কথাও বন্ধুদের আড্ডায় প্রায়ই শোনা যায়।কেউ বলে, প্রেম মানুষকে পরিণত করে, কেউ আবার মনে করেন, প্রেম মানুষকে নিজের জগত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু মনোবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, প্রেমের প্রভাব শুধু অনুভূতিতে নয়, আচরণেও পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রেমে পড়লে তরুণ-তরুণীদের আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। শুধু তাই নয়, অনেক নেতিবাচক অভ্যাস থেকেও তারা দূরে সরে আসতে পারে।
প্রেমে বদলে যায় আচরণ
ফ্লোরিডা আটলান্টিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ব্রেট লরসেন ও তার সহযোগীরা ৬৬২ জন কিশোর ও তরুণ এবং ৫৭৪ জন কিশোরী ও তরুণীর ওপর সমীক্ষা চালান। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে মনোবিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ডেভেলপমেন্টাল সাইকোলজিতে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রেমে পড়ার পর তরুণ-তরুণীরা সম্পর্ককে আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে শেখে। তারা দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং একে অপরকে বোঝার চেষ্টা বাড়ায়। সম্পর্কের প্রতি এই মনোযোগ তাদের ব্যক্তিত্বের বিকাশেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বন্ধুদের সঙ্গে দূরত্ব কেন?
প্রেমে পড়ার পর বন্ধুদের অভিযোগও নতুন নয়, ‘আগের মতো সময় দিস না! গবেষণাও বলছে, এই অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি রয়েছে।
বয়ঃসন্ধিকালে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ স্বাভাবিক একটি মানসিক ও জৈবিক প্রক্রিয়া। ফলে এই সময়ে প্রেমিক বা প্রেমিকাকে ঘিরেই আবর্তিত হতে থাকে অনেকের ভাবনা। তাদের সঙ্গে সময় কাটানো, সম্পর্ককে আরও গভীর করা কিংবা তাদের মুগ্ধ করার চেষ্টাই হয়ে ওঠে অগ্রাধিকার। এতে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ কিছুটা কমে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
বদঅভ্যাস ছাড়তেও সাহায্য করে প্রেম
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সুস্থ ও ইতিবাচক সম্পর্ক অনেকের জীবনযাত্রায় ভালো পরিবর্তন আনতে পারে।
প্রেমিক বা প্রেমিকার পরামর্শ, উৎসাহ কিংবা কখনো মতবিরোধের মধ্য দিয়েও অনেকেই নিজের ক্ষতিকর অভ্যাস নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রেমের সম্পর্কে রয়েছে, তাদের মধ্যে মাদকাসক্তির প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম। অর্থাৎ একটি ইতিবাচক সম্পর্ক মানুষকে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের দিকেও উৎসাহিত করতে পারে।
প্রেম শুধু আবেগ নয়, শেখারও একটি অধ্যায়
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, কৈশোর ও তারুণ্যের প্রেম অনেক সময় ব্যক্তিত্ব গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই সময় মানুষ বিশ্বাস, দায়িত্ব, সহমর্মিতা, সমঝোতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো বাস্তব জীবনে অনুশীলনের সুযোগ পায়। যদিও সব সম্পর্ক সফল হয় না, তবু প্রতিটি সম্পর্কই কিছু না কিছু অভিজ্ঞতা দিয়ে যায়।
প্রেম মানুষকে কাঁদায়, আবার হাসায়ও। কখনো কাছের মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়, আবার কখনো নিজেকেই নতুন করে চিনতে শেখায়। তাই প্রেমকে শুধু হারানোর গল্প কিংবা শুধু পাওয়ার গল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সঠিক সম্পর্ক মানুষকে আরও পরিণত, দায়িত্বশীল এবং ইতিবাচক মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করতে পারে। হয়তো তাই বলা যায় প্রেম শুধু হৃদয়ের বিষয় নয়, এটি মানুষকে বদলে দেওয়ারও এক নীরব শক্তি।