ঢাকা হতে পারতো ভেনিস-আমস্টারডামের মতো ভাসমান স্বর্গ নগরী

ঢাকা হতে পারতো ভেনিস-আমস্টারডামের মতো ভাসমান স্বর্গ নগরী

ইতালির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ভেনেতো অঞ্চলের রাজধানী ভেনিস ১১৮টি ছোট দ্বীপের উপর দাঁড়িয়ে আছে। খালের বিস্তারের জন্য বিশ্বজুড়ে ভেনিসকে ‘ভাসমান শহর’ হিসেবে পরিচিত করে তোলে।কোনো মোটরচালিত যানবাহন বা গাড়ি এই শহরে নেই। শহরের ভেতরে যাতায়াত ও ভ্রমণের জন্য একমাত্র বাহন হলো নৌকা।কাঠের নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ানো সেখানকার পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডামকেও খালের জন্য উত্তরের ভেনিস বলা হয়ে থাকে। 

আকাশের বুক চিরে যখন মেঘের ডাক শোনা যায়, ভেনিস বা আমাস্টারডামের মতো পৃথিবীর বহু শহরে তখন নেমে আসে প্রশান্তি। কিন্তু ঢাকার বুকে মেঘ জমলেই মলিন হয়ে যায় দুই কোটি মানুষের মুখ।একটু ভারী বৃষ্টি হলেই রাজপথ পরিণত হয় নদীতে, আর অলিগলি হয়ে ওঠে মরণফাঁদ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থবির হয়ে থাকা যানজট, বিকল যানবাহন, বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর ঘরবন্দি মানুষের অসহায়তায় ঢাকার বুক থেকে বেরিয়ে এক করুণ দীর্ঘশ্বাস। বছরের পর বছর একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটলেও জলাবদ্ধতার অভিশপ্ত চক্র থেকে মুক্তি মেলেনি। গত ১৭ বছরের তথাকথিত ও স্বেচ্ছাচারী ‘উন্নয়নের’ জোয়ারের পরও কেন বারবার ভেসে যাচ্ছে ঢাকা, তা এখন কোটি টাকার চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল বর্ষা এলে ড্রেন পরিষ্কার করা বা নতুন নালা নির্মাণ করলেই এ সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রাকৃতিক জলাধার, খাল ও জলধারণক্ষম এলাকা রক্ষা না করলে ঢাকার জলাবদ্ধতা ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।

ঢাকার ভৌগলিক পরিচিতি বা এর ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চারিদিকে নদী আর ভেতরে ছোট-বড় বেশ কিছু খাল এই শহরকে পুরো একটি ভাসমান শহরে রূপ দেওয়ার সকল আয়োজন নিয়েই বসে ছিল। কিন্তু অবহেলা, অবৈধ দখলদারিত্ব, অব্যবস্থাপনায় মরে গেছে অনেক খাল। 

সেসব খালের তথ্য ও পরিমাপ সঠিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারের ভিন্ন ভিন্ন দপ্তরে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য। অনেক গবেষক বলছেন, ঢাকায় ৬০-৬৫টির বেশি খাল ছিল। যা এখন ৩০টিতে নেমে এসেছে। 

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিগত এক দশকে ঢাকা ওয়াসা এবং ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ দুই সিটি করপোরেশন নালা নির্মাণ, নর্দমা সংস্কার, খাল পরিষ্কার ও জলাবদ্ধতা নিরসনের বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় করেছে অন্তত ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। খাল উদ্ধারে ৫ বছরে দুই সিটির ব্যয় ১ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা আর জলাবদ্ধতা নিরসনে ৬ বছরে দুই সিটির বরাদ্দ ৭০৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এত বিপুল পরিমাণ টাকা খরচের পরও বর্ষা এলেই ঢাকাকে এক আদিম ও মধ্যযুগীয় ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয়। নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পের সংখ্যা বাড়লেও সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব, রক্ষণাবেক্ষণের চরম দুর্বলতা এবং প্রাকৃতিক জলাধার হারিয়ে যাওয়ার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।

গত শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রবিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মাত্র ২৪ ঘণ্টায় রাজধানী ঢাকায় রেকর্ড ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির তোড়ে ঢাকা যেন এক সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ ও জলমগ্ন দ্বীপে পরিণত হয়। এর আগে ঢাকার ইতিহাসে এই ধরনের প্রলয়ংকরী বৃষ্টিপাত সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল ২০০৯ সালের ২৮ জুলাই, যখন এক দিনে প্রায় ৩৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। এছাড়া ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসেও এক দিনে ৩৪১ মিলিমিটার বৃষ্টির নজির রয়েছে। ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, ২০০৪ বা ২০০৯ সালের সেই রেকর্ড বৃষ্টিপাতেও ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গিয়েছিল। তবে তখনকার ঢাকার সাথে ২০২৬ সালের ঢাকার মূল পার্থক্য হলো-তখন শহরের কল্যাণপুর বা ডেমরার জলধারণ এলাকা (রিটেনশন পন্ড) এবং বেশ কিছু খালের অস্তিত্ব টিকে ছিল, যা প্রাকৃতিকভাবে পানি টেনে নিয়েছিল। কিন্তু বিগত ১৭ বছরে প্রজেক্টের নামে হাজার কোটি টাকা খরচ করা হলেও খালের ওপর বক্স কালভার্ট বসিয়ে সেগুলোকে মেরে ফেলা হয়েছে এবং প্রাকৃতিকভাবে জল ধরে রাখার সমস্ত জলাশয় ভরাট করে বহুতল ভবন তোলা হয়েছে। ফলে ২০০৯ সালের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত (১৭৫ মিলিমিটার) হওয়া সত্ত্বেও, ড্রেনেজ ক্যাপাসিটি ধসে পড়ায় ২০২৬ সালের এই ঢাকা বহু গুণ বেশি সময় ধরে পানির নিচে হাবুডুবু খেয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মোহাম্মদ খান বাংলানিউজকে বলেন, ‘ঢাকার জলাবদ্ধতার অনেকগুলো কারণের মধ্যে মূল কারণ হচ্ছে—১৯৯৫ সালে ঢাকার স্ট্রাকচার প্ল্যান তৈরি করা হলেও সেই অনুযায়ী ঢাকাকে গড়ে তোলা হয়নি। সেই প্ল্যানে ঢাকার কোথায় জল ধারণের এলাকা থাকবে, কোথায় ওয়াটার রিটেনশন পন্ড থাকবে, খালগুলো কীভাবে সংরক্ষণ করতে হবে, তার বিশদ পরিকল্পনা দেওয়া ছিল। সেই পরিকল্পনা মাফিক যদি ঢাকা গড়ে উঠতো, তাহলে ঢাকার আজকের এই দুরবস্থা দেখা লাগতো না।’

তিনি আরও বলেন, ২০১০ সালে ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) তৈরি হয়, কিন্তু তখনও সেই সেই প্ল্যানগুলোকে বাস্তবায়নের আগ্রহ দেখা যায়নি। বরং এই প্ল্যানগুলোকে ভায়োলেশন (লঙ্ঘন) করে ঢাকার আশেপাশে এবং ঢাকার ভেতরে অনেক ধরনের প্রকল্প গড়ে উঠেছে—আবাসন প্রকল্প, সরকারি দপ্তর, সরকারি প্রকল্প এবং এর বাইরেও ব্যক্তি পর্যায়ে অনেকে খাল দখল করেছে, নদী দখল করেছে। দীর্ঘদিন সরকারের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়েই দখলদাররা সক্রিয় হয়েছে এবং প্ল্যানগুলো ধীরে ধীরে মারা গিয়েছে। এখনও ঢাকার ২০২২ সালে যে প্ল্যানটা করা হয়েছে, সেটাকেও তিন বছরের মধ্যে দুইবার কাটাকুটি করা হলো ব্যবসায়ীদের চাপে। তাহলে বারবার যদি প্ল্যানকে ভায়োলেশন করা হয়, প্ল্যানে যে সবুজ এলাকা, পরিবেশ সংরক্ষণ করার কথা বলা হয় সেটা যদি আমরা রক্ষা না করতে পারি, তাহলে ঢাকার সামনের দিনগুলোতে আরো দুরবস্থা দেখতে হবে।

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, এখনই ঢাকার পুরাতন প্ল্যানগুলো কেন ব্যর্থ হলো তার ‘ময়নাতদন্ত’ করা দরকার। সে তদন্তে বেরিয়ে আসবে কেন আমরা ঢাকার এই ওয়াটার বডি, খাল নেটওয়ার্ক, ওয়াটার ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক রক্ষা করতে পারিনি এবং সেটার ওপর ভিত্তি করে দোষীদের শাস্তি দিতে হবে। পাশাপাশি দ্রুতগতিতে পুরো ঢাকার জন্য একটা ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান তৈরি করতে হবে, যেটা হবে রাজধানীর যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনার মূল ভিত্তি। বিচ্ছিন্নভাবে শত শত কোটি টাকার প্রজেক্ট নিয়ে ঢাকা শহরকে আর বাঁচানো যাবে না। নিজেদের নদীগুলো আমরা ক্রমাগত দখল ও দূষণ করেছি, জলাধার ধ্বংস করেছি। তারপরেও এখন যেই জলাধারগুলো আছে সেগুলোকে রক্ষা করার সর্বোচ্চ প্রাধিকার দরকার। পাশাপাশি আমাদের যে মিসিং লিংকগুলো তৈরি হয়েছে—যেখানে খালের ওপর বসতবাড়ি হয়েছে, যেখানে সম্ভব সে মিসিং লিংকগুলোকে রি-ইস্টাবলিশ (পুনঃস্থাপন) করা দরকার।

নৌ-যোগাযোগের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি বলেন, ঢাকার চারদিকে যে নদী আছে, সেগুলোর নৌ যোগাযোগটা যদি আমরা সচল করি তবে তা ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল করার একটা বড় অংশ হতে পারে। নৌ-বেজড যে ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম, সেটা কাজ করার সম্ভাবনা হাতিরঝিলের মাঝখানে দেখা গিয়েছে। সরকারের ল্যান্ড ইউজ পরিকল্পনার সাথে যখন উন্নয়নের সম্পর্ক থাকবে না, তখন ধীরে ধীরে আমরা আরো তলানিতে যাবো। এজন্য রাজউক যে পরিকল্পনাটা করছে, সেটা যেন সরকারি অন্যান্য সংস্থাও ওন (স্বীকার) করে, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।

নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ১৯৯৫ সালে ঢাকা শহরে খাল ছিলো প্রায় ৬০টি, এখন আছে ৩০টির মতো। তার মতে, হাতিরঝিল থেকে ধানমন্ডি কিংবা বারিধারা পযর্ন্ত বিস্তৃত করার পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে। যেসব জায়গায় বক্স কালভার্ট করা হয়েছে সেগুলো কস্ট ইফেকটিভ বিবেচনায় ওভার পাস করে রাস্তা করা যেতে পারে। তাতে নৌ চলাচল নির্বিঘ্ন হবে এবং যানবাহনের উপর চাপ কমবে। যানজট নিরসনে ভূমিকা রাখবে।

আবার ফিরে আসা যাক ভেনিস-আমস্টারডামের দিকে। নগর পরিকল্পনায় পানির সর্বোচ্চ ও নান্দনিক ব্যবহার কেমন হতে পারে, তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ ইউরোপের নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম এবং ইতালির ভেনিস নগরী। আমস্টারডাম শহরটি মূলত ১৬৫টিরও বেশি খালের এক বিশাল জালের ওপর দাঁড়িয়ে, যা তাদের মূল যাতায়াত ব্যবস্থা ও পানি নিষ্কাশনের প্রধান চালিকাশক্তি। অন্যদিকে, ভেনিসের বুক চিরে বয়ে চলা ‘গ্র্যান্ড ক্যানেল’এবং অসংখ্য শাখা খাল পুরো শহরকে একটি ভাসমান স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে, যেখানে সড়ক পথের চেয়ে জলপথই প্রধান। এই দুই শহরে খালগুলো কেবল পানি সরানোর নালা নয়, বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, পর্যটন ও কোটি কোটি ডলারের নৌ-যোগাযোগ অর্থনীতির মূল ভিত্তি। 

অথচ ঢাকা ছিল সৃষ্টিকর্তার এক অনন্য ও বিরল আশীর্বাদ পৃথিবীর খুব কম রাজধানী শহর রয়েছে, যার চারপাশ ঘিরে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালুর মতো চারটি বড় নদী রয়েছে। আমস্টারডাম বা ভেনিসের মতোই ঢাকার অভ্যন্তরীণ ৫০টিরও বেশি খাল ও নদীগুলোকে যদি একটি সমন্বিত ‘ওয়াটার-বেজড ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম’ বা নৌ-যোগাযোগ নেটওয়ার্কের আওতায় আনা যেত, তবে ঢাকা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম নান্দনিক ও সচল মেগাসিটিতে পরিণত হতে পারত। হাতিরঝিলের ওয়াটার ট্যাক্সি সেবা সাময়িকভাবে এর একটি সফল ইঙ্গিত দিলেও, গত ১৭ বছরের স্বেচ্ছাচারী উন্নয়ন ও দখলদারিত্বের কারণে সেই অপার সম্ভাবনা আজ এক দুঃস্বপ্নে রূপ নিয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS