ঢাকার গণপরিবহন যেন রোগ-জীবাণুর বাহক

ঢাকার গণপরিবহন যেন রোগ-জীবাণুর বাহক

বেসরকারি চাকরিজীবী রিংকু দাস থাকেন রাজধানীর বাড্ডায়। প্রতিদিন ভিক্টর পরিবহনের গাড়িতে চড়ে তিনি নর্দা সংলগ্ন অফিসে যাতায়াত করেন।এই পরিবহনের কোনো কোনো গাড়ির সিটে বসলেই যেন তার গা গুলিয়ে ওঠে। সিটের সামনের কাভারে হাত পড়লে তাতে যেন ধুলোর স্তর বসে যায়।একটা উৎকট দুর্গন্ধও তার নাকে বাজে। ফলে ইদানীং মাস্ক পরে তিনি যাতায়াত করেন।কিন্তু গাড়িতে ওঠা-নামায় বা সিটে বসার ক্ষেত্রে আর হাত সুরক্ষিত রাখতে পারেন না। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর সিটের কাভারে জমা ধুলো-ময়লার আস্তরণ তার হাতে লেগে যায়।যে ধুলো-ময়লায় জমা আছে অজস্র জীবাণু।

রিংকু দাস মাঝেমধ্যেই সর্দি-জ্বরে ভোগেন। তার ধারণা, ঢাকার দূষিত বাতাসের পাশাপাশি যানবাহনের এসব অপরিচ্ছন্ন দশাও তাকে বারবার অসুস্থতায় ভোগায়। অবশ্য শুধুই রিংকুই নয়, ঢাকার পরিবহনের ফিটনেসহীনতার পাশাপাশি অপরিচ্ছন্নতা নিয়ে অভিযোগ প্রায় বেশিরভাগ যাত্রীর।

তাদের ভাষ্য, ঢাকা মহানগরে প্রতিদিন পাঁচ হাজারের বেশি সিটি বাস চলাচল করে। এসব গণপরিহনে দিনে যাতায়াত করেন ২০-২৫ লাখ মানুষ। জীবিকা নির্বাহসহ নানা কাজে মানুষকে ভিড় ঠেলে একরকম যুদ্ধ করে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। কিন্তু নগরবাসীর যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ এসব বাহনে স্বাস্থ্যবিধি মানার ন্যূনতম কোনো বালাই নেই। বাসের ভেতরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার কোনো উদ্যোগ নেই, নেই কোনো নজরদারিও।

বছরের পর বছর ঢাকার নগর পরিবহনগুলো সিট, জানালা ও হ্যান্ডেল পরিষ্কার না করেই চলছে। যার কারণে বাসের অধিকাংশ সিটের কাভার ছেঁড়া ও ধুলোবালিতে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। হ্যান্ডেলগুলোও কালচে হয়ে গেছে। ফলে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন যাত্রীরা, যা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির তৈরি করছে। এতে ফ্লুসহ স্ক্যাবিস বা ফাঙ্গাল ইনফেকশন, চর্মরোগ এমনকি যক্ষ্মার মতো রোগও ছড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।

পরিবহন খাত থেকে সংশ্লিষ্টরা প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা আয় করছেন। কিন্তু বাসে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার বিষয়ে তাদের নেই কোনো ভ্রূক্ষেপ। অনেক বাসের ভেতরের অংশ যাত্রীদের থুতু, কাশি কিংবা বমির দাগে ভরা, যেন জীবাণুর এক আঁতুড়ঘর।

তাছাড়া পরিবহনগুলোতে যাত্রীদের বসার স্থান পরিষ্কার তো করাই হয় না, এমনকি জীবাণুনাশক দিয়েও একবার মোছা হয় না। ফলে দিন দিন যাত্রীদের দেহে ছড়াচ্ছে জীবাণু, সেইসঙ্গে নীরবে ছড়াচ্ছে সংক্রমণ। এর বাইরে বাসের সিটের বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে জানালায় ভাঙা কাচ থাকার মতো সমস্যা তো রয়েছেই। বাসের চালক ও হেল্পারদের আচরণ নিয়েও রয়েছে যাত্রীদের অসন্তোষ ও অভিযোগ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা যাত্রীদের অভিযোগ আমলে নেন না। সবমিলিয়ে ঢাকার গণপরিবহন চলছে যাচ্ছেতাইভাবে।

‘গাড়িতে কেউ বমি করলে শুকিয়ে যায়, থেকে যায় গন্ধ’
গণপরিবহনে নিয়মিত যাতায়াত করা কলেজছাত্রী মাহমুদা আফরোজ বাংলানিউজকে বলেন, “আমি একদিন এক গাড়ির হেলপারকে বলেছিলাম—‘সিটে ময়লা, একটু মুছে দেন’। হেলপার উত্তরে বলল, ‘আমরা দিনে কয়বার মুছব? ভালো না লাগলে নেমে যান’।”

তিনি আরও বলেন, “হেলপাররা এমন ব্যবহার করলে আমরা কাকে বলব? আমাদের তো গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে। তাই আর কিছু বলতে পারি না।”

কদমতলী থেকে মতিঝিলগামী একটি বাসে ওঠা ব্যবসায়ী সাইদুর রহমান বলেন, “সিটে বসলে প্যান্ট নষ্ট হয়ে যায়, কারণ স্পঞ্জ বেরিয়ে থাকে। সামনের সিটে পানি পড়ে স্পঞ্জগুলো স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছে। অনেক সময় কেউ যদি বমি করে, সেটা শুকিয়ে গেলেও গন্ধ থেকে যায়। এই শুকিয়ে থাকা বমি বহন করে অসংখ্য রোগের জীবাণু, যা মানুষে মানুষে ছড়িয়ে যায়।”

তিনি অভিযোগ করেন, যে পরিমাণ ভাড়া নেয়, তার তুলনায় সেবার মান নেই বললেই চলে। দেখলেই বোঝা যায় বাসগুলো পাঁচ-ছয় বছর ধরে মেরামত পর্যন্ত করা হয়নি।

পল্টন থেকে মোহাম্মদপুরগামী একটি বাসের যাত্রী পোশাককর্মী সুলতানা বেগম বলেন, “কাজের সুবাদে আমার প্রতিদিনই যাতায়াত করতে হয়। সিটে বসার আগে বাড়তি কাপড় দিয়ে ভালো করে মুছে নিই, তাও অনেক সময় গায়ে গন্ধ লেগে থাকে। কেউ কাশি দিলে ভয় হয়, যদি কিছু লেগে যায়।”

একই ভোগান্তির কথা জানান মোহাম্মদপুরের অফিসগামী যাত্রী কামাল হোসেনও। তিনি বলেন, “কেউ বাসে বমি করে দিলে সপ্তাহখানেক সেই গন্ধ থাকে। বাসের মালিকরা শুধু ভাড়া তোলেন, বাসের ভেতরে কী অবস্থা, তা দেখার সময় তাদের নেই।”

এই যাত্রী অভিযোগ করে বলেন, “বাসের সিটের বিভিন্ন অংশ ভাঙা থাকে, বসতে অসুবিধা হয়। এছাড়া সিটের বিভিন্ন জায়গায় লোহার অংশ বের হয়ে থাকায় মাঝেমধ্যে কাপড় ছিঁড়ে যায়। কখনো জানালার কাচ ভাঙা থাকায় কাচের টুকরো গায়ে এসে পড়ে।”

‘বছরে এক-দুইবার সিট কাভার পরিবর্তন করি’
অবশ্য যাত্রীদের এ ধরনের অভিযোগ মানতে নারাজ পরিবহনের চালক-হেলপাররা। তাদের দাবি, প্রতিদিন সিটের কাভার ধোয়া সম্ভব না। তবে রাতে তারা গাড়ির সিট কাভার মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেন।

রাইদা পরিবহনের বাসের চালক তোফাজ্জল বলেন, “ভোর থেকে বাসে নানারকম যাত্রী উঠে-নামে। কতজনের দিকে আমরা খেয়াল রাখতে পারি, কে বমি করল আর কে পানের পিক কিংবা চুন সিটের কাভারে মুছে গেল। আমাদের পক্ষে তো প্রতিদিন সিটের কাভারগুলো ধোয়া সম্ভব না। তবে রাতে গাড়ি গ্যারেজে নিয়ে যাওয়ার আগে ভেজা কাপড় দিয়ে পুরো গাড়ির সিট কাভার মুছে দিই।”

রাইদা পরিবহনের বাস রক্ষণাবেক্ষণ ম্যানেজার সাব্বির হাসান বলেন, “রাজধানীতে যাত্রী বেশি, পরিবহন কম। তাই যাত্রী পরিবহনের চাপ বেশি। প্রতিদিন ভোর থেকেই রাস্তায় নামতে হয়, তাই সময় করে বাস ধোয়ার সুযোগ হয় না। তবে বছরে এক-দুইবার আমরা সিট কাভার পরিবর্তন করি।”

বাসে জীবাণুনাশক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার দাবি
যাত্রীরা বলছেন, স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতে প্রতিটি বাসে সপ্তাহে অন্তত একবার জীবাণুনাশক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। ছেঁড়া সিট কাভার পরিবর্তনের জন্য মালিকদের বাধ্য করতে হবে। নিয়মিত তদারকির আওতায় এনে প্রয়োজনে বাসের জন্য স্বতন্ত্র পরিচ্ছন্নতা কর্মী নিয়োগ দিতে হবে। প্রয়োজনে সিটি কর্পোরেশনের অধীনে বাস স্ট্যান্ডে ওয়াশিং জোন চালু করা যেতে পারে। চালক-হেল্পারদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যাত্রীসেবামুখী মানসিকতা তৈরি করতে হবে বলেও মনে করেন তারা।

জানতে চাইলে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম বলেন, “গণপরিবহনের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়তই আমরা বিভিন্ন রকমের অভিযোগ পাচ্ছি। আমরা খুব বিরক্ত তাদের ওপর। আমরা কয়েকবার পরিবহনের মালিকদের ডেকে সাবধান করে দিয়েছি যে, সবসময় গাড়ির ভেতর-বাহির এবং গাড়ির সিট কাভার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। গাড়ির দরজা-জানালায় কোনো গ্লাস ভাঙা থাকতে পারবে না। কিন্তু তারা কোনো কথাই মানছেন না। আমরা বিআরটিএকে জানিয়েছি, যাতে এসব গাড়ির ফিটনেসের অনুমোদন না দেওয়া হয়।”

তিনি বলেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও অবহিত করেছি এসব অপরিচ্ছন্ন, ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। আমরাও রাস্তায় রাস্তায় চেকপোস্ট বসিয়ে এসব গাড়ি শনাক্তের উদ্যোগ নিয়েছি। এসব গাড়ি পেলে সেগুলো জব্দ করে রোড পারমিট বাতিল করার ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”

‘পরিবহনগুলো যাত্রীদের সুবিধা-অসুবিধায় ঘুণাক্ষরেও নজর দেয় না’
পরিবহন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গাড়ির চালক-হেলপাররা অপরিচ্ছন্নতার প্রশ্নে দায়িত্ব এড়ানোর অজুহাত খোঁজেন। নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকি দূর করতে হলে এই উদাসীনতা বন্ধ করে নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “গণপরিবহনগুলো তাদের খামখেয়ালি মতো চলাচল করে। যাত্রীদের সুবিধা-অসুবিধায় তারা ঘুণাক্ষরেও নজর দেয় না। এটার জন্য দায়ী পরিবহন মালিক সমিতি। গণপরিবহনের প্রতিটি যাত্রীর নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে যাতায়াতের দিকে তাদের খেয়াল রাখা উচিত। পাশাপাশি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে গাড়ির ভেতরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করতে হবে।”

বাসের সিট-হ্যান্ডেলে নানা রোগের ঝুঁকি
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণপরিবহনের ভেতরের অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন অবস্থা শুধু অস্বস্তিকরই নয়, স্বাস্থ্যঝুঁকিরও কারণ।

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের মেডিসিন ও চর্মরোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. রিয়াজুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, “বাসে যদি নিয়মিত জীবাণুনাশক ব্যবহার করা না হয়, তাহলে ফ্লু, ইনফ্লুয়েঞ্জা, সর্দি-কাশি হতে পারে। বাসে বসে থাকা, হ্যান্ডেল ধরা বা জানালায় স্পর্শের মাধ্যমে হেপাটাইটিস, স্ক্যাবিস বা ফাঙ্গাল ইনফেকশন, চর্মরোগ এমনকি যক্ষ্মার মতো রোগও ছড়াতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য এটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।”

তিনি বলেন, “একজন রোগী বাসে হাঁচি-কাশি দিলে তার জীবাণু ঘনবসতিপূর্ণ এই পরিবেশে ছড়াতে বেশি সময় লাগে না। এরপর অন্য কেউ সেটা হাত বা কাপড়ে নিয়ে বাসায় ফিরলে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।”

পরিত্রাণের উপায় নিয়ে এই চিকিৎসক বলেন, প্রতিদিন প্রতিটি গাড়ি গ্যারেজ থেকে বের করার আগে সিট, হাতল, জানালাসহ সব ভালোভাবে ধোয়া উচিত। ছাড়ার আগে অবশ্যই পুরো গাড়িতে জীবাণুনাশক স্প্রে করা উচিত।

গণপরিবহনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা নিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পদক্ষেপ জানতে চাইলে সংস্থাটির সহকারী পরিচালক রুহুল আমিন বাংলানিউজকে বলেন, “আমাদের ম্যাজিস্ট্রেটরা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছেন। গাড়ির ভেতরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে সেগুলো আটক করা হচ্ছে এবং আইন অনুযায়ী জরিমানা আরোপ করা হচ্ছে। সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিআরটিএ সর্বদা সতর্ক রয়েছে, যাতে কোনোভাবেই ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল করতে না পারে।”

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS