স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য এক শতাংশ ভোটারের সমর্থন বড় চ্যালেঞ্জ

স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য এক শতাংশ ভোটারের সমর্থন বড় চ্যালেঞ্জ

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক শতাংশ ভোটারের সমর্থনের বিধানটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই একটি কারণেই অধিকাংশ স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়।ফলে শুনানি ও আপিলের বাড়তি চাপ তৈরি হয়। এছাড়া আদালতের নির্দেশনায় অনেক সময় ব্যালট পেপার ছাপাতেও বিলম্ব হয়।তাই গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) থেকে বিধানটি তুলে দেওয়ার কথা বলছেন খোদ নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারাও।

ইসি সূত্র জানিয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিতকরণ এবং সমাধানের জন্য কর্মকর্তাদের মতামত চেয়েছিল কমিশন।এ নিয়ে সোমবার (১১ মে) অনুষ্ঠিত এক কর্মশালায় ওই বিধান তুলে দিয়ে নতুন প্রস্তাব করেন তারা।

ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন।এতে ৩ হাজার ৪০৬ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। তাদের মধ্যে জমা দেন ২ হাজার ৫৬৮ জন। দাখিলকারীদের মনোনয়নপত্রগুলোর মধ্যে বাছাইয়ে বৈধ হন ১ হাজার ৮৪২ জন। ৭২৩টি মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। বাতিল হওয়া ৭২৩টি মনোনয়নপত্রের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন প্রায় ৩৫০ জন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিলের অন্যতম কারণের মধ্যে রয়েছে এক শতাংশ ভোটারের সমর্থন থাকার প্রমাণ না থাকা।

ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, গাজীপুর-২ আসনে ভোটার সংখ্যা ৮ লাখ ৪ হাজার ৩৩৩ জন। এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে এক শতাংশ ভোটারের সমর্থন হিসেবে ৮ হাজারের বেশি ভোটারের সমর্থনের স্বাক্ষর জমা দিতে হয়। এটি একজন প্রার্থীর জন্য জটিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা বলছেন, এই বিধানটি করা হয়েছিল স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ঠেকাতে, যা গণতন্ত্রের পরিপন্থী। এছাড়া কাজও অনেক বেড়ে যায়। অনেক সময় বিড়ম্বনাও তৈরি হয়। কেননা, রিটার্নিং কর্মকর্তা এক শতাংশ ভোটারের সমর্থন যাচাইয়ের জন্য নমুনাভিত্তিকভাবে ১০ জন সমর্থকের স্বাক্ষর পরীক্ষা করেন। এখানে গড়মিল হলে মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। পরবর্তীতে কমিশনে আপিল করে না পেলে আদালতে যাওয়া যায়।

সেখানে শুনানিতে কেউ ব্যালট পেপার ছাপানোর পর প্রার্থিতা ফিরে পেলে আগের ছাপানো সব ব্যালট পুড়িয়ে ফেলে নতুন করে ছাপাতে হয়। অতীতে এর অনেক নজির রয়েছে। ফলে এতে শুধু বিড়ম্বনাই সৃষ্টি হয় না, রাষ্ট্রীয় অর্থেরও অপচয় হয়। এ কারণে এই বিধানটি বাতিল করে সব আসনের জন্য সমর্থন একটি নির্দিষ্ট সংখ্যায় বেঁধে দেওয়ার পক্ষে তারা। এ ক্ষেত্রে এক হাজার নির্ধারণ করা যেতে পারে।

ইসি কর্মকর্তারা আরও বলছেন, দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছিল এক শতাংশ ভোটারের সমর্থকসূচক স্বাক্ষরে গড়মিল থাকার কারণে। এ নিয়ে তখন প্রার্থী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন মহল থেকে বিধানটি তুলে দেওয়ার দাবি ওঠে। তাদের যুক্তি, এটি কখনোই গণতান্ত্রিক নয়; এই বিধান গোপন ভোটের পরিপন্থী। ওই নির্বাচনে নেত্রকোণা-৫ আসনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। তবে তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছিল। সে সময় তিনি বলেছিলেন—স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখার কৌশল হিসেবে এক শতাংশ ভোটারের সমর্থনের আইন করা হয়েছে। এই আইন পরিবর্তন হওয়া উচিত।

এদিকে প্রার্থীদের জন্য আইনের সহজ পাঠ না থাকাটাও একটি চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা। আরপিও খুব দুর্বোধ্য হওয়ায় অধিকাংশ ব্যক্তি তা বুঝে উঠতে পারেন না। ফলে আইন না মানার প্রবণতা ঠেকানো যায় না। তাই এর সহজপাঠ রচনার প্রস্তাব করেছেন তারা। নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এ বিষয়ে একমতও পোষণ করেছেন।

প্রশিক্ষণ নিয়েও নির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন কর্মকর্তারা। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে প্রশিক্ষণ আয়োজনের পরিবর্তে তফসিল ঘোষণার পরপরই তা শেষ করার পক্ষে তারা। নির্বাচনের সময় গণমাধ্যমকর্মী পরিচয়ে অনেকেই সাংবাদিক কার্ড এবং পর্যবেক্ষক পরিচয়ে পর্যবেক্ষক কার্ড সংগ্রহ করে ভোটের মাঠে অবস্থান নেন। কাজেই গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষক নীতিমালায় এ বিষয়টি ঠেকাতে আরও সুনির্দিষ্ট বিধান আনার যুক্তি তুলে ধরেন ইসি কর্মকর্তারা। এছাড়া নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়নে সারা বছর মৃত ভোটার কর্তনের সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়ও উঠে আসে ওই সভায়।

জানা গেছে, কর্মশালায় উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো একীভূত করে কমিশনের কাছে উপস্থাপন করা হবে। পরবর্তীতে কমিশন একমত হলে আইনি কাঠামোয় পরিবর্তন আসতে পারে।

এ বিষয়ে একজন নির্বাচন কমিশনার বলেন, আইনকে প্রয়োজনের তাগিদে সময়োপযোগী করতে হয়। আমরা কমিশনে এখনো কোনো প্রস্তাব পাইনি। আমাদের দুজন প্রতিনিধি কমিশনের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে আলোচনা ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ এ বিষয়ে বাংলানিউজকে বলেন, আমরা এসব নিয়ে শিগগিরই বসব। তখন আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS