কর্মব্যস্ত জীবনে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ আগের তুলনায় অনেকটাই সীমিত। তাই জীবনসঙ্গী কিংবা নতুন বন্ধু খুঁজে পেতে এখন অনেকেই ভরসা করছেন অনলাইন ডেটিং অ্যাপের ওপর।পরিচয়, কথোপকথন, এরপর দেখা, এভাবেই অনেক সম্পর্কের শুরু। কারও ক্ষেত্রে সেই সম্পর্ক সফল পরিণতিও পায়।তবে সতর্কতা না থাকলে এই ভার্চুয়াল পরিচয়ই কখনো কখনো প্রতারণা, মানসিক হয়রানি কিংবা আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেটিং অ্যাপ নিজেই কোনো সমস্যা নয়।বরং সমস্যার শুরু হয় অসচেতন ব্যবহার, অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং অপরিচিত ব্যক্তির ওপর দ্রুত বিশ্বাস স্থাপনের কারণে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনলাইন ডেটিং-সংক্রান্ত প্রতারণা ও সাইবার অপরাধের ঘটনা বাড়ছে।একইসঙ্গে দীর্ঘদিন অ্যাপ ব্যবহার করতে করতে অনেকেই মানসিক ক্লান্তি বা ‘ডেটিং অ্যাপ বার্নআউট’র শিকার হচ্ছেন।
কেন বাড়ছে ‘ডেটিং অ্যাপ বার্নআউট’?
প্রথমদিকে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের আগ্রহ থাকলেও একের পর এক প্রোফাইল দেখা, দীর্ঘদিন চ্যাট করেও সম্পর্ক এগিয়ে না যাওয়া কিংবা বারবার হতাশ হওয়ার কারণে অনেক ব্যবহারকারী মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তখন আনন্দের জায়গা দখল করে নেয় চাপ, হতাশা ও একাকিত্ব।
গবেষকদের মতে, এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে ‘ডেটিং উইথ ইনটেনশন’ বা স্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে ডেটিং করা জরুরি। অর্থাৎ অ্যাপে প্রবেশের আগে নিজের কাছে পরিষ্কার থাকতে হবে—আপনি কি বন্ধুত্ব চান, স্বল্পমেয়াদি সম্পর্ক চান, নাকি দীর্ঘমেয়াদি জীবনসঙ্গী খুঁজছেন।
সময় বেঁধে ব্যবহার করুন
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ডেটিং অ্যাপে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটানোর পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা উচিত। একবারে ১০ মিনিট বা নির্দিষ্টসংখ্যক প্রোফাইল দেখার অভ্যাস মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে এবং অ্যাপের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও কমায়।
শুধু চ্যাট নয়, বাস্তবতারও মূল্য আছে
অনেকেই সপ্তাহের পর সপ্তাহ শুধু বার্তা আদান-প্রদান করেন। এতে বাস্তবতার চেয়ে কল্পনানির্ভর সম্পর্ক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পারস্পরিক আগ্রহ থাকলে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তুলনামূলক অল্প সময়ের মধ্যেই সামনাসামনি সাক্ষাৎ করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। মুখোমুখি আলাপে একজন মানুষের আচরণ, আন্তরিকতা ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পাওয়া সহজ হয়।
যে প্রতারণাগুলো সবচেয়ে বেশি দেখা যায়
সাইবার আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন ডেটিং অ্যাপে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের ঝুঁকি রয়েছে। সবচেয়ে পরিচিত প্রতারণা হলো ক্যাটফিশিং। এতে অপরাধীরা ভুয়া ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করে আকর্ষণীয় প্রোফাইল তৈরি করে। বিশ্বাস অর্জনের পর তারা মানসিকভাবে প্রভাবিত করার পাশাপাশি আর্থিক প্রতারণারও চেষ্টা করে।
আরেকটি সাধারণ কৌশল রোম্যান্স স্ক্যাম। দীর্ঘদিন সম্পর্কের অভিনয় করে ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও সংগ্রহ করা হয়। পরে সেগুলো প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল কিংবা অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়। কখনো অসুস্থতার অজুহাত, কখনো ভ্রমণের পরিকল্পনা, বিভিন্ন আবেগঘন গল্পের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
এক ক্লিকেই বড় ক্ষতি
ডেটিং অ্যাপ ব্যবহারকারীদের অনেকেই অপরিচিত ব্যক্তির পাঠানো লিংকে ক্লিক করেন। সাইবার অপরাধীরা এই সুযোগে ক্ষতিকর সফটওয়্যার বা স্পাইওয়্যার ডিভাইসে প্রবেশ করিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য, অনলাইন ব্যাংকিং তথ্য কিংবা বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের তথ্য চুরি করতে পারে।
এ ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে ভুয়া পরিচয়ে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে অপরাধ সংঘটনের ঘটনাও ঘটছে। এমনকি উপহার পাঠানোর নামে ভুয়া গিফট কার্ড বা কিউআর কোড পাঠিয়ে প্রতারণার ঘটনাও নতুন নয়।
কী করবেন, কী করবেন না
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেটিং অ্যাপে পরিচয়ের শুরুতেই ব্যক্তিগত তথ্য, বাসার ঠিকানা, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসওয়ার্ড, ওটিপি বা আর্থিক তথ্য কখনোই শেয়ার করা উচিত নয়। অপরিচিত ব্যক্তির পাঠানো কোনো লিংক, অ্যাপ বা ফাইল যাচাই ছাড়া খোলা থেকেও বিরত থাকতে হবে।
একইসঙ্গে বাস্তব জীবনের সামাজিক যোগাযোগও বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন গবেষকরা। বই পড়ার ক্লাব, খেলাধুলা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিলে স্বাভাবিকভাবেই নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রেই এসব সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে বেশি স্থিতিশীল ও সন্তোষজনক হয়।
সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা
প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু সেই প্রযুক্তি নিরাপদভাবে ব্যবহার করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ডেটিং অ্যাপ নতুন সম্পর্ক তৈরির একটি মাধ্যম হতে পারে, তবে সেটিই শেষ ভরসা নয়। ধৈর্য, সচেতনতা, আত্মসম্মান এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা বজায় রাখলে অনলাইন পরিচয়ও ইতিবাচক অভিজ্ঞতায় পরিণত হতে পারে। আর অসতর্ক হলে একই প্ল্যাটফর্ম প্রতারণা ও সাইবার অপরাধের বড় ফাঁদ হয়ে উঠতে পারে।