ফাইনালের আগে আর্জেন্টিনার ঘরে ঘরে কুসংস্কার

ফাইনালের আগে আর্জেন্টিনার ঘরে ঘরে কুসংস্কার

বিশ্বকাপ ফাইনালের আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। উত্তেজনায় টগবগ করছে পুরো আর্জেন্টিনা।তবে লিওনেল মেসি কিংবা লিওনেল স্কালোনির কৌশলের পাশাপাশি সমর্থকদের একাংশের বিশ্বাস, দলের জয়ে তাদেরও আছে বিশেষ ভূমিকা। তাই স্পেনের বিপক্ষে শিরোপার লড়াইয়ের আগে দেশজুড়ে আবারও ফিরে এসেছে নানা ধরনের ‘লাকি রিচ্যুয়াল’ বা সৌভাগ্যের কুসংস্কার।

আর্জেন্টিনায় এই বিশ্বাসের নাম ‘কাবালা’। অর্থাৎ এমন কিছু অভ্যাস বা আচার, যা নাকি দলকে সৌভাগ্য এনে দেয়।তাই ফাইনালের আগে হাজারো সমর্থক মরিয়া হয়ে ধরে রেখেছেন নিজেদের পুরোনো রুটিন।

বুয়েনস আইরেসের লিনিয়ার্স এলাকার বাসিন্দা আন্দ্রেস গনসালেসের বাড়িতে ম্যাচ চলাকালে কেউ নিজের জায়গা থেকে উঠতে পারেন না।তার বিশ্বাস, যে জায়গায় বসে দল জিতেছে, ফাইনালেও সেখানেই বসে থাকতে হবে। কেউ যদি বাথরুমে যাওয়ার সময় আর্জেন্টিনা গোল করে, তাহলে ম্যাচ শেষ না হওয়া অব্দি তার আর ঘরে ফেরার অনুমতি নেই।

বিক্রয়কর্মী এসতেলা ভার্গাসের বাড়িতেও নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম নেই। পরিবারের সবাইকে একই পোশাক পরতে হয়, একই চেয়ারে বসতে হয়। এমনকি তাদের পোষা কুকুরকেও ঘরের বাইরে রাখা হয়। তবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে একটি ব্যতিক্রম ঘটেছিল। কুকুরটি যেহেতু ইংলিশ বুলডগ, তাই তাকে আর্জেন্টিনার জার্সি পরিয়ে রাখা হয়েছিল। স্পেনের বিপক্ষে অবশ্য বৃষ্টি হোক বা রোদ, সে থাকবে ঘরের বাইরেই।

গ্রাসিয়েলা কাম্পোসের বাড়িতে আবার ম্যাচ শুরু হলেই তার শাশুড়িকে ঘর ছেড়ে রান্নাঘরে চলে যেতে হয়। সেখানে বসে তিনি আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা রঙের একটি স্কার্ফ বুনতে থাকেন। পরিবারটির বিশ্বাস, এই রীতি ভাঙা মানেই অমঙ্গল ডেকে আনা।

শুধু সাধারণ সমর্থকই নন, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইও নিজের সৌভাগ্যের রুটিন ভাঙতে নারাজ। তিনি জানিয়েছেন, বিশ্বকাপের একটি ম্যাচও প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবনের বাইরে বসে দেখবেন না।

সমাজবিজ্ঞানী দিয়েগো মুরসির ভাষায়, আর্জেন্টিনায় ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি মানুষের পরিচয়ের অংশ। তাই সমর্থকেরা নিজেদের কেবল দর্শক নয়, দলেরও অংশ বলে বিশ্বাস করেন, ‘তারা বিশ্বাস করেন, এসব রীতিনীতি মেনে চলার মাধ্যমে তারাও দলের জয়ে ভূমিকা রাখছেন। সৌভাগ্য ডেকে আনছেন, দুর্ভাগ্য দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন।’

মুরসি স্মরণ করিয়ে দেন ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী কোচ কার্লোস বিলার্দোর একটি বিখ্যাত কুসংস্কারের গল্পও। প্রথম ম্যাচে ড্রেসিংরুমের একটি ফোন বেজে ওঠে। একজন খেলোয়াড় ফোন ধরলেও ওপাশ থেকে কেউ কথা বলেনি। সেই ম্যাচ জেতার পর বিলার্দো পরবর্তী প্রতিটি ম্যাচের আগে একই খেলোয়াড়কে দিয়ে সেই ফোন ধরাতেন, আর ওপাশে কেউ কথা বলত না। তার বিশ্বাস ছিল, এই রীতিই দলকে সৌভাগ্য এনে দিচ্ছে।

৭৪ বছর বয়সী লিদিয়া ওতেরোও বিশ্বাস করেন, তার সৌভাগ্যের রীতি কখনো ভুল হয় না। তার ভাষ্য, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালের প্রথমার্ধে পোষা কুকুরটি টেলিভিশনের দিকে মুখ করে বসে ছিল, তাই গোল পায়নি আর্জেন্টিনা। বিরতির পর কুকুরটির মুখ ঘুরিয়ে দেওয়ার পরই নাকি বদলে যায় ম্যাচের চিত্র।

এদিকে ২০২০ সালে মারা গেলেও দিয়াগো ম্যারাডোনা যেন এখনও আর্জেন্টাইনদের বিশ্বাস আর আবেগের অংশ। বুয়েনস আইরেসে তার পুরোনো বাড়িতে এখনও ভিড় করেন ভক্তরা। অনেকে আবার প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের ছবি বা স্টিকার ফ্রিজারে রেখে দেন। তাদের বিশ্বাস, এতে প্রতিপক্ষের ভাগ্যও যেন ‘জমে’ যায়। 

১১ বছর বয়সী মেসিভক্ত রদ্রিগো সের্না জানিয়েছে, এই রীতিটি সে শিখেছে তার দাদার কাছ থেকেই।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এসব বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি নেই। তবু কোটি আর্জেন্টাইন সমর্থকের কাছে এগুলো নিছক কুসংস্কার নয়, বরং প্রিয় দলের জয়ের আশায় বুকে লালন করা একরাশ বিশ্বাস। তাই স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালের আগে আর্জেন্টিনায় উত্তেজনা শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ নয়। ঘরের ভেতরেও চলছে ‘সৌভাগ্য’ ধরে রাখার নানা আচার-অনুষ্ঠান।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS