‘তুমি কি ফুটবল খেলতে চাও, নাকি বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি করতে চাও?’, অনুশীলনের আগের রাতে দেরিতে বাড়ি ফেরার পর কিশোর মার্ক কুকুরেয়াকে এই কঠিন প্রশ্নটি করেছিলেন তার বাবা অস্কার। বাবার সেই একটি প্রশ্নই কুকুরেয়াকে আমূল বদলে দিয়েছিল।
ভুল স্বীকার করে স্পেনের এই লেফট-ব্যাক তখন জানিয়েছিলেন, তিনি ফুটবলই খেলতে চান। আজ পঁচিশোর্ধ্ব বয়সে দাঁড়িয়ে কুকুরেয়া মনে করেন, জীবনের সেই মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্তটিই তাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
স্পেনের বার্সেলোনার কাছের এক ছোট্ট উপকূলীয় শহর বার্সেলোনার আলেয়ার এক মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে কুকুরেয়ার বিশ্ব ফুটবলের মূল মঞ্চে আসার গল্পটা বেশ নাটকীয়। তার বাবা গাড়ির শোরুমে কাজ করার সময় এক ক্রেতার সঙ্গে আলাপে জানান, তার ৮ বছরের ছেলের পায়ে সবসময় বল লেগেই থাকে।সেই ক্রেতাই কুকুরেয়াকে এস্পানিওলের যুব দলে ট্রায়াল দেওয়ার পরামর্শ দেন, যা তার পুরো জীবনটাই বদলে দেয়।
কুকুরেয়ার ক্যারিয়ারের মূল ভিত্তি হলো তার হার না মানা মানসিকতা।বার্সেলোনার যুব দলে যখন তিনি নিয়মিত সুযোগ পাচ্ছিলেন না, তখন তার প্রথম কোচ ফ্রাঙ্ক আরতিগা তার প্রতিভা চিনে তাকে বিশ্বখ্যাত একাডেমি ‘লা মাসিয়া’তে নিয়ে আসেন। বার্সেলোনার যুব দলে খেলার সময়ই তার সঙ্গে পরিচয় হয় এজেন্ট আলেক্স পিকের, যিনি এখনও কুকুরেয়ার ছায়াসঙ্গী। পিকে কুকুরেয়ার লম্বা চুলের পাশাপাশি তার নিঃস্বার্থ ফুটবল শৈলীর প্রশংসা করে জানান, কুকুরেয়া নিজে টেকনিক্যাল জাদুকর না হলেও দলের বাকিদের খেলাকে উজ্জ্বল করতে পারতেন।
২০১৭ সালের অক্টোবরে বার্সেলোনার মূল দলের হয়ে কোপা দেল রে-তে মুরসিয়ার বিপক্ষে মাত্র ৭ মিনিটের জন্য মাঠে নেমেছিলেন কুকুরেয়া। কিন্তু সেটিই ছিল ব্লাউগ্রানা জার্সিতে তার প্রথম ও শেষ ম্যাচ। বার্সায় থাকার সময় ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসির সঙ্গে অনুশীলনের সুযোগ হলেও, তৎকালীন কোচ আর্নেস্তো ভালভার্দে তাকে দলে না রেখে এইবারের কাছে ধারে পাঠিয়ে দেন। মেসিকে নিয়ে কুকুরেয়া অকপটে স্বীকার করেন যে, মেসির সঙ্গে অনুশীলন করার সময় তিনি বেশ ভয়ই পেতেন।
এরপর এইবার ও হেতাফের হয়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করে কুকুরেয়া নজরে আসেন স্পেনের অনূর্ধ্ব-২১ দলের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের। ২০২১ সালে তিনি ব্রাইটনে যোগ দেন এবং এর এক বছর পর ৬৫ মিলিয়ন ইউরোর বিশাল অঙ্কে চেলসি তাকে দলে ভেড়ায়। ব্লুজদের হয়ে ১৬৩ ম্যাচে ৯টি গোল ও ১৩টি অ্যাসিস্ট করার পর, চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপের পরই তিনি স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদের সাদা জার্সি গায়ে জড়াতে যাচ্ছেন।
স্পেন জাতীয় দলের হয়ে ২০২৪ সাল থেকে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে লেফট-ব্যাক পজিশনটি পাকাপোক্ত করেন কুকুরেয়া। স্পেনের হয়ে সর্বশেষ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ জেতা এই তারকা ফুটবলার ইতিমধ্যেই স্প্যানিশদের অন্যতম প্রিয় অ্যাথলেটে পরিণত হয়েছেন। এমনকি রোববারের ফাইনালে ট্রফি জিতলে কোচ দে লা ফুয়েন্তেকে একটি ট্যাটু আঁকার প্রতিশ্রুতিও দিয়ে রেখেছেন তিনি।
মাঠে নামলেই কুকুরেয়ার যে জিনিসটি সবার আগে নজর কাড়ে, তা হলো তার ঝাঁকড়া লম্বা চুল। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট সময় নিয়ে যত্ন করা এই চুলের পেছনে রয়েছে এক পারিবারিক ইতিহাস। কুকুরেয়া যখন ছোটবেলায় খেলতেন, তখন গ্যালারি থেকে মা পাত্রিসিয়া যাতে ভিড়ের মধ্যে সহজেই নিজের ছেলেকে চিনে নিতে পারেন, সেজন্যই চুল লম্বা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই কোঁকড়ানো চুল তার পরিচয়ের অংশ হয়ে গেছে। বিশ্বকাপ জিতলেও চুল কাটার কোনো পরিকল্পনা নেই জানিয়ে কুকুরেয়া বলেন, ‘এটা আমার নিজস্ব স্টাইল, আর আমি কখনোই এটা কাটব না।’
তার এই চুল নিয়ে লকার রুমে সতীর্থ লামিনে ইয়ামালও মজা করে বাতাসের গতি বা ‘অ্যারোডাইনামিক’ সুবিধার জন্য চুল ছাঁটার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এমনকি কুকুরেয়ার স্ত্রী, ইনফ্লুয়েন্সার ক্লদিয়া রদ্রিগেসও রসিকতা করে বলেন, এই বিপুল পরিমাণ কোঁকড়ানো চুলের সঙ্গে বসবাস করা মাঝেমধ্যে বেশ কষ্টের। প্রিমিয়ার লিগে চেলসি বনাম টটেনহ্যামের এক ম্যাচে আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার ক্রিস্তিয়ান ‘কুতি’ রোমেরো কুকুরেয়ার চুল ধরে টেনেছিলেন, যা নিয়ে রেফারি কোনো শাস্তি না দেওয়ায় বেশ বিতর্ক হয়েছিল।
খেলার মাঠে লড়াইয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও এক বড় যুদ্ধ করতে হচ্ছে কুকুরেয়াকে। তার তিন সন্তানের মধ্যে সবার বড় ছেলে ৬ বছর বয়সী মাতেও ‘অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার’-এ আক্রান্ত, যার জন্য প্রয়োজন বিশেষ যত্নের।
সোশ্যাল মিডিয়ায় অটিজম নিয়ে সচেতনতা তৈরি করা ১৩ বছর বয়সী কিশোর পাউ ব্রুনেতের সঙ্গে এক আবেগঘন আলোচনায় কুকুরেয়া বলেন, ‘এটা সত্যিই কঠিন। কেউ তো আর আপনাকে বাবা হওয়া শিখিয়ে দেয় না। তবে যখন আপনার একটি প্রতিবন্ধী সন্তান থাকবে, তখন আপনি দেখবেন যে তারা বাকি ভাইবোনদের মতো সহজে সবকিছু বোঝে না, আপনাকে তাদের ভাষা বুঝতে শিখতে হবে। যখন ও মন খারাপ করে, তখন আমার খুব কষ্ট হয়।’
কুকুরেয়া জানান, মাতেওর বিশেষায়িত স্কুল এবং থেরাপির বিষয়টি তার জীবনের অন্যতম অগ্রাধিকার। তাই যেকোনো ক্লাবে চুক্তি করার আগে তিনি ও তার স্ত্রী প্রথমে সেই শহরে মাতেওর জন্য ভালো বিশেষায়িত স্কুল ও থেরাপির ব্যবস্থা আছে কি না, তা নিশ্চিত করেন। এই লড়াইয়ে মাতেওর বাকি দুই ভাইবোন রিও এবং বেল্লাও তাকে দৈনন্দিন কাজে সাহায্য করে।
চলতি বিশ্বকাপে এই প্রথম নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে মাতেও উপস্থিত থাকবে তার বাবাকে সমর্থন দিতে। মাতেও হয়তো পুরো ম্যাচ জুড়ে খেলা দেখবে না, নিজের ট্যাবলেট নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, কিন্তু গ্যালারিতে তার উপস্থিতি কুকুরেয়ার জন্য হবে এক বিশাল শক্তি। আগামী বুধবার ২৮ বছরে পা দিতে যাওয়া কুকুরেয়া চাইবেন স্পেনের হয়ে সোনালী ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরে পরিবারের সঙ্গে জন্মদিনের অগ্রিম উদযাপন সারতে।