২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রক্তক্ষয়ী দিনগুলোর একটি। এ দিন সারা দেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা।এতে সংঘর্ষে ২৫ জনের মতো ছাত্র-জনতা নিহত হন। পরে সরকার আন্দোলনকারীদের আলোচনায় বসার আহ্বান জানালে ‘শহীদের রক্তের ওপর কোনো সংলাপ হবে না’ বলে জানিয়ে দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম।
আগের দিন ১৭ জুলাই আন্দোলনকারীদের কফিন মিছিলে পুলিশ হামলা করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থী সাংবাদিকসহ আন্দোলনকারীরা আহত হন। এদিকে শিক্ষার্থীদের সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।দুপুর থেকে পুলিশ, র্যাব, বিজিবির বিপুলসংখ্যক সদস্য সাঁজোয়া যান নিয়ে ক্যাম্পাসে জড়ো হতে থাকেন। জোরপূর্বক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো খালি করা হয়।সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় দিলেও দুপুর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। শিক্ষার্থীরা অশ্রুসিক্ত চোখে ক্যাম্পাস ছাড়েন। এদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়ির উদ্দেশে বের হওয়ার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রবেশপথে ছাত্রলীগের নেতারা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কি না জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং মারধর করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ক্যাম্পাসে প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ফলে আন্দোলন দুর্বল হয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা যায়। এমন সময় ঢাকার যাত্রাবাড়ী, রামপুরা-বাড্ডা, উত্তরা, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, মহাখালীসহ বিভিন্ন এলাকার রাজপথ দখলে নেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন।
১৭ জুলাই জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমানে ভারতে পলাতক শেখ হাসিনা। তিনি আন্দোলনকারীদের শান্ত থাকার নির্দেশ দেন। তবে আন্দোলনকারীরা একে ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তারা বলেন, সরকার একদিকে শিক্ষার্থীদের শান্ত থাকতে বলছে, অন্যদিকে পুলিশ ও দলীয় নেতাকর্মীদের দিয়ে হামলা করছে।
১৮ জুলাই সারা দেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন আন্দোলনকারীরা। এই কর্মসূচিতে সারা দেশের প্রতিটি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা শিক্ষার্থীদের তাদের ক্যাম্পাসের নিকটস্থ সড়ক অবরোধের আহ্বান জানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। হাসপাতাল ও জরুরি সেবা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের দরজা খুলবে না, অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া সড়কে কোনো গাড়ি চলবে না– এমন নির্দেশনা দেন আন্দোলনকারীরা।
শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির পর ১৮ জুলাই সকালে রাজধানীতে যান চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে। রাস্তাঘাটে অন্যদিনের মতো ব্যস্ততা দেখা যায়নি। কিন্তু দুপুর গড়াতে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানেও সংঘর্ষ হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক বন্ধ হয়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ঢাকাসহ সারা দেশে ২২৯ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
ঢাকায় বাড্ডায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকশ শিক্ষার্থী সড়ক অবরোধ করলে তাদের ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ। পরে আন্দোলনকারীরা আবার জড়ো হন। পুলিশ তাদের ওপর কাঁদানে গ্যাস ও গুলি ছোড়ে। আন্দোলনকারীরাও পাল্টা ইট-পাটকেল ছোড়েন। পুলিশের রাবার বুলেটে আন্দোলনকারীদের কয়েকজন আহত হন। এসময় আন্দোলনকারীদের ধাওয়া খেয়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আটকা পড়েন। পরে র্যাব তাদের হেলিকপ্টারের মাধ্যমে উদ্ধার করে।
দিনব্যাপী সংঘর্ষে ২৫ জনের নিহতের তথ্য নিশ্চিত করা হয়। উত্তরায় আন্দোলনকারীদের পানি বিতরণকালে মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়া ঘটনা আলোড়ন তৈরি করে। ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের শিক্ষার্থী ফারহান ফাইয়াজও এদিন নিহত হন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হেলিকপ্টার থেকে গুলি, গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হয়।
পরে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করে আসা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরকার আলোচনায় বসতে রাজি বলে জানান তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করতে আনিসুল হক ও শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান নওফেলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া কোটা সংস্কার নিয়ে মামলার শুনানি এগিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকার কোটা সংস্কার নিয়ে নীতিগতভাবে একমত বলেও জানান তিনি।
এর প্রতিক্রিয়ায় নাহিদ ইসলাম আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি এক ফেসবুক পোস্টে জানান, শহীদের রক্তের ওপর কোনো সংলাপ হবে না। সরকারকেই সমাধানের পথ বের করতে হবে। কেবল কোটা সংস্কার করলেই ফয়সালা হবে না।
এদিন বিটিভি ভবন ও রামপুরায় পুলিশ ফাঁড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এছাড়া মিরপুর-১০ নম্বরে মেট্রো স্টেশনেও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এতে প্রথমে মেট্রোর চার স্টেশনে ও পরে পুরোপুরি মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ রাখা হয়। দেশব্যাপী এমন পরিস্থিতিতে ২১, ২৩ ও ২৫ জুলাইয়ের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
এ দিনের আরেকটি বড় ঘটনা হলো– ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া। সরকার রাত ৯টা নাগাদ ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ও মোবাইল ইন্টারনেটসহ কোনো ইন্টারনেট সার্ভিসই পাওয়া যাচ্ছিল না। এর মাধ্যমে মানুষের তথ্য প্রাপ্তির মৌলিক অধিকার হারায়। এতে বহির্বিশ্বের সঙ্গে দেশের যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায়।