বাংলাদেশের ভোটাররা ১২ ফেব্রুয়ারি একটি নতুন সরকার নির্বাচন করার জন্য ভোট দেবে। কিন্তু বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, তাদের পছন্দের বিষয়টি সমন্বিত ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের ঢেউ দ্বারা হুমকির সম্মুখীন, আর বিভ্রান্তিকর অপতথ্যগুলোর বেশিরভাগই ছড়ানো হচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে। সূত্র টিআরটিওয়ার্ল্ড।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তাকে হিন্দু-জাতীয়তাবাদী সরকার তখন থেকে আতিথ্য দিয়ে আসছে। অভ্যুত্থানের পর এটিই বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় নির্বাচন।
কর্তৃপক্ষ বলছে, অনলাইনে কারসাজির মাত্রা- যার মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্বারা তৈরি ছবি, এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছে যে মিথ্যা বিষয়বস্তু রোধ করার জন্য একটি বিশেষ ইউনিট তৈরি করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান নোবেল শান্তি পুরষ্কার বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস জানুয়ারিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ককে ফোন করে সাহায্য চেয়ে বলেছিলেন, ‘নির্বাচন ঘিরে ভুল তথ্যের বন্যা’ ছড়িয়ে পড়েছে।এটি বিদেশি মিডিয়া এবং স্থানীয় উভয় সূত্র থেকেই আসছে।
অপতথ্যগুলোর বেশিরভাগই বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার দাবিকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ অমুসলিম, যাদের বেশিরভাগই হিন্দু।
এর ফলে অনলাইনে ‘হিন্দু গণহত্যা’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে হিন্দুরা আক্রমণের শিকার হচ্ছে বলে দাবির ব্যাপক পোস্ট দেখা যায়।
জানুয়ারিতে প্রকাশিত পুলিশের পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২৫ সালে সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সদস্যদের সাথে জড়িত ৬৪৫টি ঘটনার মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশকে সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছিল।
‘সমন্বিত ভারতীয় বিভ্রান্তি’
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট’ জানিয়েছে, তারা ৭ লাখেরও বেশি পোস্ট ট্র্যাক করেছে, এক্সে এক লাখ ৭০ হাজারের বেশি অ্যাকাউন্ট থেকে এগুলো ছড়ানো হয়। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে ‘হিন্দু গণহত্যা’ নিয়ে এসব অপপ্রচার চালানো হয়।
‘আমরা অনলাইনে সমন্বিত ভারতীয় মিথ্যা তথ্য ট্র্যাক করেছি, যেখানে বাংলাদেশে হিন্দুদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সহিংসতার অভিযোগ আনা হয়েছে,’ বলেন থিঙ্ক ট্যাঙ্কের প্রধান রাকিব নায়েক।
‘এই কন্টেন্টের ৯০ শতাংশেরও বেশি ভারত থেকে এসেছে, বাকিটা যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেটওয়ার্কগুলির সাথে যুক্ত,’ তিনি বলেন।
ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক এবং ইনস্টাগ্রাম- সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিতে এএফপি ফ্যাক্ট চেক টিম দ্বারা নথিভুক্ত শত শত এআই-জেনারেটেড ভিডিওর মধ্যে খুব কম ভিডিওতেই এআই ডিসক্লেমার চিহ্নিত করা আছে।
হাসিনার অধীনে বছরের পর বছর ধরে চলা দমন-পীড়নের পরও এই উত্থান দেখা দিয়েছে, যখন বিরোধী দলকে দমন করা হয়েছিল এবং স্পষ্টবাদী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
“অন্যান্য সময়ের তুলনায় আমরা বিপুল পরিমাণে জাল তথ্য লক্ষ্য করছি,” ঢাকা-ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ডিজিটালি রাইটের প্রধান মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, বিনামূল্যের এআই টুলগুলি অত্যাধুনিক জাল তথ্য তৈরিকে সহজ করে তুলেছে।
আরেকটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর ভিডিওতে দেখা যায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার প্রসংশা করছেন বাংলাদেশিরা।
ভারতের ঘরোয়া আইপিএল লিগে একমাত্র বাংলাদেশি ক্রিকেট খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে হিন্দু মৌলবাদীদের সোশ্যাল মিডিয়া ক্ষোভের ফলে তার ক্লাব তার চুক্তি বাতিল করে দেয়, এই ক্ষোভের ফলে বাংলাদেশের জাতীয় দল এই মাসে ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেয়।
‘বড় হুমকি’
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের পরিচালক (জনসংযোগ) মো. রুহুল আমিন মল্লিক বলেছেন, তারা ফেসবুকের মূল কোম্পানি মেটার সাথে কাজ করছেন এবং সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টগুলি পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি ইউনিট গঠন করেছেন। তবে অনলাইনে এই বিপুল সংখ্যক অপতথ্যের মোকাবিলা করা একটি কঠিন কাজ।
‘যদি আমাদের দল কোনও বিষয়বস্তু ক্ষতিকারক এবং বিভ্রান্তিকর হিসাবে সনাক্ত করে, আমরা তাৎক্ষণিকভাবে এটিকে জাল তথ্য হিসাবে ঘোষণা করি,’ মল্লিক বলেন।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন টুলি, যিনি নির্বাচন কমিশনের প্রাক্তন কর্মকর্তা, বলেছেন যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-উত্পাদিত ছবিগুলি বাংলাদেশের জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি বহন করে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে, শহুরে এলাকার ৮০ শতাংশেরও বেশি পরিবারের কমপক্ষে একটি স্মার্টফোন আছে এবং গ্রামীণ এলাকার প্রায় ৭০ শতাংশের কাছে স্মার্ট ফোন আছে। তবে অনেক মানুষ এখনও প্রযুক্তির সাথে তুলনামূলকভাবে নতুন।
‘এটি বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য একটি বড় হুমকি, কারণ তথ্য যাচাই করার জন্য মানুষের তেমন সচেতনতা নেই,’ তুলি বলেন।
‘এআই-জেনারেটেড ভুয়া ভিজ্যুয়ালের কারণে, ভোটাররা তাদের সিদ্ধান্তে ভুল পথে চালিত হচ্ছেন।’