একটি গ্রহণযোগ্য, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে যাদের মাঠে থাকার কথা, সেই স্থানীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষকরাই সবচেয়ে অবহেলার শিকার। বিদেশি পর্যবেক্ষকদের জন্য পাঁচ তারকা হোটেল, গাড়ি ও আনুষঙ্গিক সব সুবিধা নিশ্চিত হলেও, নিজ দেশের ৫৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবী পর্যবেক্ষকের তিন দিনের থাকা খাওয়ার ন্যূনতম ব্যয় দিতেও অনাগ্রহ দেখাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইসির এমন উদাসীনতায় হতাশা প্রকাশ করে অভিযোগ তুলেছে ইলেকশন অবজার্ভার সোসাইটি (ইওএস)।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬: দেশব্যাপী সার্বিক অবস্থা ও স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের অবস্থান’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান ইওএস নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করে ইওএস সভাপতি মো. ইকবাল হোসেন হীরা বলেন, নির্বাচনে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের থাকা–খাওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশন পাঁচ তারকা হোটেলের ব্যবস্থা করলেও স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের বিষয়ে কমিশনের কোনো আগ্রহ নেই। বিষয়টি অত্যন্ত হতাশাজনক।
তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী অধিকাংশ স্থানীয় পর্যবেক্ষক প্রথমবারের মতো মাঠে কাজ করবেন এবং তারা সম্পূর্ণ ভলান্টারি ভিত্তিতে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করেছেন।
ইওএস সভাপতি বলেন, আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে থাকা খাওয়া কিংবা অর্থনৈতিক সহায়তা নিচ্ছি না।কারণ অতীতে দলীয় অর্থায়নে পর্যবেক্ষণ করে অনেকেই পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন দিয়েছেন, আমরা সেই পথ এড়াতে চাই।
তিনি আরও বলেন, ইসির কাছে নির্বাচনকালীন মাত্র তিন দিনের থাকা খাওয়ার খরচ চাওয়াটাও আমাদের জন্য লজ্জার। কিন্তু নিরপেক্ষতা রক্ষার স্বার্থে আমরা রাজনৈতিক দলের সহায়তা নিতে চাই না।
ইওএস সভাপতি অভিযোগ করে বলেন, বিপুলসংখ্যক পর্যবেক্ষকের ন্যূনতম খরচ বহন করা সংগঠনের পক্ষে সম্ভব নয় জানালেও কমিশন থেকে বলা হয়েছে, আপনাদের পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকার প্রয়োজন নেই।
সারা দেশে ৬৯৯৫ কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ, ঢাকায় ১০৩টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ— এমন তথ্য দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত লিখিত বক্তব্যে ইওএস জানায়, দেশব্যাপী প্রায় ৪২ হাজার ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৬ হাজার ৯৯৫টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা জেলাতেই ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা ১০৩টি। এসব তথ্য মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষকদের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, দেশের অধিকাংশ ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগে আগ্রহী হলেও নানা ধরনের প্রচারণা ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের কারণে নির্বাচন নিয়ে কিছুটা সংশয় এখনো রয়ে গেছে। ইতোমধ্যে ইওএস পর্যবেক্ষকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে এবং এবারই প্রথমবারের মতো ৫৫ হাজার পর্যবেক্ষক সম্পূর্ণ ভলান্টারি ভিত্তিতে, কোনো আর্থিক সহায়তা ছাড়াই দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছে।
ইওএস অভিযোগ করে জানায়, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো বিপুল ব্যয় করলেও ৫৫ হাজার পর্যবেক্ষকের মাত্র তিন দিনের খাবার ও যাতায়াত খরচের বিষয়ে বারবার আহ্বান জানানো সত্ত্বেও কমিশন কোনো সাড়া দেয়নি।
সংগঠনটি জানায়, দাবির পক্ষে সংস্থাপ্রধানেরা কমিশনের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করলেও কর্তৃপক্ষ আলোচনার জন্য কোনো প্রতিনিধি পাঠায়নি, এমনকি স্মারকলিপিও গ্রহণ করা হয়নি। অথচ রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে কমিশনের ম্যারাথন বৈঠক চলেছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, এই পরিস্থিতিতে ইওএসের অন্তর্ভুক্ত সংস্থাগুলো সম্মিলিতভাবে সব পর্যবেক্ষক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিলেও, দেশব্যাপী সাধারণ মানুষের নির্বাচনী প্রত্যাশা এবং জাতীয় স্থিতিশীলতার স্বার্থে আপাতত সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে জানানো হয়।
নির্বাচনী পরিচয়পত্র নিয়ে ভোগান্তির কথা জানিয়ে ইওএস-এর লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, পর্যবেক্ষক পরিচয়পত্র কখনো অনলাইন, কখনো অফলাইন পদ্ধতিতে ইস্যু করার সিদ্ধান্তে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে। যদিও শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচন কমিশন সহযোগিতা করছে, তবে স্থানীয় পর্যায়ে অনেক জেলা এখনো পরিচয়পত্র পেতে বিলম্ব ও জটিলতার মুখে পড়ছে।
গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ইওএস বলে, এই ৫৫ হাজার পর্যবেক্ষকের থাকা–খাওয়ার অর্থায়ন কীভাবে হবে এবং এর দায় কমিশনের কি না, সে প্রশ্নটি গণমাধ্যমের কলমে জোরালোভাবে উঠে আসা জরুরি।
লিখিত বক্তব্যে ইওএস জানায়, এবার ৩০০ আসনেই পর্যবেক্ষক মোতায়েন করা হয়েছে। তবে ৪২ হাজারের বেশি কেন্দ্রের বিপরীতে ৫৫ হাজার পর্যবেক্ষক থাকায় গড়ে প্রতিটি কেন্দ্রে দুইজনেরও কম পর্যবেক্ষক দায়িত্ব পালন করছেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ইওএসের প্রধান সমন্বয়কারী শহীদুল ইসলাম আপ্পি, সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন আমীন, সিনিয়র সহ-সভাপতি ফেরদৌস আহমেদ, সহ-সভাপতি বশির আহমেদসহ কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ।