বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন চট্টগ্রাম বন্দর। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে এ বন্দরে অচলাবস্থা চলছে। শত শত জাহাজ আটকে আছে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বন্ধ ছিল মাল ওঠানামাসহ সব ধরনের কাজ।
শত শত কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। সারা বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। বিদেশি জাহাজ কোম্পানিগুলো দিনের পর দিন অপেক্ষায় থেকে অতিষ্ঠ। ভবিষ্যতে এ বন্দরে তারা আসবে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।চট্টগ্রাম বন্দর অচল হলে এ দেশের আমদানি-রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। এটি একটি জরুরি সেবা।
প্রশ্ন উঠেছে, আন্দোলন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তো নৌপরিবহন উপদেষ্টার তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তিনি নেননি।
নৌপরিবহন উপদেষ্টার ঘুম ভাঙল ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ প্রকাশের পর। টানা কর্মবিরতির কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে সৃষ্ট অচলাবস্থায় উদ্বেগ জানান বন্দর ব্যবহারকারীরা।
এ নিয়ে গত বুধবার সন্ধ্যায় আগ্রাবাদে একটি হোটেলে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে তারা বৈঠকে বসেন। বৈঠক শেষে ব্যবহারকারীদের পক্ষে বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি এম এ সালাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা বসেছিলাম এবং বিশদ আলোচনা হয়েছে প্রায় ৪ ঘণ্টা। আপনারা জানেন যে সামনে ইলেকশন, তিন দিনের ছুটি।ঠিক এর সাত-আট দিন পর রমজান। রমজানের পণ্যগুলো কীভাবে ডেলিভারি হবে সেগুলো নিয়ে আমরা চিন্তিত। গার্মেন্টস সেক্টর বিশেষ করে ফেব্রুয়ারিতে কাজ করবে মাত্র ১৮ দিন, মার্চে কাজ করবে মাত্র ১৬ থেকে ১৭ দিন। এভাবে যদি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকে, তাহলে প্রেজেন্ট পণ্যগুলো যাবে না আবার ভবিষ্যৎ পণ্যগুলো আসবে না। আমরা অসম্ভব ক্ষতির মুখে আছি, বিশেষ করে ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর এবং রমজানের উসিলায় পুরো দেশবাসী।’
তিনি বলেন, বন্দর যদি এভাবে বন্ধ থাকে, বন্দরের যে চার্জেসগুলো আসবে এগুলোর সব দায়ভার ব্যবসার ওপর আসবে। ব্যবসার ওপর এলে তো আর ব্যবসায়ীরা দেবেন না, আলটিমেটলি এটা কনজ্যুমারের ওপর যাবে। সেজন্যই আমরা ওরিড।’ বন্দরকে বাংলাদেশের লাইফলাইন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বন্দর চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করব ৯০ পারসেন্ট এক্সপোর্ট ইমপোর্ট, যেটা চিটাগাং পোর্টের মাধ্যমে হয়, এটা দিনের পর দিন বন্ধ থাকতে পারে না।
চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে সরকারের উদাসীনতার তীব্র সমালোচনা করেন ব্যবসায়ী নেতারা। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের ঘুম ভাঙে ছয় দিন পর। গত বৃহস্পতিবার নৌপরিবহন উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন অবশেষে যান বন্দর পরিদর্শনে। তিনি আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। চট্টগ্রাম বন্দরে আন্দোলনের মধ্যে এসে শ্রমিক-কর্মচারীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে বন্দরের ৪ নম্বরে ফটকের বাইরে তিনি আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীদের তোপের মুখে পড়েন। অবশেষে আলোচনার মাধ্যমে দুই দিনের জন্য কর্মবিরতি স্থগিত করেন আন্দোলনকারীরা। কিন্তু এটা সমাধান নয়। চট্টগ্রাম বন্দরকে সচল রাখতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। কনটেইনার টার্মিনাল ইজারার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে চলমান আন্দোলন ঘিরে চট্টগ্রাম বন্দরে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলেছেন, সংসদ নির্বাচনের আগে এসে বন্দরের এ অচলাবস্থা ‘মহাবিপর্যয়’ ডেকে আনতে পারে। এখনই সমাধান না হলে সংকট থেকে উত্তরণ কারও পক্ষেই সম্ভব হবে না বলেও সতর্ক করে দিয়েছেন তারা। বৃহস্পতিবার দেশের ১০ বাণিজ্য সংগঠনের যৌথ বিবৃতিতে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। সংগঠনগুলো বলেছে, বন্দরে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকলে রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য নাগালের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিবৃতি দেওয়া সংগঠনের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন, বিসিআই, এমসিসিআই, ডিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ, বিটিটিএলএমইএ, বিজিএপিএমইএ এবং বিজিবিএ।
চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে অচলাবস্থা বর্তমান সরকারের সৃষ্টি। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি প্রক্রিয়া ঘিরে শুরু হয় লাগাতার আন্দোলন। শ্রমিক সংগঠনগুলোর কর্মসূচির কারণে বিঘ্নিত হচ্ছে অপারেশনাল কাজ। কনটেইনার ডেলিভারি একেবারেই কমে গেছে। প্রাইভেট আইসিডি থেকে রপ্তানি কনটেইনার জাহাজে তোলা হচ্ছে সীমিতভাবে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙরে বড় বড় জাহাজে আটকা পড়েছে লাখ লাখ টন ভোগ্যপণ্য। বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, এনসিটি পরিচালনায় অপারেটর কে তা নিয়ে আমাদের কোনো চিন্তা নেই। আমরা চাই যেভাবে হোক এনসিটিতে দ্রুত সময়ের মধ্যে পণ্য ওঠানামা শেষ করতে। বন্দরকে গতিশীল করতে। অন্যদিকে শ্রমিক নেতারা বলছেন, আমরা চেয়েছিলাম ডিপি ওয়ার্ল্ডের মাধ্যমে এনসিটি পরিচালনার বিষয়ে আমাদের সঙ্গে আলোচনা হোক। কিন্তু আমাদের কোনো পাত্তাই দিচ্ছে না সরকার কিংবা বন্দর কর্তৃপক্ষ। এখন আমাদের কর্মসূচি থেকে সরে আসার কোনো সুযোগ নেই।
দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় নিউমুরিং কনটেইনার (এনসিটি) ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। চলতি মাসেই চুক্তির পর বিদেশি অপারেটর দ্বারা এনসিটি পরিচালনা শুরুর কথা। এর মধ্যে নতুন একটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ এবং একটি পুরোনো টার্মিনাল হ্যান্ডলিং করার চুক্তি স্বাক্ষরও করা আছে আগেই। গত বছরের ১৭ নভেম্বর ঢাকার একটি হোটেলে চুক্তি স্বাক্ষর হয়। পৃথক অনুষ্ঠানে চুক্তি দুটি স্বাক্ষর হয়। লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নিয়ে চুক্তিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং এপিএম টার্মিনালসের ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্টেইন ভ্যান ডোঙ্গেন স্বাক্ষর করেন। পানগাঁও আইসিটি নিয়ে করা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও মেডলগ বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ টি এম আনিসুল মিল্লাত। চুক্তি অনুযায়ী এপিএম টার্মিনালস চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ এবং পরিচালনায় ৩৩ বছরের জন্য দায়িত্ব পেয়েছে। এ সময়ের প্রথম তিন বছরে টার্মিনাল নির্মাণ ও পরবর্তী ৩০ বছর পরিচালনার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাবলিক-পার্টনারশিপের (পিপিপি) চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া চরে টার্মিনাল নির্মাণের জন্য ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বা ৫৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে এপিএম। চুক্তি স্বাক্ষরের দিনই সাইনিং মানি হিসেবে ২৫০ কোটি টাকা পেয়েছে বাংলাদেশ। এখন চলছে এনসিটি পরিচালনার চুক্তি প্রক্রিয়া। এনসিটি পরিচালনা দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে এনসিটির পরিচালনার মেয়াদ শেষ হয় বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারের সঙ্গে। এরপর থেকে এনসিটি পরিচালনা করছে নৌবাহিনীর চিটাগাং ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিডিএল)। বেশ দক্ষভাবে পরিচালনা করছে ড্রাইডক। উৎপাদনশীলতায় গড়েছে রেকর্ড। এর মধ্যে দাবি উঠেছে ড্রাইডকের মাধ্যমে পরিচালনা অব্যাহত রাখার। কিন্তু সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে ডিসেম্বরেই ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছিল।
নৌ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন একাধিকবার বলেছিলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি পরিচালনার কাজ দেওয়া হবে। গত জুন মাস থেকে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি ছেড়ে না দিতে গড়ে উঠেছে শ্রমিক সংগঠনগুলোর আন্দোলন। এর মধ্যে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির চলমান প্রক্রিয়ার বৈধতার প্রশ্নে রিট হয় উচ্চ আদালতে। চূড়ান্ত রায়ে বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে চুক্তির বাধা কেটে যাওয়ার পরই ক্ষেপে যান শ্রমিক নেতারা। এরপর এক সপ্তাহ ধরে দফায় দফায় আন্দোলন করে বন্দর কার্যক্রম অচল করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যেহেতু দেশে এখন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তাই চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত এখন নেওয়া উচিত নয়। একটি রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে সরকারের অতি আগ্রহ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এর ফলে নানামুখী ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশ।
একদিকে অচলাবস্থার কারণে আমদানি রপ্তানির বিপুল ক্ষতি হচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এ ক্ষতির ভার বহন করা কঠিন হয়ে যাবে।
অন্যদিকে, এর ফলে অনেক বিদেশি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসতে চাইবে না। দিনের পর দিন অপেক্ষার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে কালো তালিকাভুক্ত হবে। এরকম পরিস্থিতি চট্টগ্রাম বন্দরের অকালমৃত্যু ঘটাতে পারে। তাই অবিলম্বে সরকারের উচিত, একগুঁয়েমি থেকে বের হয়ে আসা। পুরো বিষয়টি নির্বাচিত সরকারের হাতে ছেড়ে দেওয়া। মনে রাখতে হবে, চট্টগ্রাম বন্দর না বাঁচলে বাংলাদেশের অর্থনীতি বাঁচবে না।
সৌজন্যে: বাংলাদেশ প্রতিদিন