‘তখন মায়ের সঙ্গে গিয়েছিলাম, এবার মেয়েকে নিয়ে এলাম’

‘তখন মায়ের সঙ্গে গিয়েছিলাম, এবার মেয়েকে নিয়ে এলাম’

টিএসসিতে ঢুকতেই কানে আসে, ‘সেই মেয়েটি আমাকে ভালোবাসে কি না, আমি জানি না’। ‘মৌসুমী’ সিনেমায় গাজী মাজহারুল আনোয়ারের কথায় ও আনোয়ার পারভেজের সুরে গানটি গেয়েছিলেন প্রয়াত কণ্ঠশিল্পী খালিদ হাসান মিলু। উৎসবের টিকিট কাউন্টারে এ গান দিয়েই দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছিলেন আয়োজকেরা। এরপর একে একে বাজতে থাকে বাংলা সিনেমার আরও গান।

ততক্ষণে টিকিট কাউন্টারে লম্বা লাইন। কেউ এসেছেন পরিবার নিয়ে, কেউ একা। কারও হাতে দুই টিকিট, কারও পাঁচটি। টিএসসির আঙিনাজুড়ে একধরনের উৎসবমুখর আবহ।

এদিন শুরু হয় সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দেয়া নেয়া’ প্রদর্শনী দিয়ে। দুপুর সাড়ে ১২টার শিডিউলে ছিল আলমগীর কবীর পরিচালিত ‘সূর্যকন্যা’। এ সিনেমা দেখতেই মূলত দর্শকের ভিড়। ১৯৭৫ সালে মুক্তি পাওয়া বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনার ছবিটির জন্য লাইনে বয়োজ্যেষ্ঠ দর্শকই বেশি চোখে পড়ে।

দর্শকদের একজন মল্লিকা দাস। স্বামী, বোন ও কন্যাকে নিয়ে এসেছেন সিনেমাটি দেখতে। শৈশবে প্রথমবার ছবিটি দেখেছিলেন তিনি। প্রথম আলোকে মল্লিকা দাস বলেন, ‘ছোটবেলায় সিনেমাটা দেখেছিলাম। এখানে আবার বড় পর্দায় দেখাবে শুনে সবাই মিলে চলে এলাম। তখন মায়ের সঙ্গে গিয়েছিলাম, এবার মেয়েকে নিয়ে এলাম।’
কথা বলতে বলতে মল্লিকার স্বামী নিরঞ্জন দাস যোগ করেন, ‘আলমগীর কবীরের মতো আধুনিক নির্মাণ এখনকার নির্মাতারা কল্পনাও করতে পারবেন না। তাঁর প্রতিটি সিনেমাই অসাধারণ।’

উত্তরা থেকে স্ত্রীসহ এসেছেন কৃষি কর্মকর্তা সবুর হোসেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আলমগীর কবীর, বুলবুল আহমেদ, গোলাম মুস্তাফা থেকে শুরু করে সম্প্রতি প্রয়াত জয়শ্রী কবির—একজন একজন করে সবাই চলে গেলেন। কিন্তু তাঁদের কাজ রয়ে গেছে। ফেসবুকে দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছবিটি দেখানো হবে, তাই পরিবার নিয়ে চলে এলাম।’

সাড়ে ১২টায় শিডিউল থাকলেও সিনেমা শুরু হয় বেলা ১টায়। অডিটোরিয়াম পুরো ভরে না উঠলেও উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ছবির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন বুলবুল আহমেদ, গোলাম মুস্তাফা, সুমিতা দেবী, ‘মিস ক্যালকাটা’ জয়শ্রী কবির, সৈয়দ আহসান আলী সিডনি ও রাজশ্রী বোস।

‘সূর্যকন্যা’য় বুলবুল আহমেদ অভিনীত লেনিন একজন স্বপ্নবান চিত্রশিল্পী। অবসরপ্রাপ্ত চাকুরে বাবা চান ছেলে ডাক্তার হোক। কিন্তু লেনিন শিল্পকেই বেছে নেয়। এই পছন্দ থেকেই পরিবারে টানাপোড়েন শুরু হয়। লেনিন বিশ্বাস করে, রং ও তুলির শক্তিতেই অন্যায়-অবিচার মুছে দিয়ে গড়া সম্ভব নতুন এক মানবিক পৃথিবী। তার কল্পনায় সাম্যবাদী সমাজ—রেসকোর্স ময়দানে দাঁড়িয়ে সে সবার জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার স্বপ্ন দেখে।

বন্ধু রাসেলের দোকানে কাজ নিতে গিয়ে লেনিন এক পুতুলের প্রেমে পড়ে। তার নাম দেয় ‘লাবণ্য’। ধীরে ধীরে পুতুলটি তার কাছে জীবন্ত হয়ে ওঠে। এই পুতুলের মুখ দিয়েই উঠে আসে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর দমিত আকাঙ্ক্ষা ও নিপীড়নের কথা। পরিচালক এখানে পুতুলকে প্রতীকের মতো ব্যবহার করেছেন, যেন সমাজে নারীকে কীভাবে বস্তুতে পরিণত করা হয়, তারই প্রতিফলন।

ছবির আরেক গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব রাসেল ও তার প্রেমিকা মনিকাকে ঘিরে। রাসেল নারীকে দেখে ভোগের চোখে। তার বিশ্বাস, স্ত্রীর পরিচয়ই নারীর চূড়ান্ত প্রাপ্তি। এর বিপরীতে মনিকা স্বাধীনচেতা, আত্মবিশ্বাসী ও স্বনির্ভর। ভালোবাসার নামে অপমান মেনে না নিয়ে নীরব কিন্তু দৃঢ় প্রতিবাদ জানায় সে। এই চরিত্রের মধ্য দিয়েই নারীর আত্মমর্যাদা ও শক্ত অবস্থান তুলে ধরেছেন পরিচালক।

ছবিতে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘আমি যে আঁধারের বন্দিনী’ গানটি যেন নারী মুক্তির প্রতীক। গানটির সময় অডিটোরিয়ামে নেমে আসে নীরবতা। নারীচেতনা ও শিকল ভাঙার আকাঙ্ক্ষাই এই ১০৮ মিনিটের চলচ্চিত্রের মূল বার্তা।

ছবির সংগীত করেছেন সত্য সাহা। বাস্তব ও কল্পনার দৃশ্যপটজুড়ে তাঁর সংগীতে মুনশিয়ানা স্পষ্ট। এম এ মবিনের চিত্রগ্রহণে পাঁচ দশক আগের ঢাকায় যেন ফিরে যাওয়া যায়—রেসকোর্স ময়দান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগ থেকে বিমানবন্দর, সবই যেন টাইম ট্রাভেলের অনুভূতি দেয়।

আলমগীর কবীরের ‘সূর্যকন্যা’ সময় অতিক্রম করে আজও প্রাসঙ্গিক। গত বছর সিনেমাটি মুক্তির ৫০ বছর পূর্ণ করেছে। পাঁচ দশক পরও ছবিটি যে জীবন্ত, এ প্রদর্শনীই তার প্রমাণ।
‘আমার ভাষার চলচ্চিত্র’ উৎসবে নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে ২০টি পূর্ণদৈর্ঘ্য ও ৩টি স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা দেখানো হচ্ছে। ‘সূর্যকন্যা’র পর গতকাল প্রদর্শিত হয়েছে শরাফ আহমেদের ‘চক্কর ৩০২’ ও রায়হান রাফীর ‘তাণ্ডব’। ৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হবে উৎসব।

আজ উৎসবের তৃতীয় দিন। এদিন দেখানো হবে সালাউদ্দিন পরিচালিত ‘রূপবান’, সাদিক আহমেদের ‘দ্য লাস্ট ঠাকুর’, পিপলু খানের ‘জয়া আর শারমিন’ ও মনিরুল হক পরিচালিত ‘ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’। গণরুম ও ছাত্ররাজনীতির গল্প নিয়ে নির্মিত সিনেমাটি এবারের ২৪তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশ প্যানোরামা বিভাগে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS