প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পে (এলডিডিপি) ম্যাচিং গ্রান্ট বিতরণে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে অনুদান বরাদ্দ দিয়ে প্রায় দেড় কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য পেয়েছে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় ‘কেসি এগ্রো’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে সরকারি ভর্তুকি হিসেবে ২ কোটি ৬১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানের নামে কোনো বাস্তব কাজ না হলেও ড. হারুন অর রশিদ প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা উৎকোচ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং পুরো অর্থ আত্মসাৎ করেন।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে কেসি এগ্রোর বাস্তব অস্তিত্ব ও কার্যক্রম না থাকার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রাণিসম্পদ খাতে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে দেশের ৬১টি জেলায় (পার্বত্য জেলা ব্যতীত) প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয় ৪ হাজার ২৮০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি শুরু হওয়া এই প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ ছিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়িয়ে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। রংপুর সদর উপজেলায় ডেইরি ফার্মের নামে একটি মিষ্টির দোকানে অনুদান দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আবার ফিড মিলের নামে অনুদান পাওয়া কিছু প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
এসব অনিয়ম তদন্ত করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর প্রায় ৫ কোটি টাকার অনিয়মের প্রমাণ পেলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়নি।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, শাস্তিহীনতার সংস্কৃতি প্রাণিসম্পদ খাতে দুর্নীতিকে আরও উৎসাহিত করছে। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্প্রতি প্রাণিসম্পদ খাতে একের পর এক বড় দুর্নীতির তথ্য সামনে আসছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়ন না করেই কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অর্থ আত্মসাৎ হওয়ায় রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় বাড়ছে এবং খাতটি গভীর সংকটে পড়ছে।
প্রকল্প নীতিমালা অনুযায়ী, ম্যাচিং গ্রান্ট পেতে আবেদনকারীকে প্রস্তাবিত বাজেটের অন্তত ৬০ শতাংশ নিজস্ব অর্থায়নে বহন করার কথা। কিন্তু রংপুর সদর উপজেলায় খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, এই শর্ত পূরণ না করেই ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে কয়েক কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
এছাড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোশারফ হোসেন যোগদানের পর ‘ব্যাকডেটে’ অনুদান আবেদন দেখিয়ে জালিয়াতি করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। পূর্বে বাতিল হওয়া আবেদনগুলো প্রধান কার্যালয়ের উপ-প্রকল্প পরিচালক ড. হারুন অর রশিদের সহযোগিতায় পুনরুজ্জীবিত করা হয়। পরে উৎকোচের বিনিময়ে অনুদান উত্তোলনের সুপারিশ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ড. মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ দাবি করেন, এসব অভিযোগ হাস্যকর ও বানোয়াট। যার মনে যা আসে তাই লিখছে। চুক্তি অনুযায়ী কেসি এগ্রো যতটুকু কাজ করেছে, ততটুকুই বিল দেওয়া হয়েছে।
প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. মোস্তফা কামাল বলেন, কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।