ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ‘আমাদের বলা হয়েছে, শুধু আমলাতন্ত্রের একাংশ সংস্কার চায় না। কিন্তু উপদেষ্টা পরিষদের অন্তত সাতজন সদস্য তাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এ বিষয়টি আমাদের অত্যন্ত আশাহত করেছে। সংস্কার কমিশনের জমা দেওয়া দু-একটি সুপারিশ বাস্তবায়ন হলেও এর ফলে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
বরং কিছু কৌশলগত সুপারিশ উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাতিল করা হয়েছে।’ সম্প্রতি দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকার অনেক ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সংস্কার কমিশনগুলো গঠিত হয়েছে, ঐকমত্য কমিশন হয়েছে, একাধিক হোয়াইট পেপার কমিটি হয়েছে, বিচার বিভাগ স্বাধীন করার জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
এ রকম আরও অনেক দৃষ্টান্ত আমি দিতে পারব। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, যে সংস্কার প্রস্তাবগুলোর ব্যাপারে সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য আছে, এমনকি কোনো নোট অব ডিসেন্টও নাই, সেই মৌলিক সুপারিশগুলো এ সরকার বাস্তবায়ন করতে পারেনি।’
তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র সংস্কারের ঘোষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি সরকারকাঠামো তৈরি করা। যে মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব সেসব প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন কমিশন গঠন করে।
পরবর্তীতে কমিশনের অনেক কৌশলগত সুপারিশ উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাতিল করা হয়। উদাহরণস্বরূপ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন কিংবা পুলিশ কমিশনের কথা যদি বলি, প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে প্রতিষ্ঠানগুলোতে অ্যাডহক ভিত্তিতে সংস্কারগুলো হয়েছে, যে কারণে আমরা অনেক হতাশ।’
অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান বলেন, ‘সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো দেশীয় অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন মানদণ্ড অনুসরণ করে করা হয়েছে। আমাদের প্রতিবেদনটি সবচেয়ে কম সময়ে, কম সুপারিশে, খুবই স্পেসেফিকভাবে ৪৭টি সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সরকার আমাদের কাছ থেকে আশু করণীয় সুপারিশগুলো জানতে চায়।যার মধ্যে কিছু সুপারিশ সরকারের সিদ্ধান্তে হবে, কিছু অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে হবে আর কিছু দুর্নীতি দমন কমিশন নিজে বাস্তবায়ন করবে। গত বছরের মার্চে এ সুপারিশগুলো সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সেখানকার আশু করণীয় সুপারিশগুলোর মধ্যে দু-একটি হয়তো বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে এর মাধ্যমে কিছুই অগ্রগতি হয় নাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চেয়েছি দুদক একটি সিম্পল কাজ করবে। একটি স্বাধীন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক কমিটি থাকবে। বাছাই কমিটি নামে যে কমিটি থাকবে এটি তারই পরিবর্তিত রূপ। সেই পর্যবেক্ষক কমিটি ছয় মাস পর দুদকের কার্যক্রম পরিচালনা করবে। সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে একবার আমি দুদকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এক ঘণ্টার বৈঠকে সংস্কারের ব্যাপারে তাদের রাজি করাতে পেরেছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেল সুপারিশগুলো বাতিল করা হয়ে গেছে। এখানটাই হচ্ছে অন্তর্ঘাত। অনেকেই চাইছেন না দুদক কার্যকর হোক, দুদকে জবাবদিহি থাকুক, স্বাধীনতার পাশাপাশি তারা এটাকে প্রতিহত করছে। আমাদের বলা হয়েছে, শুধু আমলাতন্ত্রের একাংশ সংস্কার চায় না। কিন্তু উপদেষ্টা পরিষদের অন্তত সাতজন সদস্য তাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এ বিষয়টি আমাদের অত্যন্ত আশাহত করেছে।’
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘দুদকের অভ্যন্তরে অত্যন্ত জোরালোভাবে দুর্নীতি বিরাজ করছে। এমন কর্মকর্তাও আছেন যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, যাঁদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান তদন্ত করার কথা, তাঁরা নিয়মিত পে রুলে আছেন-এ রকম কথাও বলা হয়। আমাদের সুপারিশটি এ ক্ষেত্রে খুব সহজ ছিল। যাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আছে তাঁদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে হবে এবং আদালতে সোপর্দ করতে হবে। এসবের কিছুই এখন পর্যন্ত হয়নি। শুধু একটা অধ্যাদেশ হয়েছে; যার মাধ্যমে শুধু দুদক আইন-২০০৪-এর সংস্কার হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘যারা ক্ষমতায় আছেন এবং যারা ক্ষমতা কাঠামোর কাছাকাছি আছেন তাদেরই মৌলিক দায়িত্ব দুর্নীতি প্রতিরোধ। চারটি উপাদান লাগে দুর্নীতি প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণের জন্য। প্রথমত রাজনৈতিক সদিচ্ছা। দ্বিতীয়ত যাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত পরিচয়-অবস্থান নির্বিশেষে সবাইকে জবাদিহির আওতায় আনতে হবে। আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সেটা করতে হবে। কোনো প্রকার হয়রানিমূলক নয়, বাস্তবেই যাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, তাঁদের জবাবদিহি করতে হবে। তৃতীয়ত শুধু দুর্নীতি দমন কমিশন নিয়ে আমরা আলোচনা করি, এটির অবশ্য মৌলিক দায়িত্ব, পাশাপাশি অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যেগুলোকে কার্যকর জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। চতুর্থত দেশের প্রতিটি মানুষকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। সাধারণ মানুষকেই বলতে হবে-রাজনৈতিক সদিচ্ছা চাই, দুর্নীতি যারা করে তাদের বিচার চাই, যে প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব তাদের কার্যকরতা চাই, আর আমরা নিজেরাও দুর্নীতিমুক্ত থাকব। এ চারটি উপাদান মিলে কিন্তু দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে আমরা সব সময় দেখে আসছি অর্থ, পেশি আর ধর্ম। জুলাই-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ক্রমাগতভাবে ধর্মকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এটা শুধু ধর্মকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং আমাদের বৃহৎ রাজনৈতিক দল এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে যারা বিকশিত হলো তাদের মধ্যেও ধর্মকে পলিটিক্যাল মাইলেজের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জাতি হিসেবে এটা আমাদের সত্তা, আত্মপরিচয়, স্বাধীনতার মূলমন্ত্র, একাত্তর ও চব্বিশের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও ঝুঁকিপূর্ণ।’
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন