ঝকঝকে পাথর। দেখতে হীরার মতো।হাতে পরলে বা কানে দুললে দূর থেকে বোঝার উপায় নেই আসল হীরা, নাকি অন্য কোনো পাথর। ‘আমেরিকান ডায়মন্ড’ নামে বাজারে পরিচিত এমন গয়নার চাহিদাও কম নয়।কানের দুল, নাকফুল, আংটি, নেকলেস থেকে ব্রেসলেট—বিভিন্ন অলংকারে ব্যবহৃত হচ্ছে এই পাথর। দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের কাছেও এটি বেশ জনপ্রিয়।
কিন্তু ‘আমেরিকান ডায়মন্ড’ কি আসলেই হীরা? সহজ উত্তর—না। বাজারে ‘আমেরিকান ডায়মন্ড’ নামে পরিচিত পাথর মূলত হীরার বিকল্প বা ডায়মন্ড সিমুল্যান্ট।সাধারণত কিউবিক জিরকোনিয়া (সিজেড)–জাতীয় কৃত্রিম পাথর এ কাজে ব্যবহৃত হয়। নামের সঙ্গে ‘আমেরিকান’ শব্দটি থাকলেও এর অর্থ এই নয় যে পাথরটি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি বা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিশেষ ধরনের হীরা।
মোট কথা, হীরার মতো দেখতে হলেই সেটি হীরা নয়। আর ‘আমেরিকান ডায়মন্ড’ নামটিও আসল হীরার পরিচয় নয়। কম দামে হীরার বিকল্প পাথরের গয়না ব্যবহার করায় সমস্যা নেই। সমস্যা তৈরি হচ্ছে তখনই, যখন এই হীরার বিকল্প পাথরকে আসল হীরা বলে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে কম দামে হীরার মতো দেখতে গয়না কিনতে চাওয়া ক্রেতা যেমন প্রতারিত হতে পারেন, তেমনি বাজারে আসল হীরার ব্যবসা নিয়েও তৈরি হতে পারে বিভ্রান্তি।
পুরান ঢাকার জুরাইনের বাসিন্দা সোহেলী আক্তারের অভিজ্ঞতা এমনই বিভ্রান্তিরই এক উদাহরণ। তিনি বাংলানিউজকে জানান, প্রায় আট বছর আগে ঢাকার একটি স্বনামধন্য জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের শোরুম থেকে ১৭ হাজার টাকায় একটি নাকফুল কিনেছিলেন তিনি। দোকানের হীরা পরীক্ষার যন্ত্রে পাথরটি পরীক্ষা করে তাকে জানানো হয়েছিল, এটি আসল হীরা। শখের সেই নাকফুল মাঝেমধ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যবহার করেন। কয়েক বছর পর ব্যবহারে নাকফুলের পাথরটি ধীরে ধীরে কালচে হয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, শখের বশে কেনা নাকফুলটির এ অবস্থা দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। এরপর যেখান থেকে কিনেছিলাম সেখানে নিয়ে গেলে তারা সেটা পরিবর্তন করে দিতে রাজি হয়নি। তখন শিউর হলাম এটি আসল হীরা নয়।
আরেক ক্রেতা আলমগীর হোসেন কয়েক বছর আগে পুরান ঢাকার একটি জুয়েলারি দোকান থেকে ২৫ হাজার টাকায় স্ত্রীকে একটি হীরার নাকফুল কিনে দিয়েছিলেন। এক বছর ব্যবহারের পর পাথরটির উজ্জ্বলতা কমে যায়। পরে পরিচিত একটি স্বর্ণালংকারের দোকানে নিয়ে গেলে তাকে বলা হয়, সেটি হীরা নয়; কৃত্রিম পাথর বা ‘এডি পাথর’, যা বাজারে ‘আমেরিকান ডায়মন্ড’ নামে পরিচিত। ওই পাথরের দাম বড়জোর ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা হতে পারে। অথচ তিনি সেটির জন্য দিয়েছিলেন ২৫ হাজার টাকা।
তিনি বলেন, চাকরিজীবী মানুষ। নির্দিষ্ট আয় দিয়ে চলতে হয়। জুয়েলারি দোকানগুলো যদি এভাবে ঠকায়, তাহলে আমরা কোথায় যাব? দোকান থেকে ক্রয় রসিদও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এক বছর পর সেটা আর খুঁজে পাইনি। পরে দোকানে নিয়ে গেলে তারা বলল, এই গয়না তারা বিক্রিই করেনি। এখন দোষটা কার?
আসল হীরা, ল্যাব-গ্রোন ডায়মন্ড ও ‘আমেরিকান ডায়মন্ড’র পার্থক্য কোথায়?
প্রাকৃতিক হীরা পৃথিবীর গভীরে দীর্ঘ সময় ধরে প্রচণ্ড তাপ ও চাপের মধ্যে কার্বন থেকে তৈরি হয়। আর ল্যাবরেটরিতে তৈরি ল্যাব-গ্রোন ডায়মন্ডও প্রকৃত হীরা—পার্থক্য শুধু উৎপত্তির জায়গায়। এটি প্রাকৃতিকভাবে মাটির নিচে না তৈরি হয়ে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে উৎপাদিত হয়। অন্যদিকে ‘আমেরিকান ডায়মন্ড’ নামে পরিচিত পাথর হীরা নয়। এটি হীরার বিকল্প পাথর। সাধারণত কিউবিক জিরকোনিয়া বা এ ধরনের সিমুল্যান্ট দিয়ে তৈরি হয়। চোখে দেখে তিনটির পার্থক্য করা কঠিন হতে পারে। এ কারণেই ক্রেতাদের মধ্যে বিভ্রান্তির সুযোগ তৈরি হয়।
ডায়মন্ড ব্যবসায়ীরা বলেন, হীরারও বিভিন্ন মান ও ক্যাটাগরি রয়েছে। স্বর্ণের ক্ষেত্রে যেমন ১৮, ২১ ও ২২ ক্যারেটের পার্থক্য রয়েছে, হীরার ক্ষেত্রেও গুণগত বৈশিষ্ট্যের ওপর দামের বড় পার্থক্য হতে পারে। হীরার মূল্যায়নে সাধারণত ক্যারেট, কাট, রং ও স্বচ্ছতা—এই চারটি বিষয়, অর্থাৎ বহুল পরিচিত ‘ফোর সি’ (4Cs), গুরুত্বপূর্ণ। ফলে একই ওজনের দুটি হীরার দামও এক নাও হতে পারে। একটি হীরার কাট, রং ও স্বচ্ছতা ভালো হলে তার দাম অন্যটির চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। তাই কম দামের হীরা মানেই নকল—এমন ধারণা যেমন ভুল, তেমনি হীরার মতো দেখতে পাথরকে শুধু কম দাম বা বেশি ঝলকের কারণে হীরা ধরে নেওয়াও ভুল।
অনলাইনে বেশি ঝুঁকি
ঢাকার তাঁতিবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার একাধিক জুয়েলারি ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘আমেরিকান ডায়মন্ড’ বা হীরার বিকল্প পাথর খুব কম দামে পাওয়া যায়। কিন্তু অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এসব পাথর হাজার হাজার টাকায় বিক্রি করছেন। তাদের অনেকের দোকান নেই, নিবন্ধিত ঠিকানা নেই, এমনকি নির্ভরযোগ্য যোগাযোগের তথ্যও থাকে না। চটকদার বিজ্ঞাপন, অবিশ্বাস্য মূল্যছাড় ও ‘হীরার গয়না’ জাতীয় প্রচারণার মাধ্যমে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এসব অনলাইন বিক্রেতার বড় অংশকে শনাক্ত করা কঠিন। ফলে প্রতারণা হলে ক্রেতারাও পরে বিপাকে পড়েন। কম দামে হীরার মতো দেখতে পাথর কিনতে আপত্তি নেই। কিন্তু সেটিকে আসল হীরা হিসেবে বিক্রি করাই প্রতারণা।
ঘরোয়া পরীক্ষায় কি আসল হীরা চেনা যায়?
আসল হীরা শনাক্ত করার জন্য বাজারে নানা ঘরোয়া পরীক্ষার কথা প্রচলিত রয়েছে। যেমন—ফগ টেস্ট, পানিতে ফেলা, খবরের কাগজের লেখা দেখা বা পাথরের ঝলক পর্যবেক্ষণ। কিন্তু এসব কোনো পরীক্ষাই চূড়ান্ত নয়।
হীরার তাপ পরিবাহক বেশি হওয়ায় নিঃশ্বাসের বাষ্প দ্রুত সরে যেতে পারে—এমন ধারণা থেকে ‘ফগ টেস্ট’ প্রচলিত। আবার একই আকারের পাথরের মধ্যে কিউবিক জিরকোনিয়া তুলনামূলক ভারী হতে পারে। খবরের কাগজের লেখা স্পষ্ট দেখা না যাওয়ার বিষয়টিও হীরার প্রতিসরণাঙ্কের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধরা হয়। তবে পাথরের কাট, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, আলো, পরিবেশের তাপমাত্রা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের কারণে এসব পরীক্ষার ফল বদলে যেতে পারে। তাই দামি হীরা কেনার ক্ষেত্রে ঘরোয়া পরীক্ষা নয়, স্বীকৃত জেমোলজিক্যাল ল্যাবরেটরির পরীক্ষাই সবচেয়ে নিরাপদ।
বাংলাদেশে হীরা উৎপাদিত হয় না। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের পর বৈধ হীরা আমদানি প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও হীরা আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় শূন্য। অথচ দেশে হীরার বাজারের আকার ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
বাজারে এই বিপুল ‘হীরা’ আসছে কোথা থেকে?
সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ বলছেন, বাজারে বৈধ আমদানি ছাড়াও চোরাচালানের মাধ্যমে আসা পাথর রয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে ল্যাবে তৈরি ডায়মন্ড, মোজানাইট, জারকন, কিউবিক জিরকোনিয়া বা এমনকি কাচও হীরার নামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব দাবির সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান ও উৎস নিয়ে আরও কার্যকর সরকারি নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
নিবন্ধিত ডায়মন্ড ব্যবসায়ী মাত্র ৩৫০ জন
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত প্রায় ৪০ হাজার সদস্যের মধ্যে প্রায় ৩৫০ জন ডায়মন্ড ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাদের দাবি, নিবন্ধিত কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে নকল ডায়মন্ডকে আসল হীরা হিসেবে বিক্রির অভিযোগ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরেও এ ধরনের অভিযোগের উল্লেখযোগ্য তথ্য নেই বলে তাঁদের দাবি।
তবে ভুক্তভোগী ও ক্রেতাদের অভিযোগের বড় অংশই অনলাইন বা অনিবন্ধিত বিক্রেতাদের ঘিরে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, দেশে ডায়মন্ড বিক্রি করে এমন প্রতিষ্ঠান আসলে কতটি? তাদের কতটির নিজস্ব বা স্বীকৃত পরীক্ষাগারের সনদ রয়েছে? গত কয়েক বছরে ডায়মন্ড নিয়ে ভোক্তাদের কত অভিযোগ জমা পড়েছে? কতটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান হয়েছে? কত টাকা জরিমানা করা হয়েছে? কতটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তরই বাজারের বাস্তব চিত্র স্পষ্ট করতে পারে।
‘সনদ ছাড়া হীরা কিনব না’
নকল হীরার অভিযোগ নিয়ে আলোচনার মধ্যে ক্রেতাদের একটি অংশ এখন সচেতন হওয়ার চেষ্টা করছেন। অনেকেই বলছেন, ভবিষ্যতে সনদ ছাড়া দামি হীরা কিনবেন না। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকেও দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছে, ৫০ সেন্টের বেশি ওজনের হীরার গয়নার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক সনদ থাকা উচিত। একই সঙ্গে গয়নায় ১৮ ক্যারেটের কম মানের স্বর্ণ ব্যবহার না করা এবং ক্যাশ মেমোতে পণ্যের গুণগত মান উল্লেখ করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগ না করলে প্রতারণা বাড়বে
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বাংলানিউজকে বলেন, প্রতারণার শিকার হয়েও অনেকে আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে নেতিবাচক ধারণার কারণে অভিযোগ করেন না। এতে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হয়। অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে অস্বাভাবিক মূল্যছাড়ের বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে অনেকেই যাচাই-বাছাই না করে অগ্রিম টাকা দিয়ে পণ্য কিনছেন।
তিনি মনে করেন, অভিযোগের সংখ্যা বাড়লে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পায়। তাই প্রতারণার শিকার হলে চুপ না থেকে অভিযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।
হীরা কিনবেন, আগে দেখুন সনদ
আসল প্রাকৃতিক হীরা, ল্যাব-গ্রোন ডায়মন্ড এবং ডায়মন্ড সিমুল্যান্ট—তিনটির মধ্যে পার্থক্য না জানলে ক্রেতা সহজেই বিভ্রান্ত হতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, শুধু চোখে দেখে, ঝলক দেখে কিংবা দোকানের যন্ত্রের ওপর নির্ভর করে উচ্চমূল্যের হীরা কেনা ঠিক নয়। স্বীকৃত জেমোলজিক্যাল ল্যাবরেটরির রিপোর্ট বা সার্টিফিকেট যাচাই করা উচিত। আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত GIA বা IGI–এর মতো প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট থাকলে সেখানে পাথরটি প্রাকৃতিক হীরা, ল্যাব-গ্রোন ডায়মন্ড নাকি কোনো সিমুল্যান্ট তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে কি না, সেটি দেখা জরুরি।