গত ১০ আগস্ট জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ‘অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিম’-এর এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আল-কায়েদার সেল গঠনের চেষ্টা চলছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে আল-কায়েদার অবস্থান ও সক্ষমতা এখনও অপরিবর্তিত রয়েছে।সংগঠনটির ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা ‘আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট’ (একিউআইএস)ও খণ্ডিত একটি গোষ্ঠী থেকে ধীরে ধীরে আঞ্চলিক সংগঠনে রূপ নিয়েছে। তারা বড় ইউনিটের পরিবর্তে ছোট ও বিচ্ছিন্ন সেল গঠন করে রসদ সরবরাহ এবং আর্থিক নেটওয়ার্ক বিস্তারের চেষ্টা করছে।বাংলাদেশেও একিউআইএসের সেল প্রতিষ্ঠার চেষ্টার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির নিরাপত্তা পরিষদের ‘অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিম’-এর এক প্রতিবেদনে এ উদ্বেগের কথা তুলে ধরা হয়েছে।সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মূল্যায়নের ভিত্তিতে এতে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৯ জুন পর্যন্ত আল-কায়েদা ও সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বাংলাদেশেও একিউআইএস-এর সেল বা ছোট সাংগঠনিক ইউনিট প্রতিষ্ঠার চেষ্টা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।বলা হয়েছে, সংগঠনটি বাংলাদেশকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করছে।
অবশ্য এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ জাতিসংঘের প্রতিবেদনকে অনুমাননির্ভর বলে উল্লেখ করেছেন।
বাংলাদেশে আল-কায়েদার উপস্থিতি আছে কি নেই সেটা বিতর্কের বিষয়। কিন্তু গত কিছু দিন ধরে এদেশে উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কিছু তৎপরতা প্রমাণ করে যে তারা নতুন করে মাথাচাড়া দিতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের একাধিক জায়গায় গত কয়েক মাসের মধ্যে বোমা কিংবা বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের একাধিক ঘটনা গণমাধ্যমে এসেছে। বোমা ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার, নব্য জেএমবি সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ এবং আল-কায়েদা নিয়ে জাতিসংঘের বার্তা- এসব ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার। এই ঘটনাগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য ভালো বার্তা দেয় না বলেই মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
এর মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে একসময় বাংলাদেশে আলোচিত ও নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির কার্যক্রম। নব্য জেএমবির একটি চক্রের বিষয়ে নতুন তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গত ১২ আগস্ট সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকায় তিনতলা একটি বাড়ি ঘিরে অভিযান চালায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বা সিটিটিসি ইউনিট। সেখান থেকে ৯টি বিস্ফোরক এবং বিপুল পরিমাণ গান পাউডারসহ বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
এর আগে, গত ৩০ জুলাই সাভারের আশুলিয়ায় একটি মুদিদোকানে ফেলে যাওয়া ভ্রমণ ব্যাগ থেকে বিশেষ কায়দায় তৈরি একটি বোমা উদ্ধার করে পুলিশ।
এছাড়া ২৪ জুলাই ঢাকার মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে একটি ছাতার ভেতরে রাখা বোমাও উদ্ধার করে পুলিশ।
এসব ঘটনাক্রমের মধ্যেই কদিন আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যানবাহনে হামলার আশঙ্কা থেকে সারা দেশে সতর্কতা জারি করেছিল বাংলাদেশের পুলিশ সদর দপ্তর।
বাংলাদেশে উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠী নতুন করে সংগঠিত হতে শুরু করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে। বিভিন্ন সূত্র দাবি করে, চব্বিশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসব সংগঠন। কয়েকটি রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তারা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল। যে কারণে আওয়ামী লীগের পতনের পর এই উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী প্রকাশ্যে তৎপরতা চালানোর অনুকূল পরিবেশ পায়।
চব্বিশের পটপরিবর্তনের পর রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় কালেমা খচিত কালো পতাকা নিয়ে মিছিল করতে দেখা গেছে৷ এসব মিছিল থেকে ফিলিস্তিনে গণহত্যা বন্ধ, ইসলামের নবীকে কটূক্তির প্রতিবাদ কিংবা ইসলামি খেলাফত কায়েমেরও দাবি তুলতে দেখা গেছে৷ এরপর বিভিন্ন জায়গায় জঙ্গি বা উগ্রবাদী কিছু কর্মকাণ্ডের বেশ কয়েকটি ঘটনা সামনে আসে৷ গত বছর ঢাকায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীরের একটি মিছিল টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
তাছাড়া ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের ভিত্তি মজবুত করতে উগ্রবাদী সংগঠনগুলোকে আরও কাছে টেনে নেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই সংগঠনের কর্মীরা সরকারের লাঠিয়াল বাহিনীর ভূমিকাও পালন করে। ইউনূস সরকারের তীব্র ভারতবিরোধিতা এবং পাকিস্তানপ্রীতি এদেশে জঙ্গিবাদের নব উত্থানে সহায়তা করে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে কারাগার থেকে কয়েকজন সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। এছাড়া জঙ্গিবাদের মামলায় আটক এমন অনেকে পরবর্তীতে জামিনেও মুক্তি পেয়েছেন।
২০২৪ সালে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজন জঙ্গি ও চরমপন্থির জামিনে মুক্তি আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, মুক্তিপ্রাপ্তদের কেউ কেউ ফের জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ও চরমপন্থি কার্যক্রম শুরু করার চেষ্টা করছেন। এদের একজন মাওলানা ইকরামুল হক। ২০২৩ সালের ৩০ মে ঢাকার মাদারটেক থেকে গ্রেপ্তার হন ইকরামুল হক।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশের শাখা একিউআইএসের সঙ্গে যুক্ত এই ব্যক্তি অন্তত পাঁচটি ছদ্মনামে পরিচিত: আবু তালহা, মাওলানা সাবেত, নূর হোসেন, মনসুর ও মিলন। ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর জামিনে মুক্তি পাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক ছিলেন। কিন্তু জামিনে মুক্তির পর প্রায় ২২ মাস পেরিয়ে গেলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তার এখনকার সুনির্দিষ্ট অবস্থানের তথ্য নেই।
পুলিশ বলছে, ইকরামুল ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে অবৈধ পথে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন এবং গ্রেপ্তারের আগ পর্যন্ত ময়মনসিংহ থেকে একিউআইএসের কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। ভারতে তার বিরুদ্ধে ১০টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। প্রযুক্তিতে দক্ষ এই ব্যক্তি একিউআইএসের দাওয়াহ কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন এবং অনলাইনে সদস্যদের ক্লাস নিতেন বলে জানান তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, ইকরামুলের বিষয়টি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না-ও হতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, সন্দেহভাজন সাবেক জঙ্গিদের কেউ কেউ এরই মধ্যে নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনের কাজ শুরু করে দিয়ে থাকতে পারেন।
নব্য জেএমবির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা ‘বোমারু মামুন’ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জামিনে বের হন। ২০১৭ সালে পান্থপথের হোটেল ওলিওতে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে তার তৈরি বোমা ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে পুলিশের। ওই বিস্ফোরণে সাইফুল ইসলাম নামে এক তরুণ নিহত হন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে মামুনসহ হোটেল ওলিও মামলার সব আসামিকে খালাস দেন আদালত।
কারাগার থেকে বেরিয়ে এরকম অনেক সন্দেহভাজন আসামির সাম্প্রতিক তৎপরতা উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশের কারা কর্তৃপক্ষ ও আদালতের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কারাগারে আটক থাকা ৩৩৮ জন ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন৷ এছাড়া জেল পালানো তিনজন জঙ্গি নেতাকেও ধরা যায়নি৷ কারা কর্তৃপক্ষের কাছে সুনিদিষ্ট তথ্য না থাকলেও অন্তত ২৭ জঙ্গি নরসিংদী কারাগার ভেঙে পালিয়ে গেছেন, তাদেরও ধরা যায়নি৷
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, কিছু রাজনৈতিক দলের বক্তব্য এবং তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বাংলাদেশে উগ্রবাদের বিকাশে ভূমিকা রাখছে। কিছু সংগঠনের ছত্রছায়ায় বাংলাদেশে নতুন করে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটছে।
২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করা, বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর, নাটক, কনসার্ট, নৌকা বাইচের মতো সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান করতে বাধা দেওয়া, নারীর পোশাক নিয়ে আপত্তি, মুক্তচিন্তাকে বাধাগ্রস্ত করার মতো ঘটনা ঘটছে। ইউনূস সরকারের আমলে এসব ঘটনাকে মদদ দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকার এসব বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তা বন্ধ করতে পারেনি। এই ধরনের ঘটনাগুলো প্রমাণ করেছে উগ্র মৌলবাদী শক্তি কেবলমাত্র সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নয় তারা এদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। একদিকে যেমন সশস্ত্রভাবে তারা সংগঠিত হচ্ছে অন্যদিকে বাংলাদেশের কৃষ্টি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধ্বংসের জন্য তারা কাজ করছে। এদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধ নেই।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করা একমাত্র সংগঠন বিএনপি। সংসদে এবং সংসদের বাইরে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে বিএনপিকে একাই লড়াই করতে হচ্ছে। যার ফলে বিএনপিকে অনেক বিষয়েই ছাড় দিতে হচ্ছে। ফলে মূলধারার রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ ঘটছে উগ্রবাদ ও সাম্প্রদায়িক চিন্তা। বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে জঙ্গি সংগঠনগুলো ধীরে ধীরে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাব বিস্তারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এরা এদেশে খেলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্নও দেখছে। তাই সরকারকে এখনই সতর্ক হতে হবে। জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। এরা মূল রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ প্রশ্নবিদ্ধ হবে, গণতন্ত্র বিপন্ন হবে। গণতন্ত্র এবং সন্ত্রাসবাদ একসঙ্গে চলতে পারে না।