রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর আবাসিক এলাকার (দুয়ারীপাড়া) সরকারি প্লট দখল, চাঁদাবাজি, হুমকি ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে একটি দখলদার-চাঁদাবাজ চক্রের বিরুদ্ধে। চাঁদা না দিলে নির্মাণ শ্রমিকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে কাজ বন্ধ করে দেওয়া এবং পুলিশ এনে নির্মাণকাজ বন্ধ করারও অভিযোগ করেছেন প্লট মালিকরা।
শনিবার (২২ আগস্ট) দুপুরে রূপনগর আবাসিক এলাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন রূপনগর আবাসিক এলাকা প্লট, বাড়ি ও ফ্ল্যাট মালিক কল্যাণ সমিতির নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা কে এম শামসুজ্জামান।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) মালিকানাধীন সম্প্রসারিত রূপনগর আবাসিক এলাকার ‘ক’ ও ‘খ’ ব্লকে ২০১৯ সাল থেকে দখল ও চাঁদাবাজির চেষ্টা চলছে। গভীর রাতে ইট-বালু ফেলে স্থাপনা নির্মাণ, ইটের দেয়াল দিয়ে গেট নির্মাণ, সরকারি জায়গায় সাইনবোর্ড স্থাপন এবং ২০ ফুট রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে।
প্লট মালিকদের অভিযোগ, বর্তমানে জমি দখলের পাশাপাশি নির্মাণকাজ শুরু করলেও চাঁদা দাবি করছে একটি চক্র। দাবি অনুযায়ী চাঁদা না দিলে দলবল নিয়ে নির্মাণ শ্রমিকদের হুমকি দিয়ে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।কয়েকটি ঘটনায় রূপনগর থানা থেকে পুলিশ নিয়ে গিয়েও নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
সমিতির দাবি, প্রায় অর্ধশতাধিক প্লট মালিক চাঁদাবাজদের কাছে জিম্মি। এছাড়া প্রকল্পের ‘খ’ ব্লকের পূর্ব দিকে ৪০ ফুট প্রশস্ত রাস্তা-সহ প্রায় ৯০ কাঠা সরকারি জায়গা অবৈধভাবে দখল করে রিকশা গ্যারেজ, বস্তি ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে শামসুজ্জামান আরও বলেন, দখলদারদের বিরুদ্ধে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের ঢাকা উপবিভাগ-১ থেকে রূপনগর থানায় একাধিক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পরও পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সম্প্রসারিত রূপনগর আবাসিক প্রকল্পের ‘ক’ ও ‘খ’ ব্লকে প্রায় ৩০ একর জমি অধিগ্রহণ করে ৪৭৪টি প্লট তৈরি করে ১৯৯৪ সালের ৩০ জুন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০০৮ ও ২০১৯ সালে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করা হলেও পরবর্তী সময়ে আবারও দখলের ঘটনা ঘটে।
সমিতির অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুরোনো দখলদাররা এলাকা ছাড়লেও নতুন একটি চক্র দখল ও চাঁদাবাজি শুরু করেছে। প্লটে ভবন নির্মাণ করতে গেলে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। চাঁদা না দিলে হামলা ও নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ১৮ জুলাইয়ের একটি ঘটনার কথা তুলে ধরে বলা হয়, কয়েকজন স্থানীয় নেতা পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে একটি নির্মাণাধীন প্লটে গিয়ে শ্রমিকদের কাজ বন্ধ করতে বলেন। এ ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ পুলিশকে দেখানো হলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা। ওই প্লটটি ড্যাফোডিল হোমস লিমিটেডের নির্মাণাধীন আবাসিক প্রকল্প বলে জানানো হয়। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান থানায় একাধিকবার লিখিত অভিযোগ করেও প্রতিকার পাননি বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়। পরে তিনি ঢাকার সিএমএম আদালতে মামলা করেছেন, যার নম্বর সিআর-৫৮৭/২৬।
সমিতির পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের স্থাপিত ২২ সদস্যের আনসার ক্যাম্প অপসারণের দিন রাতেই সরকারি বরাদ্দের দুটি প্লটসহ স্থাপনা অবৈধভাবে দখল করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, দখল ও চাঁদাবাজির সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ধারী স্থানীয় ব্যক্তিরা জড়িত। এ বিষয়ে বক্তব্যে বেশ কয়েকজনের নামও উল্লেখ করা হয়। অভিযুক্তরা হলেন: রূপনগর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সালাউদ্দিন শিপু মোল্লা, ৯২ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি আমজাদ হোসেন মোল্লা, ভাষানটেক থানা যুবদল নেতা পরিচয় দানকারী জাকির হোসেন শান্ত, ক্যান্টনমেন্ট থানা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক পরিচয় দানকারী মো. শিহাব উদ্দিন, ৯২ নং ওয়ার্ড বিএনপির সহ-সভাপতি মো. জামাল উদ্দিন ওরফে লম্বা জামাল, সাবেক আওয়ামীলীগ নেতা ও বর্তমানে সরকারি দলের নেতা আব্দুল হক। ৯২ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম (নজু), ভোলা বস্তির ইউনিট নেতা মো. আক্তার হোসেন (খোকনের গ্যারেজের), রূপনগর থানার সাবেক সেচ্ছাসেবক দল নেতা হুমায়ুন কবির স্বপন, রূপনগর থানা সেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহ-সভাপতি মো. মামুন, দুয়ারীপাড়া ইউনিট সাবেক আওয়ামী লীগের নেতা আইজল, দুয়ারীপাড়া ইউনিট আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মোবারক হোসেন মেম্বার, গালিব হোসেন আরিফ, মো: রাজু (চান্দি রাজু) সুমন (পিতলা সুমন), ভোলা বস্তি ইউনিট যুবদলের সভাপতি এরশাদ খোকন, ৯২ নং ওয়ার্ড বিএনপির নেতা কামাল ওরফে সিএনজি কামাল, আজিজুল হক জামাল (সিএনজি কামালের ভাই), দুলাল, মো. সোহেল, সোহেল আনসারী, আবুল কালাম আনসারী (জামাল), মো. বাশার ও সফিক গং, জহিরুল ইসলাম গং, সাইফুল ইসলাম গং, জসিম (জামাই জসিম) গং, ইউসুফ, সেলিম গং, জান্নাতুল ফেরদৌস সুমি, শারমিন আক্তার, শিল্পী ওরফে খালিদা।
সংবাদ সম্মেলন থেকে অবৈধ দখলদার ও চাঁদাবাজদের দ্রুত গ্রেপ্তার, সরকারি জমি ও প্লট দখলমুক্ত করা, ২০ ফুট রাস্তা উন্মুক্ত করা, প্লট মালিক ও নির্মাণ শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগের পরও নিষ্ক্রিয় থাকার বিষয়ে পুলিশের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানানো হয়।