শরীয়তপুর-চাঁদপুর রুটে মেঘনা নদীর ওপর ৮.০৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে ২০২৩ সালে এই সেতুর দৈর্ঘ ধরা হয়েছিল ১০ কিলোমিটার।
দেশে এখন পর্যন্ত নির্মিত দীর্ঘতম সেতুগুলোর মধ্যে পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ ৬. ১৫ কিলোমিটার। যমুনা সেতুর দৈর্ঘ ৪.৮ কিলোমিটার।
পরিকল্পনা অনুযায়ী মেঘনায় সেতু নির্মাণ হলে ওই এলাকাসহ এর আশপাশের এলাকার মানুষের যাতায়াত সহজ হবে। নতুন নতুন শিল্প কারখানা গড়ে উঠবে।কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দেবে। সর্বোপরি ওই অঞ্চলের মানুষের আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে এই সেতু।
কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় শিল্প ও সেবা খাতের প্রসার ঘটলে সেতুটি মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ০.৭৬ শতাংশ অবদান রাখবে বলে সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৪ সালে সম্পাদিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে নির্মাণ ব্যয় হিসাব করা হয়েছে ১৫ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা (১৪৯১.৩৩ মিলিয়ন ডলার)। তখন ডলারের দর বাংলাদেশি টাকায় ১০৭ টাকা করে হিসাব করা হয়।
আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সেতু বিভাগ সেতুটির নির্মাণ শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে বলে জানা গেছে।
সমীক্ষার ট্রাফিক ফোরকাস্ট অনুযায়ী, সেতুটি চালু হওয়ার পর ২০৩২ সালে এ সেতু দিয়ে দৈনিক প্রায় ৬,২৪২টি যানবাহন চলাচল করবে এবং ২০৬১ সালে এ সেতু দিয়ে দৈনিক প্রায় ৪৫,১৫০টি যানবাহন চলাচল করবে।
পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় সেতুটি নির্মাণ করা হবে। প্রস্তাবিত সেতুটি শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার আর-৮৬০ সড়কের সঙ্গে এবং চাঁদপুরের সদর উপজেলার আর-১৪০ সড়কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করবে।
এ প্রকল্পের আওতায় ৮.০৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু (৪ লেন), উভয় পাশে ৮.৫৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সংযোগ সড়ক এবং ৯.৬৩ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীর তীর রক্ষামূলক কাজ করা হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৭৬৮.১৯৬ একর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে বলে জানা গেছে। ওই জমির মূল্য, স্থাপনা ও অন্যান্য ক্ষতিপূরণ সরকারি বাজেট থেকে নির্বাহ করা হবে। তাছাড়া, ইউটিলিটিজ স্থানান্তর বাবদ ব্যয়ও সরকারি তহবিল হতে নির্বাহ করা হবে।
প্রস্তাবিত সেতুর মূল স্প্যান হবে ৭০০ মিটার। খাড়া স্থম্ভের সঙ্গে যুক্ত থাকবে বিদ্যুতের তার, এ ধরনের সেতুকে ক্যাবল স্টেইড সেতু বলা হয়। নৌযান চলাচলের সুবিধার্থে মূল স্প্যানে ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স ৩০ মিটার বিবেচনা করা হয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের জনসাধারণ পদ্মা সেতু অতিক্রম করে ঢাকার যাত্রাবাড়ী হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। এতে রাজধানী ঢাকায় অধিক যানবাহনের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
অপরদিকে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ ও চাঁদপুরের সদর উপজেলার হরিনাঘাট দিয়ে ফেরির মাধ্যমে যোগাযোগের ব্যবস্থা রয়েছে। যা অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ।
এই দুই অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করতে এই রুটে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সেতু বিভাগ।
প্রস্তাবিত সেতুটির পূর্ব দিক চাঁদপুর জেলার সদর উপজেলার সঙ্গে এবং পশ্চিম দিক শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের প্রায় ৩০টি জেলা এবং খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করবে।
এটি রাজধানী ঢাকাকে এড়িয়ে একটি বিকল্প পথ তৈরি করবে। এর ফলে প্রতিবার ভ্রমণে প্রায় ১০০ মিনিট সময় এবং প্রায় ৬৬ কিলোমিটার পথের দূরত্ব কমে আসবে।
সেতু বিভাগ বলছে, দেশের সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক উন্নয়নে সেতু বিভাগ এবং এর আওতাধীন বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে সহজ ও দ্রুত যোগাযোগের দীর্ঘদিনের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত মাস্টারপ্ল্যানে বেশ কয়েকটি সেতু নির্মাণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত মাস্টারপ্ল্যানে অগ্রাধিকার বিবেচনায় ৫৭টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে; যার মধ্যে যমুনা সেতু, পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল উল্লেখযোগ্য। এছাড়া, পিপিপির আওতায় ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ এবং জিটুজি ভিত্তিক ঢাকা আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ কাজ চলমান আছে।
মেঘনা সেতু প্রকল্পটির অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইকোনোমিক নেট প্রেজেন্ট ভ্যালু (ইএনপিভি) ৫ লাখ ৪৭ হাজার ১০১ কোটি টাকা। বেনিফিট কস্ট রেশিও (বিসিআর) ৪.৭৪ এবং ইকোনোমিক ইন্টারনাল রেট অফ রিটার্ন (ইআইআরএর) ১৬.০১ শতাংশ।
আর্থিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী পিপিপির মাধ্যমে ক্রয় পদ্ধতিতে ফাইন্যান্সিয়াল নেট প্রেজেন্ট ভ্যালু (এফএনপিভি) ৬ হাজার ৬৫১.২০ কোটি টাকা এবং ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টারনাল রেট অফ রিটার্ন (এফআইআরআর) ৭.৫০ শতাংশ।