বগুড়া শহরে পা রাখতেই উৎসবের আবহ টের পাওয়া যায়। কোথাও ব্যান্ড পার্টির বাজনা, কোথাও ভেসে আসছে জনপ্রিয় গানের সুর। শহরের মোড়ে মোড়ে রঙিন ব্যানার, ফেস্টুন—সব মিলিয়ে যেন এক উন্মুখ অপেক্ষা। সন্ধ্যা নামার আগেই ভিড় জমতে শুরু করেছে বিভিন্ন স্পটে। আর ‘মমো ইন’-এ পৌঁছাতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে আয়োজনের ব্যাপ্তি—তারকাদের আনাগোনা, কর্মব্যস্ততা আর সাজসজ্জায় মুখর চারপাশ। যেন পুরো শহরই প্রস্তুত এক বর্ণাঢ্য সংগীত উৎসবকে ঘিরে।

সুস্থ ধারার সংগীতচর্চাকে এগিয়ে নিতে ২০০৪ সালে যাত্রা শুরু করা ‘টিএমএসএস চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস’ এবার পা রাখছে ২০তম আসরে। উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র বগুড়ায় আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পাঁচ তারকা হোটেল ‘মমো ইন’-এর উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে বসছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ এই সংগীত আসর।
গতকাল সোমবার সকাল থেকেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিল্পী, কলাকুশলী ও আয়োজকদের আগমনে সরগরম হয়ে ওঠে পুরো ভেন্যু। কেউ আগের দিনই এসে উঠেছেন, কেউ এসেছেন মঙ্গলবার দুপুরে। হোটেলের লবি থেকে শুরু করে আঙিনা—সব জায়গাতেই তারকাদের উপস্থিতি। দিনভর প্রস্তুতির পর সন্ধ্যা নামতেই শুরু হয় রিহার্সাল—মঞ্চে ওঠার আগে শিল্পীদের ব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো। জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী কনকচাঁপা পৌঁছানোর পর তাঁকে ঘিরে তরুণ শিল্পীদের সেলফি-উচ্ছ্বাস যেন উৎসবেরই আরেক রূপ।
আয়োজনের সার্বিক তদারকিতে রয়েছেন চ্যানেল আইয়ের দুই কান্ডারি ফরিদুর রেজা সাগর ও শাইখ সিরাজ। দুজনকে ঘুরে ঘুরে প্রস্তুতি তদারকি করতে দেখা গেছে। কোথাও আলো নিয়ে নির্দেশনা, কোথাও মঞ্চের নকশা, আবার কোথাও শিল্পীদের পারফরম্যান্সের সময়সূচি নিয়ে আলোচনা—সব মিলিয়ে আয়োজনের প্রতিটি খুঁটিনাটি তাঁরা নিজ হাতে গুছিয়ে নিচ্ছেন। শিল্পীদের কেউ পোশাক পরিকল্পনায় ব্যস্ত, কেউ শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে—মঞ্চ, আলো, শব্দ ও প্রযুক্তিগত কাজে চলছে চূড়ান্ত প্রস্তুতি।
এবারের আসরে আজীবন সম্মাননাসহ মোট ১৯টি বিভাগে পুরস্কার দেওয়া হবে। সংগীতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন কনকচাঁপা। বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত হচ্ছেন লোকসংগীতশিল্পী কাঙ্গালিনী সুফিয়া, যিনি ইতিমধ্যেই পরিবারসহ বগুড়ায় পৌঁছেছেন।
শুধু সংগীতশিল্পী নন, বিনোদন অঙ্গনের নানা তারকার উপস্থিতিতে জমে উঠেছে আয়োজনের আবহ। এখানে দেখা গেছে আফসানা মিমি, অপু বিশ্বাস, আদর আজাদ, শাহরিয়ার নাজিম জয় এবং চয়নিকা চৌধুরীসহ অনেকের উপস্থিতি। অনেকেই বলছেন, ঢাকার বাইরে এমন বড় আয়োজন—এটা নিজেই এক নতুন অভিজ্ঞতা।
জাঁকজমকপূর্ণ এই আয়োজনে উপস্থিত থাকবেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, টিএমএসএসের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক হোসনে আরা বেগমসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সংগীতের দিক থেকেও এবারের আসর হতে যাচ্ছে বৈচিত্র্যময়। মঞ্চে উঠবেন কিংবদন্তি শিল্পী রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমীন, খুরশীদ আলম, রফিকুল আলম। পাশাপাশি সমকালীন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী কোনাল, ঝিলিক, ইমরান মাহমুদুল, লিজা ও লুইপা পরিবেশনায় মঞ্চ মাতাবেন। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করছেন নীল হুরেজাহান।

আয়োজনের প্রকল্প পরিচালক নির্মাতা রাজু আলীম বলেন, ‘দুই দশকের এই আয়োজনকে আমরা এবার নতুন মাত্রায় নিতে চেয়েছি। শুধু পুরস্কার প্রদান নয়, এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ সংগীত উৎসবে রূপ দেওয়া হয়েছে। এখানে তিন শর বেশি শিল্পী অংশ নিচ্ছেন—প্রবীণ, মধ্যম ও তরুণ—সব প্রজন্মের শিল্পীরা এক মঞ্চে উঠবেন। আমরা চেষ্টা করেছি, প্রযুক্তিগত দিক থেকেও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে।’
রাজু আলীম আরও বলেন, ‘বগুড়ায় এই আয়োজন করার পেছনে একটা ভাবনা ছিল, ঢাকার বাইরে বড় সাংস্কৃতিক আয়োজন ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা চাই, দেশের সব অঞ্চলের মানুষ যেন এমন আয়োজনের স্বাদ পায়। দর্শকদের জন্য চমক থাকছে, মঞ্চে থাকছে বিশেষ পরিবেশনা, ভিজ্যুয়াল ডিজাইনেও আনা হয়েছে নতুনত্ব।’
সব মিলিয়ে, দুই দশকের ঐতিহ্য ধারণ করে উত্তরবঙ্গে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই আয়োজন ঘিরে তৈরি হয়েছে বাড়তি আগ্রহ। আয়োজকদের মতে সংগীতপ্রেমীদের জন্য এটি হতে যাচ্ছে এক বর্ণাঢ্য, উৎসবমুখর ও স্মরণীয় রাত।