News Headline :
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ আরেকটা ফ্যাসিবাদ, অলিখিত বাকশাল: বিরোধীদলীয় নেতা বিএনপি কি আরেকটা আ. লীগ হওয়ার চেষ্টা করছে, প্রশ্ন হান্নান মাসউদের তুরাগের রানাভোলায় বস্তির আগুন নিয়ন্ত্রণে ডিএসসিসির অভিযানে সায়েদাবাদে ১০০ কাউন্টার সিলগালা ‘স্থানীয় সরকার বিল পাস না হলে আ. লীগের মেয়রদের চেয়ারে বসার সুযোগ করে দিতে হবে’ সেনা কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণা, আইএসপিআরের সতর্কবার্তা ওয়াকআউট করা কি অপরাধ—সংসদে প্রশ্ন বিরোধীদলীয় নেতার লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা, ঝুঁকিতে যুক্তরাষ্ট্র‑ইরান যুদ্ধবিরতি সংসদে রেকর্ডসংখ্যক বিল পাস, একদিনে ৩১ হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যু ৭, নতুন রোগী আঠার শতাধিক
সংসদে রেকর্ডসংখ্যক বিল পাস, একদিনে ৩১

সংসদে রেকর্ডসংখ্যক বিল পাস, একদিনে ৩১

মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশ বাতিলসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল করে সংসদে বিল পাস হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকটি বিল পাসে বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপির সদস্যরা একমত ছিলেন না।আর এসব কারণ উল্লেখ করে বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। সবমিলিয়ে বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সংসদে ৩১টি বিল পাস হয়েছে।

সরকারি দলের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বিরোধী দলের সদস্যরা আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সহায়তার পর শেষ মুহূর্তে এসে ওয়াকআউট করায় বিস্ময় প্রকাশ করেন।

গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিল পাসের পর সন্ধ্যা ৫টা ৫৫ মিনিটে সংসদের বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমান বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য বিরোধী দলের যৌক্তিক বাধা সত্ত্বেও বেশ কয়েকটি গণবিরোধী বিল আজ পাস হয়েছে, আমরা তার দায় নিতে চাই না।তাই সংসদ থেকে ওয়াকআউট করছি। বিরোধী দলের নেতা ওয়াকআউট ঘোষণা দিয়ে জোটের সংসদ সদস্যদের নিয়ে অধিবেশন থেকে বের হয়ে যান।মাগরিবের বিরতির পর বিরোধী দল আবার সংসদে যোগ দেয়।

বৃহস্পতিবার অধিবেশনের প্রথম সেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সভাপতিত্ব করেন এবং দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ অবিকল রেখে পাস হওয়া বিলগুলো হচ্ছে— ‘জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী কল্যাণ ফাউন্ডেশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘শেখ হাসিনা জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ শ্রম সংশোধন বিল, ২০২৬’, ‘স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫’ রহিত করা ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল, ২০২৬’ এবং ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫’ রহিত করা ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল, ২০২৬’ বিল।

এছাড়া ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’ এর ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিত ও পুনঃপ্রচলন) বিল, ২০২৬’, ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ এবং ‘ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা বিল, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ গ্যাস (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন বিল, ২০২৬’, ‘বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম) রেগুলেশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন বিল, ২০২৬’, ‘বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ বিল, ২০২৬’, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ ট্রাস্ট (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘জেলা পরিষদ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘উপজেলা পরিষদ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা বিল, ২০২৬’, ‘বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ ও ‘নেগোসিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়।

মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল করে সংসদে বিল পাস
অন্তর্বর্তী সরকারের আনা জাতীয় ‘মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫’ রহিত করে ২০০৯ সালের আইন পুনঃপ্রচলন করে আনা বিল সংসদে পাস হয়েছে। ওই বিলের বিরোধিতা করে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, আগের মানবাধিকার কমিশন ছিল মূলত বিরোধী দল দমন কমিশন হিসেবে কাজ করেছে। জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, জিয়া পরিবার মানবাধিকার লঙ্ঘনের সর্বোচ্চ শিকার। সরকার মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে।

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল-২০২৬ বিলটি উত্থাপনের পর বিরোধী দলের পক্ষ থেকে জোরালো আপত্তি জানান এনসিপি দলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। তবে সেই আপত্তি কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। পরে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার ২০০৯ সালের ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯’ সংশোধন করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করে।

বিলটি উত্থাপনের পর সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, এই বিল পাসের মাধ্যমে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনটিকে রিস্টোর (পুনঃপ্রচলন) করা হচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে আমরা দেখেছি, এই কমিশনকে বিরোধী দল ও মত দমনে ব্যবহার করা হয়েছে। বিএনপিকে দমন করার বৈধতা দিয়েছে এই কমিশন। এমনকি কমিশনের চেয়ারম্যানকে বলতে শুনেছি, মানবাধিকার রক্ষার স্বার্থে জামায়াত নেতাকর্মীদের গুলি করা বৈধ।

তিনি বলেন, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশটিকে ল্যাপস (বিলুপ্ত) করে ২০০৯ সালের আইনে ফিরে যাওয়া হবে এই সংসদের জন্য একটি ব্যাকওয়ার্ড মুভ বা পশ্চাদমুখী পদক্ষেপ। এটি জাতি পিছিয়ে পড়ার একটি টেক্সটবুক এক্সাম্পল হয়ে থাকবে। কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ। তার মতে, ছয় সদস্যের বাছাই কমিটিতে অধিকাংশই সরকার পক্ষের হওয়ায় কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ। এছাড়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তে সরকারি অনুমতির বাধ্যবাধকতা নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। তিনি বলেন, যেখানে সরকার বা বাহিনী জড়িত থাকতে পারে, সেখানে তাদের অনুমতি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব নয়।

বিরোধিতার জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, সংসদ সদস্য খুব সুন্দর বক্তৃতা দিয়েছেন। উনার বক্তৃতাগুলো পল্টন ময়দান, প্রেসক্লাব বা রাজপথের জন্য অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক ও জুসি (রসালো)। উনি সব পড়েছেন, শুধু বিলটা পড়েননি। বিলের প্রথম লাইনেই দেওয়া আছে, সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে অধিকতর পরামর্শ ও যাচাই-বাছাই করার প্রয়োজনে এবং মানবাধিকার কমিশনের জায়গাটি যাতে ফাঁকা না থাকে, সেই কারণেই ২০০৯ সালের আইনটি রেস্টোর করা হয়েছে। অধ্যাদেশ ‘রহিত’ করা হলে এবং ২০০৯ সালের আইনটি রেস্টোর না হলে বিশ্ববাসী জানবে বাংলাদেশে মানবাধিকার কমিশন নেই।

বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার ৪২ দিনে দেশে কেউ গুম কিংবা ক্রসফায়ারের শিকার হয়নি উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, সরকারের বয়স ৪২ দিন, চাইলে প্রতিহিংসার রাজনীতি করতে পারত। কিন্তু গত ৪২ দিনে দেশে একটি মানুষও ক্রসফায়ারের শিকার হয়নি, একটি মানুষও গুমের শিকার হয়নি। চাইল্ডহুড সোজ দ্য ম্যান, মর্নিং সোজ দ্য ডে। আমরা মানবাধিকারের পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার সবচেয়ে বড় পরিবার হলো জিয়া পরিবার। বাংলাদেশের ইতিহাসে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে বড় পরিবার হলো বিএনপি পরিবার। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্যতম অপরাধের শিকার হলো বিএনপি পরিবার এবং জিয়া পরিবার। আমাদের সামনে বসে আছেন মানবাধিকার লঙ্ঘনের চরমতম শিকার আমাদের প্রধানমন্ত্রী। আমাদের মানবাধিকার সম্পর্কে বিন্দুমাত্র কোনো পিছুটান নেই।

সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশ বাতিল
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্বের অভিযোগ তুলে বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি দিলেও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা তিনটি অধ্যাদেশ বাতিল করেছে জাতীয় সংসদ।

আলাদা দুটি বিল পাসের মাধ্যমে এসব অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়। এর মধ্যে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল হয়। আর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়। ফলে আপাতত সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের জন্য আলাদা কোনো আইন থাকছে না। সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার আইনগত ভিত্তিও থাকছে না। বিচারক নিয়োগ ও বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রম আগের কাঠামোয় ফিরে যাচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিলটি অবিলম্বে বিবেচনার প্রস্তাব সংসদে তোলেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তখন আপত্তি জানান বিরোধী সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান। পাবনা-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর এই সদস্য বলেন, বিলটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন। তার ভাষায়, ফ্যাসিবাদী কায়দায় নিম্ন আদালতকে ব্যবহার করে বিরোধী মত দমনের আয়োজন চলছে।

জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, সুপ্রিম কোর্ট কোনো আইন অসাংবিধানিক কি না তা বলতে পারে; কিন্তু সংসদকে কোনো আইন করতে ‘ডিক্টেট’ করতে পারে না। মাসদার হোসেন মামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আদালত আইন নিয়ে মত দিতে পারে, কিন্তু আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের। সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চায় এবং তা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

জামায়াতের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আমরা চাই। ওনাদের পিতারা বিচার বিভাগের কাছে অবিচারের শিকার হয়েছিলেন। সেই স্বাধীনতা যেমন অ্যাবিউজড হয়েছে, যারা সে বিচার করেছিলেন তারা সবচেয়ে স্বাধীন বিচারক ছিলেন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে বিচারকদের চাকরি, বদলি, পদায়ন ও শৃঙ্খলাবিষয়ক সুরক্ষা সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত। সেই সুপ্রিম কোর্ট থেকেই ‘শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ’ এর জন্ম হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিচারের অভিযোগও উঠেছে।

বিচারকদের শোকজ দেওয়ার অভিযোগের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, আচরণবিধি অনুযায়ী বিচারক থাকা অবস্থায় কেউ কোচিং সেন্টারের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন না। তার ভাষায়, কেউ কেউ ক্লাস নেওয়ার বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন, কেউ কেউ ফেসবুকে সংবিধান বিশেষজ্ঞ হিসেবে হাজির হচ্ছেন। সে কারণেই তাদের বিষয়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

পরে আইনমন্ত্রী ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাসের জন্য প্রস্তাব করেন। এতে আপত্তি দেন জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।

আইনমন্ত্রীর আগের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিচারপতিরা সাংবিধানিক সুরক্ষা পেয়েও কীভাবে ‘রাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে’ বিচারকার্য চালিয়েছেন, কীভাবে খালেদা জিয়ার সাজা বাড়ানো হয়েছে এবং কীভাবে বিচারব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে, সেটাই প্রমাণ করে নিয়োগ প্রক্রিয়ার গোড়াতেই সমস্যা ছিল।

বিল পাসের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদকে জানান, আলোচনার সময় একজন বিচারপতির নামের শেষে একটি বিশেষণ যুক্ত করা হয়েছিল, সেটি সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

সংসদে পাস হওয়া ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং ২০২৬ সালের এর সংশোধন অধ্যাদেশ বাতিল হচ্ছে। বিলে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ‘অধিকতর পরামর্শ ও যাচাই-বাছাই’ দরকার হওয়ায় এই রহিতকরণ বিল আনা হয়েছে। বিল অনুযায়ী, অধ্যাদেশ দুটির অধীনে প্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত হবে।

একইসঙ্গে সচিবালয়ের হাতে থাকা বাজেট, গৃহীত প্রকল্প ও কর্মসূচি আইন ও বিচার বিভাগে হস্তান্তরিত হবে। সচিবালয়ের জন্য সৃজিত পদও বিলুপ্ত হবে। তবে অধ্যাদেশ বাতিলের পরও সুপ্রিম কোর্ট, রেজিস্ট্রি, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল, অধস্তন আদালত ও অন্যান্য দপ্তরের জন্য সৃজিত পদ, সাংগঠনিক কাঠামো, যানবাহন ও অফিস সরঞ্জাম বহাল থাকবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সেগুলো আইন ও বিচার বিভাগে ন্যস্ত হবে।

অন্যদিকে, ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল, ২০২৬’-এ গত বছরের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিলের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে ওই অধ্যাদেশের অধীনে এরই মধ্যে করা নিয়োগ ও নেওয়া ব্যবস্থাগুলো বৈধ বলেই গণ্য হবে বলে বিলে বলা হয়েছে। বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্বলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিচারক স্বল্পতা দূর করতে জারি করা ওই অধ্যাদেশের অধীনে ইতোমধ্যে সুপ্রিম কোর্টে ২৫ জন বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকার বলছে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের জন্য স্থায়ী আইনগত কাঠামো নিশ্চিত করতে এবং অধ্যাদেশের বিধানগুলো আরও যাচাই-বাছাই করতে এই রহিতকরণ বিল আনা হয়েছে।

জামুকা বিল নিয়ে জামায়াত-এনসিপি পরস্পর বিরোধী অবস্থান
পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম বহাল রেখে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অধ্যাদেশকে সংশোধন করে আইনে রূপ দিতে বিল পাস করেছে সংসদ। এতে জামায়াতের পক্ষ থেকে আপত্তি জানিয়ে দলটির আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বক্তব্য দেন। তবে তাদের জোট সঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পক্ষ থেকে এই বিলের ওপর কোনো আপত্তি নেই বলে স্পিকারকে লিখিতভাবে জানানো হয়।

সংসদ অধিবেশনে বিলটি উত্থাপন করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। পরে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। এর আগে বিরোধী দলীয় নেতা বিলের ওপর আপত্তি দিতে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ বক্তব্য রাখলেও বিলের কোনো ধারায় তিনি সংশোধন চান তা উল্লেখ করেননি। ফলে স্পিকার তার আপত্তির বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে ভোট দেননি এবং বিপরীতে মন্ত্রীও কোনো জবাব দেননি। তবে স্পিকার সংসদকে জানান, এ বিলের বিষয়ে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী কোনো আপত্তি জানায়নি এবং এনসিপি লিখিতভাবে সংসদকে তাদের মতামত জানিয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু বিল আকারে উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করেছে সংসদের বিশেষ কমিটি। বিশেষ কমিটির ওই প্রতিবেদনে নোট অব ডিসেন্ট (আপত্তি) জানিয়ে জামায়াতের এমপিরা বলেছিলেন, জামুকা অধ্যাদেশটি বর্তমান অবস্থায়, কোনো পরিবর্তন ছাড়া পাস হলে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামীর মতো দলগুলো পাকিস্তানের সহযোগী হিসেবে বিদ্যমান থেকে যাবে, যা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়।

জামায়াতের এমপিরা এই অধ্যাদেশের ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ এবং মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা পরিবর্তনের দাবি রাখেন। কমিটির প্রতিবেদনে জামায়াতের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, ২০০২ সালে খালেদা জিয়ার সরকারের আইনে দলগুলোকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী বলা হয়নি। রাজনৈতিক দলকে সশস্ত্র বাহিনী চিহ্নিত করা ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সমর্থন।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা এই অধ্যাদেশে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা সহযোগী, মুক্তিযোদ্ধা পরিবার এবং মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যের সংজ্ঞা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অধ্যাদেশে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বলা হয়, ‘১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন এবং যেসব ব্যক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং যারা স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, এমন বেসামরিক নাগরিকেরা (ওই সময়ে যাদের বয়স সরকার নির্ধারিত সর্বনিম্ন বয়সের মধ্যে ছিল) মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাবেন। পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী, মুক্তিবাহিনী, বিএলএফ ও অন্যান্য স্বীকৃত বাহিনী, পুলিশ বাহিনী, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), নৌ কমান্ডো, কিলো ফোর্স ও আনসার সদস্যরাও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য হবেন।’

অধ্যাদেশে ‘মুক্তিযুদ্ধ’-এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় হানাদার ও তাদের সহযোগী রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধ।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS