ঢাকার কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়ায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সার্কেল–২ কার্যালয়। সরকারিভাবে এখান থেকে নিয়মতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ সেবা দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক সেবাগ্রহীতার বলছেন, এখানে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য কমেনি, বরং নতুন কৌশলে তা চালু রয়েছে।এখন সরাসরি ভেতরে না ঢুকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেবা পাইয়ে দিচ্ছে দালালরা। বিনিময়ে হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অর্থ।ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস, রেজিস্ট্রেশন, মালিকানা বদলিসহ প্রায় সব সেবাতেই দালাল চক্রের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ মিলেছে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের আগে যেমন দালালচক্রের প্রভাব ছিল, এখনো তার তেমন দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি।কঠোর নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত থাকলেও দালালদের ঠেকানো যাচ্ছে না। ফলে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের একটি অংশ এখনো বাধ্য হয়ে এই চক্রের শরণাপন্ন হচ্ছেন, যদিও আগের তুলনায় প্রকাশ্য দৌরাত্ম্য কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, ইকুরিয়া বিআরটিএ কার্যালয়ের মূল ফটকে ঢোকার আগেই কয়েকজন দালাল ছুটে এসে সেবাগ্রহীতাদের জিজ্ঞেস করছেন—‘কোন কাজ করাবেন?’ কম সময়ে, কম খরচে কাজ করিয়ে দেওয়ার আশ্বাসও দিচ্ছেন তারা।
এসময় বিভিন্ন সেবা নিতে আসা লোকজনকে দ্রুত কাজ করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে আড়ালে নিয়ে যেতে দেখা যায় কয়েকজন দালালকে।
তবে প্রতিবেদকের গাড়ির সামনে ‘প্রেস’ লেখা দেখে কয়েকজন দ্রুত সরে গেলেও বাকিরা এসে খোশগল্পে মজেন এবং কোনো কাজে এসে থাকলে ভেতরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার আশ্বাস দেন।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে কয়েকজন দালালের সঙ্গে খোলামেলা কথা হলে তারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বিআরটিএর কঠোর অবস্থানের কারণে আগের মতো সহজে ভেতরে ঢোকা যায় না। ফলে তাদের আয়-রোজগার কমে গেছে।
তবে তারা স্বীকার করেন, কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই ভেতরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কাজ সেরে নেন।

ফোনে টোকেন নম্বর জানিয়ে দিলে কাজ সম্পন্ন করে দেন এবং পরে নির্ধারিত অংশ সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের কাজ করেন এমন একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দালাল বলেন, আমরা তো ইকুরিয়ায় বিআরটিএর জন্মলগ্ন থেকেই এখানে এই কাজ করছি। অন্য কোনো কাজ শিখিনি। তাই সংসার চালাতে এই কাজ ছাড়া উপায় নেই। অনেকবার জেলে গিয়েছি। তারপরও ছাড়তে পারি না। এখন মোবাইল কোর্ট চলাকালে আমরা আশপাশেও থাকি না। ধরা পড়লে তিন মাস পর্যন্ত জেল খাটতে হয়। তাই দূরে থেকেই কাজ করি।
বিআরটিএর মূল ভবনে প্রবেশের পর অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ দেখা যায়। কয়েকটি কক্ষে চার্জার লাইট ব্যবহার করে কর্মকর্তাদের কাজ করতে দেখা গেছে।
কয়েকজন সেবাগ্রহীতা অভিযোগ করেন, বিআরটিএ একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিস। এখানে প্রায়ই বিদ্যুৎ না থাকায় কাজের গতি ব্যাহত হয় এবং সেবায়ও বিলম্ব ঘটে। ‘কর্মকর্তারা কি এ সমস্যা সমাধানে কাজ করেন না?’—খেদ ঝাড়েন তারা।
মতিঝিল থেকে আগত ব্যাংকার আসলাম বলেন, কোনো রকমের হয়রানি হয়নি, তবে অস্বস্তি হয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না আসায় অন্ধকারে অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। বিদ্যুৎ আসার পর কাজ সেরে ফিরছি।
প্রায় আধা ঘণ্টা পরে বিদ্যুৎ এলেও অফিসের ভেতরের পরিবেশ তুলনামূলক শান্ত দেখা গেছে। কেউ লাইনে দাঁড়িয়ে গাড়ির ফিটনেস করাচ্ছেন, কেউ নতুন গাড়ির নম্বর প্লেট নিচ্ছেন। ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য অনলাইনে শিক্ষানবিশ কার্ড ও পরীক্ষার সময়সূচি দেওয়ার কারণে এখন আগের মতো ভিড় নেই বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
“আমরা তো ইকুরিয়ায় বিআরটিএর জন্মলগ্ন থেকেই এখানে এই কাজ করছি। অন্য কোনো কাজ শিখিনি। তাই সংসার চালাতে এই কাজ ছাড়া উপায় নেই। অনেকবার জেলে গিয়েছি। তারপরও ছাড়তে পারি না।”
—নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দালাল
সেবাগ্রহীতাদের কেউ কেউ জানান, আগের তুলনায় হয়রানি কমেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে এখনো সীমিত আকারে দালালরা ভেতরে প্রবেশ করে কাজ করিয়ে নিচ্ছেন।
স্থানীয় পরিবহন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ইকুরিয়ার বিআরটিএ কার্যালয়ে দীর্ঘ ১৭-১৮ বছর ধরে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সক্রিয়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর এখনো অফিসের ভেতর ও বাইরের কিছু অসাধু কর্মচারীর সঙ্গে যোগসাজশে তারা পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।
কদমতলী থানার প্লাস্টিক বোতল রিসাইকেলিং ব্যবসায়ী শামীম বাংলানিউজকে জানান, ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে তিনি বিআরটিএর এক দালালের সঙ্গে ১২ হাজার টাকায় চুক্তি করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি নিজে শুধু অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন করেছিলেন। লিখিত পরীক্ষায় তিনি নিজেই অংশ নেন। তবে সাধারণ জ্ঞান দালালের যোগাযোগের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাকে পাস করিয়ে দেন। পরবর্তী সময়ে গাড়ি চালানোর ব্যবহারিক পরীক্ষার সময়ও একইভাবে দালালের মাধ্যমে কর্মকর্তারা তাকে পাস করিয়ে দেন বলে তিনি দাবি করেন।
পরে লাইসেন্সের জন্য নির্ধারিত টাকা জমা দিতে বলা হলে শামীম অনলাইনে সেই টাকা জমা দেন। বর্তমানে তিনি লাইসেন্স হাতে না পেলেও অনলাইনে টাকা জমার রসিদ দেখিয়েই গাড়ি চালাচ্ছেন বলে জানান।
কালিয়াকৈর থেকে আসা মো. ইউনুস আলী বলেন, চার বছর আগের বিআরটিএ আর এখনকার বিআরটিএর মধ্যে অনেক পার্থক্য। আগে বাধ্য হয়ে দালালের মাধ্যমে কাজ করতে হতো। এখন দালাল আছে, তবে আগের মতো সহজে ভেতরে ঢুকতে পারে না বা সরাসরি সামনে থাকেন না। তাই হয়রানি কিছুটা কমেছে।
মিরপুর থেকে আসা আবদুল জাব্বার জানান, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য সব পরীক্ষা শেষ করে টাকা জমা দিয়েছিলেন। চার বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনো লাইসেন্স হাতে পাননি।
বারবার যোগাযোগ করেও কোনো সঠিক উত্তর পাননি—এমন আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দালালের মাধ্যমে করলে হয়তো তিন বছর আগেই লাইসেন্স পেয়ে যেতাম। বিআরটিএর ভোগান্তি যেন শেষই হয় না।
একাধিক সেবাগ্রহীতা জানান, অফিসে ঢোকার আগেই দালালরা জিজ্ঞেস করেন—লাইসেন্স, ফিটনেস নাকি রেজিস্ট্রেশন—দ্রুত লাগবে নাকি নিয়মে করবেন? অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে দালালদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অংকের টাকা নেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দালাল চক্রের কয়েকজন সদস্য জানান, এখানে গাড়ির ফিটনেস করাতে গাড়িপ্রতি গড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়া হয়। প্রতিদিন যদি প্রায় ২০০টি ফিটনেস সম্পন্ন হয়, তাহলে শুধু এই খাত থেকেই প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়।
ছোট পিকআপ ভ্যানের ক্ষেত্রে এই অংক ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। বাসের ক্ষেত্রে একটি ফিটনেস করাতে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় বলে দাবি তাদের। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০টি বাসের ফিটনেস হলে এই খাত থেকেই প্রায় ৫ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়।
এছাড়া মালিকানা বদলির ক্ষেত্রে প্রতিটি ফাইলে প্রায় ২ হাজার টাকা এবং রেজিস্ট্রেশন বা নম্বর পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রায় ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৫০টি মালিকানা বদলি হলে শুধু এই খাত থেকেই প্রায় ১ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয় বলে দাবি তাদের।

ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। দালাল চক্রের সদস্যদের দাবি, লেখাপড়ায় দুর্বল প্রার্থীদের লাইসেন্স করাতে প্রায় ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত এবং তুলনামূলকভাবে সক্ষম প্রার্থীদের ক্ষেত্রে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে এসব খাত থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ লেনদেন হয় বলে দাবি দালাল চক্রের সদস্যদের। তাদের ভাষ্য, আমরা করলে টাকা কম লাগে, আর সেবাগ্রহীতারা সরাসরি করলে খরচ আরও বেশি পড়ে যায়।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএ ঢাকা মেট্রো সার্কেল–২-এর উপপরিচালক প্রকৌশলী সৈয়দ আইনুল হুদা চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, বিআরটিএ প্রাঙ্গণের ভেতরে দালালের কোনো দৌরাত্ম্য নেই। গেটের বাইরে দালাল থাকলে সে বিষয়ে তাদের কিছু করার নেই।
তবে অফিসের ভেতরে যাতে কোনো দালাল প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
প্রকৌশলী আইনুল হুদা চৌধুরী বলেন, নিয়মিত ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। মূল গেটে আনসার সদস্য মোতায়েন রয়েছে এবং সেবাগ্রহীতা ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। যারা প্রবেশ করেন, তাদের এন্ট্রি করে ঢুকতে হয়।
‘অফিসের ভেতরের কর্মকর্তারা অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছেন এবং বাইরের দালাল চক্রের মাধ্যমে কাজ করছেন’—এ ধরনের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটা দালালদেরই জিজ্ঞেস করুন। এ বিষয়ে তিনি অবগত নন বলেও জানান।
সরকারি প্রতিষ্ঠানে ঘন ঘন বিদ্যুৎ না থাকা এবং জরুরি প্রয়োজনে জেনারেটর চালু না হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপপরিচালক বলেন, বিদ্যুৎ থাকা বা না থাকা বিআরটিএর কিছু করার নেই—এভাবেই বিষয়টি এড়িয়ে যান।
ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি বিআরটিএর প্রধান কার্যালয় নিয়ন্ত্রণ করে। এ সংক্রান্ত বিস্তারিত ব্যাখ্যা এড়িয়ে যান তিনি।
সব বিষয়ে মন্তব্য জানতে বিআরটিএর পরিচালক (প্রশাসন) নাজনীন হোসেনকে মোবাইল ফোনে কয়েকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি।