সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ করে বর্তমান সরকার ‘আরেকটি ফ্যাসিবাদ’ এবং ‘অলিখিত বাকশাল’ প্রতিষ্ঠা করছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
বৃহস্পতিবার (৯ জুন) রাতে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শেষে সংসদের টানেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।এর আগে গুম প্রতিরোধ, বিচার বিভাগ ও স্থানীয় সরকারসংক্রান্ত বিতর্কিত কিছু বিল পাসের প্রতিবাদে বিরোধী দল সংসদ থেকে সাময়িক ওয়াকআউট করে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিগত স্বৈরাচারী শাসনের পতন হলেও তাদের অনুসৃত দমনমূলক নীতিগুলো এখনো বিদ্যমান।হাসিনা খারাপ হলেও হাসিনার নীতি বর্তমান সরকারের কাছে ভালো মনে হচ্ছে। বর্তমান সরকার দেশের প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে নির্লজ্জভাবে দলীয়করণ করছে, যা কার্যত আরেকটি ফ্যাসিবাদ এবং ‘অলিখিত বাকশাল’ প্রতিষ্ঠার শামিল।
তিনি বলেন, জনগণ এর আগে ফ্যাসিবাদকে রুখে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে কেউ যদি নতুন করে ফ্যাসিবাদ বা বাকশাল কায়েম করতে চায়, তবে ইনশাআল্লাহ জনগণকে সাথে নিয়ে আবারো তা রুখে দেওয়া হবে।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আজকের অধিবেশনে এমন কিছু জনবিরোধী বিল উত্থাপন করা হয়েছে যা সুস্পষ্টভাবে জনগণের অধিকার হরণ করে।আমরা এর প্রতিবাদ জানাতে চাইলে সংসদে আমাদের কথা বলার সুযোগ সীমিত করা হয়। বিরোধীদলীয় সদস্যদের জন্য মাত্র ২ থেকে ৬ মিনিট সময় বরাদ্দ করা হলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা কোনো সময়সীমা ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেছেন। স্পিকারের এই ধরনের ভারসাম্যহীন আচরণ সংসদীয় রীতির পরিপন্থী।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করার অভিযোগ তুলে জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, সরকার এমন সব বিল পাস করছে যার মাধ্যমে বিচারক নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ নির্বাহী বিভাগের হাতের মুঠোয় চলে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিচার বিভাগ নিয়ে যে নিরপেক্ষ অধ্যাদেশ ছিল, বর্তমান সরকার তা বাতিল করে পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে গেছে। এর ফলে অতীতে যেভাবে বিচারপতি খায়রুল হক বা মানিকের মতো দলীয় বিচারপতিদের জন্ম হয়েছে, ভবিষ্যতেও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা নিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সরিয়ে বেপরোয়াভাবে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিএনপি তাদের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবে পরিষ্কার বলেছিল যে বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া প্রশাসক বসানো যাবে না। কিন্তু সরকার কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই স্থানীয় সরকারের প্রতিটি স্তরে দলীয়করণ সম্পন্ন করেছে।
শেরপুর ও বগুড়া উপ-নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ৯৪ সালে মাগুরায় যে কলঙ্কিত নির্বাচন হয়েছিল, আজ বগুড়া ও শেরপুরে একই ধরনের স্টাইল দেখা গেছে। দলীয় সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় তা আবারও প্রমাণিত হলো। শেরপুর-৩ আসনে আমাদের একজন কর্মীকে হত্যার পর আজ আরেকজন কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এই খুনিদের বিচার দাবি করছি।
সংবাদ সম্মেলনে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, বিচার বিভাগের স্বতন্ত্র সচিবালয় অধ্যাদেশ ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সরকার বাতিল বা সংশোধন করে সেগুলোকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে চাইছে। বিরোধী দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ থাকা সত্ত্বেও সরকার গায়ের জোরে এসব আইন পাস করছে।
ডা. শফিকুর রহমান দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, ‘আমরা সংসদ বর্জন করিনি। আমরা সংসদে যাবো এবং জনগণের অধিকারের পক্ষে কথা বলবো। তবে যদি জনস্বার্থবিরোধী কোনো আইন পাস হয়, তবে আমাদের কণ্ঠ আবারো গর্জন করে উঠবে।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামী ও বিরোধী জোটের শীর্ষস্থানীয় সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তারা সরকারের এই অবস্থানের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।