মধ্যরাতের মঞ্চে রুনা লায়লার ‘সাধের লাউ’, খুরশীদ আলমের নাচ

মধ্যরাতের মঞ্চে রুনা লায়লার ‘সাধের লাউ’, খুরশীদ আলমের নাচ

মধ্যরাত। বগুড়ার মম ইন-এর সবুজ চত্বরে তখনো শত শত দর্শকের উপস্থিতি। ক্লান্তির চিহ্ন নেই—বরং আগ্রহ নিয়ে দেখছিলেন মঞ্চের আয়োজন। ঠিক সেই সময় মঞ্চে উঠলেন রুনা লায়লা। তাঁর কণ্ঠে ভেসে এল ‘সাধের লাউ বানাইলাম বৈরাগী’। দর্শকেরাও সুর মেলালেন।

হঠাৎ গানের তালে মঞ্চে উঠে এলেন আরেক অগ্রজ; ‘চুমকি চলেছে একা’ গানের শিল্পী খুরশীদ আলম। গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কোমর দুলিয়ে নাচলেন তিনি। মুহূর্তেই ফেটে পড়ে তুমুল করতালি। উপস্থিত অনেকের মতে, এটাই ছিল ‘টিএমএসএস চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫’-এর সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত। অনুষ্ঠানে যেমন ছিল বিচিত্র আয়োজন, তেমনি ছিল নানা চমকও।

মঞ্চে একেবারে শেষ দিকে ওঠা রুনা লায়লা শুরুতেই শোনান গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা ও শফিক তুহিনের সুর করা একটি দেশাত্মবোধক গান। এরপর খালি কণ্ঠে গাইলেন সাম্প্রতিক ঈদের সিনেমার আলোচিত গান ‘জ্বালা জ্বালা’। তাঁর সঙ্গে মঞ্চে যোগ দেন ইমরান মাহমুদুল ও কোনাল। কথার ফাঁকে রুনা শোনান ‘সাধের লাউ’ গাওয়ার শুরুর দিনের স্মৃতি—কলকাতা বিমানবন্দরের সেই প্রশ্ন, ‘আপনি কি সেই সাধের লাউ?’—যা শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে ওঠেন দর্শকেরা।

এর আগে মঞ্চ মাতান সাবিনা ইয়াসমীন। ‘এই মন তোমাকে দিলাম’ দিয়ে শুরু করে ভাওয়াইয়া ও ‘মুই না শুনন তোর কথা’—দুটি পরিবেশনাতেই দর্শকদের নস্টালজিয়ায় ভাসান তিনি।

পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী এই ঝলমলে আয়োজনে বিভিন্ন সময়ে মঞ্চে গান পরিবেশন করেন খুরশীদ আলম, রফিকুল আলম,অণিমা রায় থেকে শুরু করে সমকালীন শিল্পী কোনাল, ইমরান মাহমুদুল, সিঁথি সাহা, ঝিলিক, লিজা, লুইপা, মাহতিম শাকিব, এঞ্জেল নূরসহ অনেকে। নাচ ও বিশেষ পরিবেশনাও ছিল বাড়তি আকর্ষণ। রাত ১১টার পর বগুড়ার সন্তান অপু বিশ্বাস ও আদর আজাদের অংশগ্রহণে বেহুলা–লখিন্দরের গল্পভিত্তিক নৃত্যনাট্য দর্শকদের আলাদা আনন্দ দেয়।

২০০৪ সালে শুরু হওয়া এই আয়োজন দুই দশক পেরিয়ে এবার আরও বড় পরিসরে হাজির হয়েছে উত্তরবঙ্গে। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সন্ধ্যায় বগুড়ার মম ইন-এর উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে বসে এবারের আসর। সমবেত কণ্ঠে ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’ ও ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’—এই দুটি গানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান।

উদ্বোধনী পর্বে বক্তব্য দেন চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং টিএমএসএসের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক হোসনে আরা বেগম। এ সময় সংগীতশিল্পীদের অবদানের প্রশংসা করে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান আয়োজকেরা। আরও উপস্থিত ছিলেন চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তাপ্রধান শাইখ সিরাজ, টিএমএসএসের উপদেষ্টা মওদুদ হোসেন, অন্য প্রকাশের মাজহারুল ইসলাম, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সানাউল আরেফিন, ইমপ্রেস গ্রুপের পরিচালক জহির উদ্দিন মাহমুদ, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত মুকিত মজুমদার, আনন্দআলো সম্পাদক লেখক রেজানূর রহমান প্রমুখ।

এ আয়োজন ঘিরে বগুড়া শহরজুড়েও ছিল উৎসবের আমেজ। সকাল থেকেই রঙিন ব্যানার–ফেস্টুন, তারকাদের আনাগোনা আর দর্শকের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। বিকেল গড়াতেই ভেন্যুতে বাড়তে থাকে ভিড়, আর সন্ধ্যা নামতেই আলোঝলমলে মঞ্চে শুরু হয় জমকালো আয়োজন।

পুরস্কারের পূর্ণ তালিকা

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সম্মাননা প্রদান। শিল্পী কনকচাঁপাকে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। বিশেষ সম্মাননা পান লোকসংগীতশিল্পী কাঙ্গালিনী সুফিয়া।
এবারের আসরে মোট ১৮টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেওয়া হয়। আধুনিক গানে শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী হয়েছেন লিজা (‘খুব প্রিয় আমার’), ইউটিউবভিত্তিক আধুনিক গানে (১ লাখ ভিউ ও ১৫০০ লাইক) স্বীকৃতি পান এঞ্জেল নূর (‘যদি আবার’)। আধুনিক গানে শ্রেষ্ঠ সুরকার বাপ্পা মজুমদার (‘অবশেষে’), আর গীতিকার হিসেবে সম্মাননা পান তারেক আনন্দ (‘প্রেমবতী’) ও শাহনাজ কাজী (‘মা’)।

ব্যান্ড বিভাগে শ্রেষ্ঠ হয়েছে মেট্রিক্যাল (‘গণতন্ত্রের ঘুড়ি’), একই গানের জন্য শ্রেষ্ঠ সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার সেতু চৌধুরী।

দ্বৈত সংগীতে শ্রেষ্ঠ হয়েছেন ইমরান মাহমুদুল ও সিঁথি সাহা (‘প্রেম বুঝি’)। লোকসংগীতে শ্রেষ্ঠ শিল্পী বিউটি (‘চার চাঁদে দিচ্ছে ঝলক’), ইউটিউবভিত্তিক বিভাগে লটারি বিজয়ী শরিফ উদ্দিন দেওয়ান সাগর (‘মা লো মা’)।

চলচ্চিত্রের গানে শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী আতিয়া আনিসা (‘ছোট্ট সোনা’), ইউটিউব বিভাগে স্বীকৃতি পান দিলশাদ নাহার কনা (‘দুষ্টু কোকিল’)। সুরকার হিসেবে পুরস্কৃত শওকত আলী ইমন, গীতিকার রোহিত সাধুখাঁ (‘বেঁচে যাওয়া ভালোবাসা’)।

মিউজিক ভিডিও নির্মাতা হিসেবে সম্মাননা পান তানভীর তারেক (‘পাখি আমার নীড়ের পাখি’)। নজরুলসংগীতে শ্রেষ্ঠ শহিদ কবির পলাশ এবং উচ্চাঙ্গসংগীতে শ্রেষ্ঠ নাশিদ কামাল।

শ্রেষ্ঠ নবাগত শিল্পী হয়েছেন সভ্যতা (‘অধিকার’) এবং শ্রেষ্ঠ অডিও কোম্পানি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বেঙ্গল মিউজিক।

সব মিলিয়ে দুই দশকের ঐতিহ্য ধারণ করে বগুড়ার মাটিতে অনুষ্ঠিত এই আয়োজন হয়ে উঠেছে এক বর্ণাঢ্য, তারকাখচিত ও স্মরণীয় সংগীত উৎসব। প্রবীণ ও নবীন শিল্পীদের মিলনমেলা, দর্শকের উচ্ছ্বাস আর মঞ্চের চমক—সব মিলিয়ে ‘টিএমএসএস চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫’ ছিল সফল আয়োজন।

আয়োজনের প্রকল্প পরিচালক রাজু আলীম বলেন, ‘এই আয়োজনকে আমরা শুধু পুরস্কার প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখিনি, এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ সংগীত উৎসবে রূপ দিতে চেয়েছি। ঢাকার বাইরে আন্তর্জাতিক মানের আয়োজন সম্ভব—বগুড়ায় এই আয়োজনের মাধ্যমে সেটিই দেখাতে চেয়েছি। মানুষের প্রতিক্রিয়া উচ্ছ্বাস দেখে মনে হয়েছে সেটা আমরা পেরেছি। টিএমএসএস কতৃপক্ষকে আমরা ধন্যবাদ দিতে চাই।’
অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন নীল হুরেজাহান ও অপু মাহফুজ। আয়োজনের গ্রন্থনা, পরিকল্পনা ও প্রযোজনায় ছিলেন ইফতেখার মুনিম।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS