দিনে আট ঘণ্টার বেশি কাজ কি মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়?

দিনে আট ঘণ্টার বেশি কাজ কি মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়?

অফিসে আট ঘণ্টা কাজের নিয়ম থাকলেও অনেকে এর চেয়েও বেশি সময় ধরে কাজ করেন। কেউ কেউ নিয়মিতই অতিরিক্ত সময় ধরে কাজ করেন। এভাবে দীর্ঘসময় কাজ করার কারণে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এ সংক্রান্ত প্রথম বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৬ সালে দীর্ঘসময় কাজ করার ফলে স্ট্রোক ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৭ লাখ ৪৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

জাপানে এর একটি নাম আছে ‘কারোশি’, যার মানে অতিরিক্ত কাজ করতে করতে মৃত্যু। সরকারিভাবেই কারোশিতে আক্রান্ত হয়ে ২০১৭ সালে ২৩৬ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে জাপান সরকার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় বলা হয়, দীর্ঘসময় কাজ করার ফলে সবচেয়ে ক্ষতির শিকার হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানুষ।

যারা সপ্তাহে ৩৫ থেকে ৪০ ঘণ্টা কাজ করেন তাদের তুলনায় যারা সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টা বা তার বেশি কাজ করেন তাদের স্ট্রোকের ঝুঁকি ৩৫ শতাংশ বেড়ে যায় এবং হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি ১৭ শতাংশ বেশি থাকে বলে গবেষণায় পাওয়া গেছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সঙ্গে যৌথভাবে করা এ গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দীর্ঘসময় কাজের কারণে যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই মধ্যবয়সী বা বয়স্ক পুরুষ।

অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘসময় কাজ করার অনেক বছর পর, কখনো কখনো দশক পর, এই মৃত্যুগুলো ঘটে।

করোনা মহামারির পর অতিরিক্ত কাজ করার প্রবণতা অনেক বেড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টেকনিক্যাল অফিসার ফ্র্যাঙ্ক পেগা বলেন, আমাদের কাছে কিছু প্রমাণ আছে যে, যখন কোনো দেশে লকডাউন হয়, তখন কাজের সময় প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে যায়।

দীর্ঘসময় কাজ করা মোট কাজ-সংক্রান্ত রোগের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী। তাই বলা যায়, দীর্ঘসময় কাজ করা পেশাগত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

গবেষকরা বলেছেন, দীর্ঘসময় কাজ করলে দুইভাবে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়– প্রথমত, অতিরিক্ত চাপ থেকে শরীর ও মনে সরাসরি প্রভাব পড়ে। মানসিক চাপ বাড়ায় অবসাদ দেখা দিতে পারে, শরীরেও ব্যথা হয় এমনকি কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ল্যানসেট জার্নালে উঠে এসেছে, এতে হার্টের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ সংক্রামক রোগ, ডায়াবেটিস ও পেশীর সমস্যাও দেখা দেয়।

দ্বিতীয়ত, বেশি সময় কাজ করলে মানুষ ধূমপান, মদ পান, কম ঘুম, কম ব্যায়াম এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার মতো ক্ষতিকর অভ্যাসে জড়িয়ে পড়ে।

ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রাহাত হোসেন বলেন, আগের চাকরিতে দীর্ঘসময় কাজ তার মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলেছিল।

তিনি বলেন, সপ্তাহে ৬০ থেকে ৬৫ ঘণ্টা কাজ করাটা ছিল স্বাভাবিক। অনেক সময় টানা কয়েক সপ্তাহ বাড়ির বাইরে থাকতে হতো।

রাহাত বলন, কাজের এতে স্ট্রেস নিতে নিতে আমি ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছিলাম, সবসময় মেজাজ খিটখিটে থাকতে, কাজ শেষে শরীর-মন সব ভেঙে পড়তে। চার বছর পর তিনি সেই চাকরি ছেড়ে দেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, কর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনা করে নিয়োগদাতাদের এখন এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত।

ফ্র্যাঙ্ক পেগা আরও বলেন, কাজের সময় সীমিত করা নিয়োগদাতাদের জন্যও ভালো, কারণ এতে উৎপাদনশীলতা বাড়ে।

তার মতে, ‘অর্থনৈতিক সংকটের সময় কাজের ঘণ্টা বাড়ানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।’

সূত্র: বিবিসি

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS