পল টমাস অ্যান্ডারসন ও থমাস পিনচন—আমেরিকান পপ কালচারের এই দুই মহারথীর ‘ব্রোমান্স’ নতুন করে ডালপালা মেলেছে বড় পর্দায়। ২০১৪ সালে পিনচনের উপন্যাস অবলম্বনে ‘ইনহিরেন্ট ভাইস’ বানিয়ে অ্যান্ডারসন বুঝিয়েছিলেন, বিশৃঙ্খল আর সাইকেডেলিক জগৎকে তুলে ধরার মুনশিয়ানা তাঁর কতটা সহজাত। এবার তিনি যেন এলেন আরও পরিণত হয়ে। পিনচনের ১৯৯০ সালের উপন্যাস ‘ভাইনল্যান্ড’ অবলম্বনে অ্যান্ডারসন নির্মাণ করেছেন ‘ওয়ান ব্যাটেল আফটার অ্যানাদার’। ২০২৫ সালে মুক্তি পাওয়া এ সিনেমা ব্ল্যাক কমেডি, পলিটিক্যাল থ্রিলার আর অ্যাকশনের এক অদ্ভুত মিশেল। এরই মধ্যে অস্কারে ১৩টি এবং বাফটায় সর্বোচ্চ ১৪টি মনোনয়ন পেয়ে রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছে ছবিটি।
একনজরে
সিনেমা: ‘ওয়ান ব্যাটেল আফটার অ্যানাদার’
ধরন: ব্ল্যাক কমেডি অ্যাকশন থ্রিলার
ভাষা: ইংরেজি
পরিচালনা: পল টমাস অ্যান্ডারসন
অভিনয়: লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও, শন পেন, বেনিসিও দেল তোরো, রেজিনা হল, তিয়ানা টেইলর, চেজ ইনফিনিটি
স্ট্রিমিং: এইচবিও ম্যাক্স
দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ৪২ মিনিট
দুটি ভিন্ন সময়ের গল্প বলা এ সিনেমায় হলিউডের অন্যতম সেরা অভিনেতা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও বব নামের সাবেক এক বিপ্লবীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ববকে এককথায় ‘ছন্নছাড়া’ বলাই শ্রেয়। সে একসময় এক সশস্ত্র বিপ্লবী দলের অংশ ছিল, যারা মেক্সিকো সীমান্তে অভিবাসীদের আটকে রাখা কারাগার বা ডিটেনশন সেন্টারে হামলা চালাত। সেখানে ববের কাজ ছিল সামান্যই। আতশবাজি ফাটিয়ে প্রহরীদের মনোযোগ অন্যদিকে ফেরানো। তবে এই দলের আসল কুশীলব ছিল তার প্রেমিকা পারফিডিয়া (তিয়ানা টেইলর) ও দলের প্রধান ডিয়ান্দ্রা (রেজিনা হল)।
গল্পে মোড় আসে তখনই, যখন পারফিডিয়াকে ঘিরে তৈরি হয় এক ত্রিমুখী জটিলতা। বিপ্লবী দলের ওপর আক্রমণ চালাতে আসা কট্টর মেজাজি কর্নেল স্টিভেন লকজ (শন পেন) পারফিডিয়ার প্রতি এক বিকৃত যৌন আকর্ষণ অনুভব করে। লকজ চরিত্রটি একই সঙ্গে ভীতি–জাগানিয়া এবং কার্টুনিশ। পারফিডিয়া সেই বিকৃত আকর্ষণকে খুব ঠান্ডা মাথায় ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এই কর্নেল লকজের নোংরা ফ্যান্টাসিকে পুঁজি করে সামরিক বাহিনীর মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া। কিন্তু সফল হননি তিনি। পরিস্থিতি এতটাই জটিল ও সহিংস হয়ে ওঠে যে ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা পারফিডিয়াকে অ্যাসল্ট রাইফেল চালিয়ে নিজের পথ করে নিতে হয়। স্বীকার করতে হয়, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় অ্যাসল্ট রাইফেল হাতে পারফিডিয়ার গুলি চালানোর দৃশ্যটি ছিল সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী একটি দৃশ্য।
এরপর সময় গড়ায়। সিনেমার কাহিনি বর্তমানে ফিরে আসে। এখন বব এক মাদকাসক্ত, বিভ্রান্ত সিঙ্গল ফাদার। সে বড় করছে তার মেয়ে উইলাকে (চেইজ ইনফিনিটি)। বব নিশ্চিত নয় উইলা তার নিজের মেয়ে কি না, তবু সে তাকে আগলে রাখে। কিন্তু অতীতের দুঃস্বপ্ন আবারও তাদের ঘিরে ধরে। কর্নেল লকজ ফিরে আসে, আর শুরু হয় এক ইঁদুর-বিড়াল দৌড়।
দ্য গার্ডিয়ান যেমনটা বলছে, সিনেমাটি আসলে ‘অ্যান্ডারসন-পিনচনীয়’ কাউন্টার-কালচার বা প্রতিসংস্কৃতির এক নতুন দ্যোতনা। অ্যান্ডারসন এখানে আমেরিকায় ওবামা–যুগের শেষ দিনগুলোর সঙ্গে ট্রাম্প প্রথম শাসনকালের বাগাড়াম্বরকে যেন এক সুতায় গেঁথেছেন। অভিবাসী মা–বাবার কাছ থেকে শিশুদের আলাদা করা, আইসিই বা ইমিগ্রেশন পুলিশের গোপন তৎপরতা এবং শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের বিষাক্ত রূপ—সবই উঠে এসেছে রূপক অর্থে। যদিও সিনেমায় সরাসরি ‘মাগা’ (মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) বা ‘বিএলএম’–এর (ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার) উল্লেখ নেই, তবু এর প্রতিটি ফ্রেমে বর্তমান আমেরিকার রাজনৈতিক অস্থিরতার ছাপ স্পষ্ট।
বলা বাহুল্য, লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও তাঁর অভিনয়ের শ্রেষ্ঠত্ব বহুবার প্রমাণ করেছেন। এখানেও তিনি হতাশ করেননি। তাঁর বহু সিনেমার মতো এখানেও লিওনার্দোর চরিত্রটি কোনো প্রথাগত নায়কের নয়। এ সিনেমায় তিনি একজন নেশাগ্রস্ত বাবা, যার মগজ এতটাই এলোমেলো হয়ে গেছে যে জরুরি কোনো বার্তা বা সংকেত এখন আর তার মনে থাকে না। ডিক্যাপ্রিও তাঁর শারীরিক ভাষায় এক অদ্ভুত ক্লান্তি আর অসহায়ত্ব ফুটিয়ে তুলেছেন, যা দর্শকদের সহানুভূতি সহজেই আদায় করে নিতে পারে। সিনেমাবোদ্ধারা বলছেন, ববের এই স্বাভাবিক মানবিক রূপটিই সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী দিক।
অন্যদিকে শন পেনের অভিনয় নিয়ে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কর্নেল লক জ চরিত্রে তাঁর টিকটিকির মতো মাথা নাড়ানো, চিবুক উঁচিয়ে কথা বলা এবং অদ্ভুত সব অঙ্গভঙ্গি কাউকে কাউকে মুগ্ধ করেছে। গার্ডিয়ানের মতে, তিনি এক ‘লিজার্ডলি’ ভিলেন। কিন্তু অনেক দর্শকের কাছে তাঁর অভিনয় মনে হতে পারে বড্ড মেকি এবং কমেডি ঘরানার। পেনের চরিত্রটি এতই গোঁয়ার এবং কার্টুনিশ যে, তাঁর কাছ থেকে আসা হুমকিটা অনেক সময় বাস্তব মনে হয় না। একটি দৃশ্যে তিনি যখন নিজের মেয়েকে হত্যা করতে উদ্যত হন, তখন তাঁর সেই জিঘাংসার কোনো মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না।
তবে নবাগত চেজ ইনফিনিটি (উইলা চরিত্রে) এবং বেনিসিও দেল তোরো (সেনসাই চরিত্রে) নিজেদের অভিনয়ের জায়গায় চমৎকার মানিয়ে ছিলেন। বিশেষ করে রহস্যময় অভিভাবকের চরিত্রে দেল তোরোর স্বভাবসুলভ আয়েশি ভঙ্গিতে অভিনয় দারুণ মানিয়ে গেছেন।
সিনেমায় জনি গ্রিনউডের স্নায়ুচেরা আবহসংগীত ও স্কোর মিউজিক ছবির বিশৃঙ্খল মেজাজের সঙ্গে দারুণভাবে খাপ খায়। ভিসতা–ভিশন ক্যামেরায় ধারণ করা সিনেমাটির দৃশ্যগুলো চোখে বেশ আরাম দেয়। তবে এত প্রশংসার পরও বলতে হয় সিনেমাটি সবার জন্য একই রকম অনুভূতি তৈরি না–ও করতে পারে। যেমনটা বোঝা যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রেডিট ঘাঁটাঘাঁটি করলে। সেখানে বেশ কিছু রিভিউয়ার দাবি করেন, ছবির চিত্রনাট্যে বেশ কিছু ফাঁকফোকর রয়ে গেছে।
তবে এটা মানতে হবে, ‘ওয়ান ব্যাটেল আফটার অ্যানাদার’ সিনেমাটি সবার পক্ষে সহজে হজম হওয়ার নয়। এটি সেই দর্শকদের জন্য, যাঁরা বিশৃঙ্খলার মাঝে সৌন্দর্য খুঁজে পান। যদি আপনি প্রথাগত গল্পের চেয়ে ডার্ক জনরা বেশি পছন্দ করেন, তবে এই সিনেমা আপনার জন্য ‘জ্যাকপট’ হতে পারে। এর পাগলামি, এর গতি এবং এর রাজনৈতিক ইঙ্গিতগুলো আপনাকে ভাবাবে। কিন্তু যদি এই সিনেমায় আপনি একটি নিখুঁত গল্প, শক্তিশালী ভিলেন এবং মনে রাখার মতো সংলাপ খোঁজেন, তবে আপনি কিছুটা হতাশও হতে পারেন।