রোনালদো থেকে নেইমার: কেন ক্যারিয়ারের মাঝপথেই হারিয়ে যান ব্রাজিলিয়ান তারকারা?

রোনালদো থেকে নেইমার: কেন ক্যারিয়ারের মাঝপথেই হারিয়ে যান ব্রাজিলিয়ান তারকারা?

২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সির মালিক নেইমারের শারীরিক ফিটনেস এবং মাঠের বাইরের জীবনযাপন নিয়ে বিতর্ক ফের উস্কে দিয়েছে এক পুরনো প্রশ্ন;  ব্রাজিলের ফুটবল তারকারা কেন ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত সময়ে এসে এত দ্রুত পারফর্ম্যান্সের শীর্ষস্থান থেকে ছিটকে যান?

চলতি বিশ্বকাপে কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিল দলে নেইমার খেলছেন ৩৪ বছর বয়সে; যেখানে রোমারিও, রোনালদো নাজারিও, রোনালদিনহো এবং আদ্রিয়ানোর শেষ বিশ্বকাপ খেলার বয়স ছিল যথাক্রমে ২৮, ২৯, ২৬ এবং ২৪ বছর। তবুও নেইমার তার সেরা শারীরিক ফর্মে ছিলেন না এবং দলে খেলেছেন কেবল প্রতিভার ও ব্যাপক সমর্থনের জোরে।অথচ একই সময়ে ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি কিংবা ৪১ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এখনও আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রভাব ফেলছেন। তবে কি ইউরোপ বা অন্যান্য দেশের ফুটবলারদের তুলনায় ব্রাজিলিয়ানদের ক্যারিয়ারের আয়ু অনেকটাই কম?

অবশ্য এর পেছনে একেক তারকার একেক রকম ব্যক্তিগত কারণ ছিল।

রোনালদো নাজারিওর ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল হাঁটুর মারাত্মক চোটে, যার কারণে মাত্র ২৯ বছর বয়সেই তার শেষ বিশ্বকাপ খেলতে হয়। ২০১০ বিশ্বকাপে আচরণগত ও শারীরিক সমস্যার কারণে ২৮ বছরের আদ্রিয়ানো এবং ৩০ বছরের রোনালদিনহোকে দলে নেননি তৎকালীন কোচ দুঙ্গা। 

২০১৪ সালে ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ৩২ বছরের কাকা ছিলেন না নিজের চেনা ফর্মে। অন্যদিকে, রোমারিও ১৯৯৪ সালে ২৮ বছর বয়সে শিরোপা জয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার পর ১৯৯৮ সালে চোটের জন্য বাদ পড়েন এবং ২০০২ সালে ৩৬ বছর বয়সে খেলার মতো পরিস্থিতিতে থাকলেও কোচ লুইস ফেলিপে স্কলারিও তাকে আর বিবেচনা করেননি।

তবে জিনেদিন জিদান, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা বা আন্দ্রেয পিরলোদের মতো অন্য দেশের ফুটবলারদের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ব্রাজিলিয়ান তারকাদের পারফর্ম্যান্সের অবক্ষয় ঘটেছে বেশ দ্রুতই।

রিও দি জেনেইরো স্টেট ইউনিভার্সিটির যোগাযোগের অধ্যাপক ফিলিপ মোস্তারোর মতে, এর পেছনে বড় কারণ হলো মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত বিষয়। শৈশব থেকেই তীব্র মানসিক চাপ ও উথান-পতনের মধ্য দিয়ে গিয়ে তারা অল্প বয়সেই সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছে যান। তবে অর্জনের সব চূড়া ছোঁয়ার পর অতিরিক্ত শারীরিক চাপ সামলানোর মানসিকতা হারিয়ে ফেলেন অনেকেই। অর্জিত অর্থ দিয়ে মাঠের বাইরের জীবন উপভোগ করাকেই তারা প্রাধান্য দিতে শুরু করেন।

আধুনিক ক্রীড়াবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে অ্যাথলেটদের ফিটনেস ও রিকভারি প্রসেস আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। দীর্ঘ ক্যারিয়ার গড়ার জন্য এখন ‘ইনভিজিবল ট্রেনিং’ বা মাঠের বাইরের নিয়মানুবর্তিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, বিশ্রাম ও পর্যাপ্ত ঘুম পারফর্ম্যান্স ধরে রাখতে সাহায্য করে।

উদাহরণ হিসেবে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং লিওনেল মেসির কথা বলা যায়। রোনালদো শর্করা পরিহার করে উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাবার খান এবং চিনি, ফাস্টফুড, অ্যালকোহল ও ময়দার তৈরি খাবার পুরোপুরি এড়িয়ে চলেন। মেসিও তার ইতালিয়ান পুষ্টিবিদ জিউলিয়ানো পোসারের পরামর্শে ডায়েট বদলে ক্যারিয়ার দীর্ঘায়িত করেছেন। এমনকি এমবাপ্পে (২৭) ও আর্লিং হালান্ডের (২৬) মতো নতুন প্রজন্মের তারকারাও এখন থেকেই কড়া ডায়েট মেনে চলছেন।

ইএসপিএনের ধারাভাষ্যকার ও ব্রাজিলের সাবেক ফুটবলার জে এলিয়াস মনে করেন, আধুনিক ফুটবলে কেবল প্রতিভা নয়, বরং বয়স ও শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে কৌশলগতভাবে নিজেকে বদলে নেওয়ার ক্ষমতাই ক্যারিয়ার দীর্ঘ করে।

তিনি উদাহরণ দিয়ে জানান, রোনালদো শুরুতে ড্রিবলিং নির্ভর লেফট-উইঙ্গার থাকলেও পরে নিজেকে কার্যকারী সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ডে রূপান্তর করেন। মেসিও ডান প্রান্ত জুড়ে দৌড়ানোর ধরণ বদলে কিছুটা রক্ষণাত্মক দায়িত্ব কমিয়ে আক্রমণভাগে মন দিয়েছেন। আর পিরলো তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুতে সনাতন ১০ নম্বর পজিশনে থাকলেও গতির সাথে মানিয়ে নিতে পরে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খেলে ইতিহাসের অন্যতম সেরায় পরিণত হন।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, আধুনিক ফুটবলে দীর্ঘ ক্যারিয়ার গড়ে তোলার বিষয়টি এখন আর শুধুই স্কিল বা প্রতিভার ওপর নির্ভর করে না। চোট প্রতিরোধ, কৌশলগত পরিবর্তন এবং সবচেয়ে বড় কথা; মাঠের বাইরের শৃঙ্খলাই নির্ধারণ করে দেয় একজন তারকা কতদিন ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে রাজত্ব করতে পারবেন।

তথ্যসূত্র: গ্লোবো

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2026 EU BANGLA NEWS