News Headline :
তিন শিক্ষার্থীকে দফায় দফায় পেটালেন সালাহউদ্দিন আম্মারসহ শিবির নেতারা – রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

তিন শিক্ষার্থীকে দফায় দফায় পেটালেন সালাহউদ্দিন আম্মারসহ শিবির নেতারা – রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

তিন শিক্ষার্থীকে দফায় দফায় পিটিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) ও শাখা ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা। আজ সোমবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের দপ্তরে প্রথমবার মারধর করা হয়। বিকেলে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে কয়েক দফায় এ ঘটনা ঘটে।

আহত শিক্ষার্থীরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আনাস, হাসিব এবং সংস্কৃত বিভাগের মাহমুদুল হাসান। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, সংস্কৃত বিভাগের এক ছাত্রীকে প্রেমের প্রস্তাব দেন একই বিভাগের মহসিন আলম নামের এক ছাত্র। প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ওই ছাত্রীকে বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখান মহসিন। এ ছাড়া বিভিন্ন মুঠোফোন নম্বর থেকে কল করে ওই ছাত্রীকে বলা হয় প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখান করা মহসিন আত্মহত্যা করেছেন এবং তাঁকে ক্যাম্পাস ছাড়ার হুমকি দেওয়া হয়।

এ ঘটনায় গতকাল রোববার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ওই ছাত্রী। অভিযোগের পর তাঁর সঙ্গে কথা বলে রোববার রাতে নিজ কার্যালয়ে বৈঠকে বসেন প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান। এ সময় মহসিন আলমের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আনাস, হাসিব, সংস্কৃত বিভাগের মাহমুদুল হাসান। তাঁরা অভিযোগ অস্বীকারের এক পর্যায়ে প্রক্টরের সঙ্গে উচ্চবাচ্য করেন।

দুই বছর ধরে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রশাসন থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। রাকসু প্রতিনিধিদের ওপর হামলা করা হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করা হবে না, এর নিশ্চয়তা কী? এর দায় কে নেবে? সেই জায়গা থেকে আমরা এখানে এসেছি।

সালাহউদ্দিন আম্মার, জিএস, রাকসু

একাধিক সূত্রে জানা যায়, প্রক্টর দপ্তরে গতকালকের ঘটনার বিষয়ে আজ দুপুরে আবারও একটি বৈঠক ডাকেন প্রক্টর। বৈঠকে রাকসুর জিএস (সাধারণ সম্পাদক) সালাহউদ্দিন আম্মার ও অন্য নেতারা আনাসকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী বলে অভিযোগ করেন। এ সময় আনাসের মুঠোফোন ঘেঁটে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে তাঁর ছবি পাওয়া যায়। এসব দেখিয়ে তাঁকে মারধর করেন সালাহউদ্দিন আম্মার ও এজিএস (সহসাধারণ সম্পাদক) এস এম সালমান সাব্বির। পরে বিষয়টি সাময়িকভাবে মীমাংসা করে সবাইকে প্রক্টর দপ্তর থেকে বের করে দেওয়া হয়।

পরে বেলা তিনটার দিকে রাকসু ভবনে গিয়ে রাকসু নেতা সালাহউদ্দিন আম্মার এবং রাকসুর তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বি এম নাজমুস সাকিবকে লক্ষ্য করে হামলা করেন আনাস, হাসিব, মাহমুদুলসহ কয়েকজন। এতে নাজমুস সাকিব আহত হন। এরপর আনাস, হাসিব ও মাহমুদুল কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষের সামনে অবস্থান নেন। এ সময় রাকসু ও শিবিরের নেতা–কর্মীরা এলে উভয় পক্ষের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা হয় এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে আনাস, হাসিব, মাহমুদুলরা গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষের ভেতরে আশ্রয় নেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রক্টর পাঠকক্ষের ভেতরে যান। কিছুক্ষণ পর রাকসু ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে ঢুকে আনাস, মাহমুদুল ও হাসিবকে কাঠ, বাঁশ, রড, বেল্টসহ লাঠিসোঁটা দিয়ে বেধড়ক মারধর করেন। হামলা ঠেকাতে পাঠকক্ষের অন্যান্য শিক্ষার্থী এগিয়ে এলে তাঁদেরকেও মারধর করা হয়।

পরে প্রক্টরিয়াল বডি, পুলিশ ও উপস্থিত শিক্ষার্থীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। গুরুতর আহত মাহমুদুল হাসানকে হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও গ্রন্থাগারের সামনে লাথি মারার পাশাপাশি টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন রাকসু ও শিবিরের নেতা–কর্মীরা। তাঁরা ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’, ‘ছাত্রলীগের ঠিকানা, এই ক্যাম্পাসে হবে না’ ইত্যাদি স্লোগান দিয়ে প্রশাসন ভবনে অবস্থান নেন। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বিচারের দাবিতে উপাচার্যের কার্যালয়ে প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করছিল রাকসু ও শিবির পক্ষ।

প্রক্টর মাহবুবর রহমান জানান, শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে পুলিশ আনাস ও হাসান নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির জন্য উপাচার্য দ্রুত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করবেন। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে সহাবস্থান ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ছাত্রশিবিরসহ অন্যরা প্রশাসনকে পূর্ণ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

সালাহউদ্দিন আম্মারদের হামলার কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে পড়ছিলেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হেলাল উদ্দীন। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে পড়ছিলাম। তারপর তাঁরা (ডাকসু ও শিবিরের নেতা–কর্মীরা) অতর্কিতভাবে রিডিং রুমে ঢুকে পড়েন। তারা যাকে পাচ্ছিল তাকেই ছাত্রলীগ ট্যাগ দিচ্ছিল। অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের দিকেও তাঁরা উগ্র হন এবং মারধর করেন। ছাত্রলীগ হলেও কাউকে মারার অধিকার তো কারও নাই। বিচারের জন্য দেশে আইন আছে।’

ছাত্রলীগের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে হামলার শিকার আনাস দাবি করেন, অতীতে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত বন্ধুদের সঙ্গে ছবি থাকলেও তিনি ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন না। আনাস বলেন, ‘আজকে আমাদের প্রক্টর অফিসে ডাকা হয়েছিল। সেখানে আমাকে ছাত্রলীগ ট্যাগ দেওয়া হয়। সালাউদ্দিন আম্মার লোকজন নিয়ে এসে আমাকে মারা শুরু করেন। তারপর আমাদের প্রক্টর অফিস থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তারপর আমরা সেখান থেকে লাইব্রেরিতে চলে আসি। এরপর অন্য কেউ হয়তো রাকসুর সামনে তাঁদের সঙ্গে হাতাহাতি করে। তারপর আম্মার লোকজন নিয়ে এসে লাইব্রেরির ভেতরে ঢুকে আমাকে মারধর করেন। আমার ওপর কমপক্ষে ২০০টির বেশি আঘাত করা হয়েছে।’

একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, একটি বেলচা হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভেতর তেড়ে যেতে চাইছেন সালাহউদ্দিন আম্মার। তাঁকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন সহপাঠীরা। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে বড় লাঠি দিয়ে একজনকে বেধড়ক পেঠাচ্ছেন আম্মার।

হামলায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে সালাহউদ্দিন আম্মারের বলেন, ‘আমরা নিয়ম অনুযায়ী প্রক্টরের মাধ্যমে ছাত্রলীগ কর্মী আনাসকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করার দাবি জানিয়েছিলাম। সে অনুযায়ী প্রক্টর তাঁকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। কিন্তু প্রশসান ভবনের সামনে নিয়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর তাঁরা রাকসু ভবনে গিয়ে আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা করে।’

আম্মার আরও বলেন, ‘দুই বছর ধরে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রশাসন থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। রাকসু প্রতিনিধিদের ওপর হামলা করা হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করা হবে না, এর নিশ্চয়তা কী? এর দায় কে নেবে? সেই জায়গা থেকে আমরা এখানে এসেছি।’

মারধরে শিবিরের অংশ নেওয়ার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সংগঠনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি জানান, হামলার খবর পেয়ে তাঁরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি দেখতে পান।

ভিডিও ফুটেজে শিবির–সমর্থিত প্যানেলের নির্বাচিত রাকসু নেতা সালমান সাব্বির, ইমরান লস্কর, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক মেহেদী সজীব, শিবিরের ক্যাম্পাস মনিটরিং কো-অর্ডিনেটর ফজলে রাব্বি মোহাম্মদ ফাহিম রেজাসহ অনেককে মারধরে অংশ নিতে দেখা গেছে। মারধরে তাঁদের উপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি শিবিরের সাধারণ সম্পাদক।

একটি ব্যক্তিগত বিরোধকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে গ্রন্থাগারের মতো জায়গায় হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলীম বলেন, দিনব্যাপী যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। তারা এখন পুলিশ, প্রশাসন, প্রক্টরিয়াল বডির সঙ্গে সভায় বসেছে। দ্রুত সময়ের ভেতর এ ঘটনা তদন্ত করতে একটি কমিটি গঠন করা হবে। দোষীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2026 EU BANGLA NEWS