অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য বাংলাদেশ সবসময় সম্ভাবনাময়। এখানে বিভিন্ন শিল্পের অগ্রযাত্রার জন্য আন্তর্জাতিক সক্ষমতা অর্জন ও বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলা করতে হয়েছে।
সম্প্রতি ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় জ্বালানি নিরাপত্তা প্রবল সংকটের মুখে পড়ে। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের দিকে আমাদের মনোযোগ বাড়তে শুরু করেছে।
এ খাতের অগ্রগতি, খাতসংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য ও স্বপ্ন নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ মিলল আয়োজিত পলিসি কনক্লেভে। বিগত দেড় দশকে জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জনের জন্য অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি। তবু জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য আমাদের অর্জিত হয়নি, বরং আমরা পিছিয়ে আছি।অর্থনৈতিক সংকটকালে এলএনজি, কয়লা এবং জ্বালানি তেলের মূল্যের দরপতন ঘটে চলেছে বলে দেশীয় শিল্পের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি হুমকির মুখে। এ প্রেক্ষাপটে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তা করতে হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগিয়ে যাওয়া একটি সঠিক ও বাস্তব নির্দেশনা।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) মূল্যায়ন বলছে, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ভবন যার বিশালসংখ্যক শিল্প-কারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাদ অব্যবহৃত পড়ে আছে। এসব ছাদে সোলার স্থাপনে দৈনিক অন্তত পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। অর্থাৎ বছরে প্রায় ৫ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় সুযোগ রয়েছে। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করে দৈনিক ৪ ঘণ্টা সূর্যালোক সংরক্ষণের মাধ্যমে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলে বছরে বিদ্যুৎ খাতে দেয়া ৪-৫ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি সাশ্রয় হবে। এছাড়া ২ দশমিক ৫ থেকে ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন কার্বন নিঃসরণ কমানো যাবে। তবু নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে আমরা কেন পিছিয়ে আছি? স্রেডার তথ্যই বলছে, সোলারের মাধ্যমে আমরা ৪০০-৫০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি বিদ্যুৎ উৎপাদন করছি। অর্থাৎ বিশাল অংশের অব্যবহৃত ছাদে সোলার স্থাপনের কাজে আমরা পিছিয়ে আছি। অথচ আমরা জানি একেকটি ভবনের ছাদই একেকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে আমরা এখন স্বপ্ন দেখছি এবং তা নিয়ে কথাও বলছি। কিন্তু যখনই এটিকে বাস্তব রূপ দিতে যাই তখন নানা প্রতিবন্ধকতা আমাদের পিছু টেনে ধরে।
সম্প্রতি সরকার নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। এ সিদ্ধান্ত আমাদের মধ্যে কিছুটা আশা জাগিয়েছে। এ ১০ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে পাঁচ হাজারই রুফটপ সোলারের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব। এ লক্ষ্যমাত্রার অংশ হিসেবে সোলার সরঞ্জামে ‘শূন্য শুল্ক’ সুবিধা ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বাস্তবতা হলো আমদানিকারকরা এ সুবিধা পাচ্ছেন না। সোলার প্যানেল ও ইনভার্টার আমদানিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দ্বিমুখী শর্ত জুড়ে দেয়ায় মাঠপর্যায়ে কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে। শুল্কহার শূন্য বলা হলেও এসআরওতে ভিন্ন অবস্থা দেখা গেছে। বড় মেগা প্রজেক্ট ও স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদকের (আইপিপি) নিয়মাবলি ছোট ছোট রুফটপ প্রজেক্টের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। আইপিপি প্রকল্প বড় পরিসরে হয়। আর রুফটপ প্রকল্প ২০০ থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের হয়। বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধাপে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। আগে ৪০০-৫০০ মেগাওয়াটের রুফটপ স্থাপন সম্ভব হলেও এ এসআরওর নির্দেশনায় বিনিয়োগ যে ব্যাহত হবে তা শতভাগ নিশ্চিত হয়ে বলা যায়। দ্বিমুখী শর্তের জটে এনলিস্টমেন্ট ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে। অথচ এখন ছোট প্রকল্পগুলো বেশি হচ্ছে। ছোট প্রকল্পের অনুমোদন নিতে গেলে দীর্ঘসূত্রতা বিনিয়োগ বাড়ায়। নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম প্রজেক্ট ভিত্তিতে আনা হয়। অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা বাড়লে তাই ব্যয় বাড়ে। সেজন্য এ খাতে এখন বিনিয়োগে ভালো ফল মিলবে এমন আশা বিনিয়োগকারীরা দেখতে পাচ্ছেন না। তারা উৎসাহ হারাচ্ছেন বলে কাঙ্ক্ষিত ‘নেট মিটারিং’ সুবিধার সঠিক বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে। এ জটিলতার দ্রুত নিরসন জরুরি।
প্রযুক্তিগতভাবে বাংলাদেশ এখন অনেকটাই স্বাবলম্বী। ওমেরা সোলার এ পর্যন্ত ১২০ মেগাওয়াটেরও বেশি রুফটপ সোলার স্থাপন করেছে। ২০২৭ সালের মধ্যে আরো ২০০ মেগাওয়াট সোলার বাস্তবায়নের পরিকল্পনা আছে। দেশেই এখন আন্তর্জাতিক মানের রোবোটিক সিস্টেম ও ল্যাব স্থাপনের মাধ্যমে নিজস্ব সোলার প্যানেল উৎপাদন করছি আমরা। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর এ প্যানেল এখন যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রফতানিও হচ্ছে। তাই ইউটিলিটি স্কেল এবং রুফটপ—উভয় প্রজেক্টেই দেশীয় উৎপাদিত প্যানেল ব্যবহারে অগ্রাধিকার ও নীতিগত সুবিধা দেয়া দরকার। এতে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে স্থানীয় শিল্প বিকশিত হবে। যখন অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকারীরা সুবিধা পাবেন তখন বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও এ খাতে আগ্রহী হতে শুরু করবেন।
আধুনিক প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য। বিদ্যুৎ কমানোর প্রধান উৎস হিসেবে এটিকে এখন বিবেচনা করা হয়। ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ ব্যবস্থার জন্য একটি সঠিক নীতিমালা দরকার। পিক সেভিং এবং লোডশেডিংয়ের মৌসুমে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোগান্তি বাড়ে। অথচ আমরা যদি সৌরবিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে রাখতে পারি তাহলে তা রাতে প্রয়োজনের সময় ব্যবহার করা যাবে। আবার অপ্রয়োজনে পাইকারি বিদ্যুৎ ব্যবহার কমবে। এভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় অনেক কমবে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এখন শুধু উৎপাদনই মূল কথা নয়। দেশের রফতানিমুখী শিল্প অর্থাৎ তৈরি পোশাক খাত, টেক্সটাইল, চামড়াজাত পণ্যগুলোকে পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদন করতে হচ্ছে। ক্রেতাদের দেয়া শর্তের অংশ হিসেবেই এটি নিশ্চিত করতে হচ্ছে। আবার এসডিজি-৭ লক্ষ্যমাত্রা পূরণেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বহুমুখী করা জরুরি। কিছুক্ষণ আগে কার্বণ নিঃসরণ কমার যে পরিসংখ্যান দিয়েছি সেটিই এ সম্ভাবনার প্রমাণ। সেক্ষেত্রে এদিকে নীতিমালা প্রয়োগ অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।
আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অগ্রাধিকার পায়। জ্বালানি খাতের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নীতিগত সহায়তা আরো বাড়ানো দরকার। আবার এ নীতিমালা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করলে দেশের শিল্পের অগ্রগতি বহুমুখী হবে। আমরাও অর্থনৈতিকভাবে আরো স্বাবলম্বী হব। বিদ্যুতের ব্যয় কমলে গ্রাহক পর্যায়ে স্বস্তি আসবে। বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। এমনকি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও মূল্যস্ফীতি কমবে। এজন্যই নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিরাপত্তা বিলাসিতা নয়, এটা আমাদের জন্য অর্থনৈতিক কৌশল। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার এ খাত ঘিরে যে স্বপ্ন ও লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে তা বাস্তবায়নে যথাযথ নীতিসহায়তা দেবে। আর তা খুব দ্রুত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেয়া হবে যাতে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হন এবং এ খাতের সম্প্রসারণ ঘটে।
মাসুদুর রহিম: প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), ওমেরা রিনিউয়েবল এনার্জি লিমিটেড
[বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]
সূত্র: বণিক বার্তা