আগেই একরম নিশ্চিত ছিলো। আজ এলো আনুষ্ঠানিক ঘোষনা।জিনেদিন জিদানকে আগামী চার বছরের জন্য ফ্রান্স জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
৫৪ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি দিদিয়ের দেশমের স্থলাভিষিক্ত হবেন।উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্স আশানুরূপ ফল করতে না পারায় দীর্ঘদিনের কোচ দেশম স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন।
বিশ্বকাপে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হয়েও সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল ফ্রান্স।এরপর তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও ইংল্যান্ডের কাছে হারতে হয় তাদের। হতাশায় নিমজ্জিত দলটির মনোবল চাঙ্গা করাই এখন জিদানের প্রধান লক্ষ্য হবে।
২০২১ সালে রিয়াল মাদ্রিদের কোচের পদ ছাড়ার পর এই নিয়োগের মাধ্যমেই আবারও কোচিং জগতে ফিরলেন ফরাসি এই ফুটবল আইকন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর জিদান বলেন, ‘আমি প্রায়ই বলি যে ফ্রান্স জাতীয় দলের চেয়ে বড় কিছু আর নেই। তাই ফ্রান্সের কোচ হওয়া আমার জন্য অনেক বড় আনন্দ এবং সম্মানের। এটি একইসাথে একটি বিশাল দায়িত্বও। আমার ওপর আস্থা রাখায় আমি ফেডারেশন সভাপতি ফিলিপ ডায়ালো এবং কার্যনির্বাহী কমিটিকে ধন্যবাদ জানাই। সেই সাথে দিদিয়ের দেশম ও তার স্টাফদের টানা চৌদ্দ বছরের কাজের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আজ আমার সব শিক্ষকদের কথা বিশেষভাবে মনে পড়ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ফ্রান্স দলকে নিয়ে আমার অনেক বড় উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন আছে!’
জিদান এখন তার সাবেক সতীর্থ দেশমের মতো এক অনন্য রেকর্ডের পথে হাঁটবেন; যিনি খেলোয়াড় এবং কোচ উভয় হিসেবেই বিশ্বকাপ জয়ের বিরল কীর্তি গড়েছেন।
ফ্রান্স ফুটবলের সাথে জড়িত সবাই জিদানের এই প্রত্যাবর্তনকে বেশ ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করেছে।
খেলোয়াড় হিসেবে জিদান সম্ভাব্য সবকিছুই জিতেছেন এবং তা ছিল দেখার মতো।
জিজুর জাদুকরী নৈপুণ্যে ১৯৯৮ সালে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ জিতেছিল ফ্রান্স। সেই ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানের জয়ে জিদান একাই দুটি দর্শনীয় হেড গোল করেছিলেন।
এর ঠিক দুই বছর পর জিদান আবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং ফ্রান্স দ্বিতীয়বারের মতো ইউরো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।
সেই সময়ে ফ্রান্সই প্রথম দল হিসেবে একই সাথে বর্তমান বিশ্বকাপ ও ইউরো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনন্য নজির গড়েছিল।
ফ্রান্সের হয়ে জিদান যেমন পাহাড়সম সাফল্য পেয়েছেন, তেমনি তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটেছিল এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মধ্য দিয়ে।
জাতীয় দলের জার্সিতে জিদানের শেষ ম্যাচ ছিল ২০০৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল। ইতালির মারকো মাতেরাজ্জিকে মাথা দিয়ে ঢুস মারার কারণে তাকে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় এবং সেই ম্যাচে টাইব্রেকারে হেরে শিরোপা খোয়ায় ফ্রান্স।
ফরাসি ভক্তরা আশা করছেন, ডাগআউটে জিদানের ফিরে আসা বার্লিনের সেই অভিশপ্ত রাতের গ্লানি মুছে দিতে সাহায্য করবে।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে কোচ হিসেবে এটিই জিদানের প্রথম পথচলা, যার জন্য তিনি দীর্ঘকাল ধরে অপেক্ষায় ছিলেন।
২০২১ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়ার পর থেকেই মনে হচ্ছিল জিদান আসলে দেশমের বিদায়ের জন্যই সময় গুনছিলেন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোচিং করানোর অভিজ্ঞতা না থাকলেও ক্লাব ফুটবলে জিদানের ঝুলিতে রয়েছে আকাশচুম্বী সাফল্য।
রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হিসেবে তিনি টানা তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের এক অনন্য ও নজিরবিহীন রেকর্ড গড়েছেন। এছাড়া দলটিকে দুটি লিগ শিরোপা এবং দুটি ক্লাব বিশ্বকাপও জিতিয়েছেন।
রিয়াল মাদ্রিদে বড় বড় তারকাদের সামলিয়ে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর দারুণ অভিজ্ঞতা জিদানের আছে; যা তিনি এখন ফ্রান্স দলেও প্রয়োগ করতে চাইবেন। ২০৩০ বিশ্বকাপে আবারও শিরোপা জয়ই হবে তার প্রধান লক্ষ্য।
কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান ডেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে এবং বারকোলার মতো তারকাসমৃদ্ধ আক্রমণভাগকে ঐক্যবদ্ধ রেখে খেলানোই হবে জিদানের বড় চ্যালেঞ্জ।
২০১৮ বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকেই মাঠের ফুটবলে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করতে কিছুটা ধুঁকছে ফ্রান্স। ফরাসিদের এই দুর্ধর্ষ আক্রমণভাগের সাথে রক্ষণের সমন্বয় ঘটানোর কঠিন দায়িত্বটি এখন জিদানের কাঁধে।
কোচ হিসেবে এটি জিদানের জন্য নতুন ধরণের পরীক্ষা হলেও রিয়ালের হয়ে নকআউট টুর্নামেন্টে তার রেকর্ড তাকে আত্মবিশ্বাস জোগাবে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেই অভিজ্ঞতা তিনি নিশ্চিতভাবেই জাতীয় দলের এই নতুন মিশনে কাজে লাগাবেন।