১০০ আবেদনেও মেলেনি চাকরি: লিডস থেকে ঢাকা, অভিজ্ঞতার ‘দেয়াল’ সর্বত্র

১০০ আবেদনেও মেলেনি চাকরি: লিডস থেকে ঢাকা, অভিজ্ঞতার ‘দেয়াল’ সর্বত্র

ইংল্যান্ডের পশ্চিম ইয়র্কশায়ারের লিডস শহর থেকে বাংলাদেশের ঢাকা—দূরত্ব হাজার মাইলের হলেও শিক্ষিত তরুণদের সংকটের গল্পটা প্রায় একই রকম। ১৯ বছরের ব্রিটিশ তরুণ কুবার্ন গত পাঁচ মাসে ১০০টির বেশি চাকরির আবেদন করেও ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁর প্রশ্ন একটাই, ‘সবাই অভিজ্ঞতা চায়, কিন্তু কাজ না পেলে আমি অভিজ্ঞতা পাব কোথায়? এই একই প্রশ্ন আজ বাংলাদেশের লাখ লাখ শিক্ষিত বেকারের।

অভিজ্ঞতা নেই, সুযোগ পাচ্ছেন না তরুণেরা

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিডস সিটি কলেজ থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে পি-টেক সম্পন্ন করা কুবার্ন জানিয়েছেন, এন্ট্রি-লেভেল বা একদম প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরির জন্যও নিয়োগকর্তারা ৫ বছরের অভিজ্ঞতা চাইছেন। শেফিল্ড কলেজের শিক্ষার্থী এম্মি ৬৫টি পার্টটাইম চাকরির আবেদন করে মাত্র ৩টি থেকে সাড়া পেয়েছেন। সেখানকার তরুণদের মতে, নিয়োগকর্তারা তরুণদের দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়ার বদলে কেবল ‘অভিজ্ঞতার সনদ’ খুঁজছেন।

ডিগ্রি আছে, চাকরি নেই

বাংলাদেশের চিত্রটি আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক। প্রতিবছর লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েট বের হলেও দেশের বেসরকারি খাতে এন্ট্রি-লেভেল পদের বিজ্ঞাপনেও ২-৩ বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। তাই দেশে লাখ লাখ ডিগ্রিধারী সার্টিফিকেট নিয়ে ঘুরছেন, কিন্তু চাকরি মিলছে না।

রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ শেষ করা এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গত এক বছরে আমি অন্তত ১৫টি প্রতিষ্ঠানে সিভি পাঠিয়েছি। বেশির ভাগ জায়গা থেকেই ডাক আসেনি। যেসব জায়গায় ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছি, সেখানেও প্রশ্ন করা হয়—আগে কোথাও কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে কি না। আমরা ফ্রেশাররা যদি সুযোগই না পাই, তবে অভিজ্ঞতা আসবে কোত্থেকে?”

বাংলাদেশে কেবল বেসরকারি খাত নয়, বিভিন্ন এনজিও এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানেও অভিজ্ঞ প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এতে করে নতুন পাস করা চাকরিপ্রার্থীরা শুরুতেই হোঁচট খাচ্ছে। ফলে অনেক তরুণ বাধ্য হয়ে টিউশনি কিংবা ছোটখাটো কাজ করে জীবন পার করছেন, যা তাঁদের অর্জিত ডিগ্রির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। লিডসের এম্মির মতো বাংলাদেশের তরুণেরাও মনে করেন, নিয়োগকর্তারা তাঁদের নিয়ে একধরনের ‘নেতিবাচক ধারণা’ পোষণ করেন—মনে করা হয় তরুণেরা হয়তো পেশাদারত্বে কম অভিজ্ঞ হবে।

ইংল্যান্ডে সম্প্রতি ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো হয়েছে, যা নিয়ে কুবার্ন চিন্তিত। তিনি মনে করেন, মজুরি বাড়লে কোম্পানিগুলো হয়তো কম অভিজ্ঞ তরুণদের বদলে দক্ষ কর্মী নিতেই বেশি আগ্রহী হবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও মুদ্রাস্ফীতির এই সময়ে বেতন-ভাতার দাবি বাড়লে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জনবল কমানোর পথে হাঁটে, যার প্রথম শিকার হন নতুনেরা।

সমাধান কোন পথে?

যুক্তরাজ্য সরকার তরুণদের জন্য ২.৫ বিলিয়ন পাউন্ডের বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ চালু করেছে। বাংলাদেশেও স্টার্ট-আপ সংস্কৃতির বিকাশ এবং যুবকদের ফ্রিল্যান্সিং বা কারিগরি প্রশিক্ষণে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল প্রশিক্ষণই যথেষ্ট নয়। নিয়োগকর্তাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনা জরুরি।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যদি বাধ্যতামূলক ‘পেইড ইন্টার্নশিপ’ বা শিক্ষানবিশ পদ তৈরি করা যায়, তবেই তরুণেরা প্রথম অভিজ্ঞতার স্বাদ পাবেন। লিডসের কুবার্ন কিংবা ঢাকার আসিফ (ছদ্মনাম)—সবারই চাওয়া একটাই, অভিজ্ঞতার দোহাই দিয়ে মেধাকে যেন শুরুতেই অবমূল্যায়ন করা না হয়।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS