টানা চার মাস ঊর্ধ্বমুখী থাকার পর গত মার্চ মাসে কিছুটা কমেছে মূল্যস্ফীতি। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির ৯.১৩ শতাংশ থেকে নেমে মার্চে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৭১ শতাংশে। তবে বাজারের বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এখনো সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরাতে পারেনি।
গতকাল বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৯.৩০ থেকে ৮.২৪ শতাংশ হয়েছে।
অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি সামান্য বেড়ে ৯.০১ থেকে ৯.০৯ শতাংশ হয়েছে। ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা বাড়ায় এ খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এ পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান মনে করেন, সরকারি মূল্যস্ফীতির তথ্য বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ নয়।
তাঁর ভাষ্য, বাজারে পণ্যের দাম যে হারে বাড়ছে তা পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হচ্ছে না। ফলে মূল্যস্ফীতি গণনার পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা জরুরি।
গ্রাম ও শহর উভয় এলাকায়ই মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। গ্রামে মূল্যস্ফীতি কমে ৯.২১ থেকে ৮.৭২ শতাংশ এবং শহরে ৯.০৭ থেকে ৮.৬৮ শতাংশ হয়েছে।
খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমলেও খাদ্যবহির্ভূত খাতে উভয় ক্ষেত্রেই সামান্য বৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে।
এদিকে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান এখনো সাধারণ মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। মার্চে মজুরি বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৮.০৯ শতাংশে, যা মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম। ফলে প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে টানা প্রায় ৫০ মাস ধরে বাস্তব আয়ে এই চাপ চলছে।
যদিও মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির ব্যবধান কিছুটা কমে এখন ০.৬২ শতাংশে নেমে এসেছে, তবু তা স্বস্তি ফেরানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
অন্যদিকে বাজার ঘুরে দেখা যায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই। বিশেষ করে ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা স্পষ্ট। এক সপ্তাহের ব্যবধানে খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি প্রায় ১০ টাকা বেড়ে ১৯৫ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে খোলা পাম তেলের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮৪-১৮৫ টাকায়। অথচ সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় এ দাম এখনো ২০-২৫ টাকা বেশি।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের সংকট ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবও বাজারে পড়ছে। এ কারণে পাইকারি থেকে খুচরা সব পর্যায়েই দাম বাড়ছে।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, এক মাসে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম প্রায় ৬ শতাংশ বেড়েছে। আর এক বছরের ব্যবধানে সয়াবিন তেলের দাম ১৮ শতাংশ এবং পাম তেলের দাম ১১ শতাংশ বেড়েছে।
এদিকে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকটও ভোক্তাদের ভোগান্তি বাড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ছোট বোতল না পেয়ে ক্রেতাদের বাধ্য হয়ে খোলা তেল কিনতে হচ্ছে। কিন্তু খোলা তেলের দামও বাড়তে থাকায় নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ওপর চাপ আরো বেড়েছে।
শুধু তেল নয়, মাছ, মাংস ও সবজির বাজারেও ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত। বাজারে রুই-কাতল ৩০০ থেকে ৪৮০ টাকা, পাবদা ৬৫০, টেংরা ৭৫০, চিংড়ি ১,২০০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। সবজির দামও বেশ চড়া। প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে।
এই বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েই চলেছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে কেনাকাটা করতে আসা এক ক্রেতা জানান, আগে যে টাকায় এক সপ্তাহের বাজার হতো, এখন সেই টাকায় অর্ধেকও হয় না। ফলে অনেকেই মাংস কমিয়ে বিকল্প খাবারের দিকে ঝুঁকছেন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি কমা মানে পণ্যের দাম কমা নয়; বরং দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। কিন্তু আয় সেই হারে না বাড়লে মানুষের ভোগান্তি কমে না। তাই পরিসংখ্যানগত স্বস্তি থাকলেও বাস্তবে সাধারণ মানুষের জন্য অর্থনৈতিক চাপ এখনো তীব্রই রয়ে গেছে।