ইরানের পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত ২৫ বছর বয়সী কাসেমকে তার সহকর্মীরা কয়েক ঘণ্টা ধরে খুঁজছিলেন। ৮ জানুয়ারি রাতে, সম্ভাব্য সহিংস বিক্ষোভ মোকাবিলায় ডিউটিতে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই তিনি নিখোঁজ হন। ওই রাতের আগপর্যন্ত দেশব্যাপী বিক্ষোভ মূলত শান্তিপূর্ণ ছিল।
শিফট শুরুর সময় পুলিশ অফিসাররা তেমন উদ্বিগ্ন ছিলেন না।
তারা লাঠি ও কিছু টিয়ার গ্যাস বহন করছিলেন, যা আগের দিনগুলোতে খুব কমই ব্যবহার করতে হয়েছিল। কিন্তু সে রাতে, সশস্ত্র ও নির্মম দাঙ্গাকারীদের মোকাবিলায় সেসব অস্ত্র পর্যাপ্ত ছিল না।
একদল সশস্ত্র দাঙ্গাকারী কাসেমকে ঘিরে ধরে। তারা তার পেটে ও বুকে একের পর এক ছুরি চালায়, গলাকাটে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে জীবন্ত অবস্থায় পুড়িয়ে মারে।দক্ষিণ ইরানের মার্ভদাশত শহরের একটি নির্জন এলাকায় তার সহকর্মীরা যখন তাকে খুঁজে পান, তখন কেবল তার বর্ম, পুড়ে যাওয়া মাথা এবং বিকৃত দেহাবশেষ অবশিষ্ট ছিল। প্রায় দুই মিটার লম্বা এই যুবকের দেহাবশেষ এতটাই বিকৃত ছিল যে, তা একটি ছোট বাক্সে রাখা সম্ভব হয়। কাসেমের এক সহকর্মী দৃশ্য দেখে মাটিতে বসে পড়ে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন। “আইএস জঙ্গিরাও কি এমন করে?”
অন্য দুই পুলিশ তাদের পানির বোতল থেকে সামান্য পানি নিয়ে কাসেমের ভস্মের ওপর ছিটিয়ে দেন।
কাসেমের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহযোদ্ধা মাটিতে বসে কাঁদতে থাকেন। তিনি জানান, কাসেম কিছুদিন আগে বিয়ের আংটি পরেছিলেন। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তার বিয়ে ও পরিবার শুরু করার পরিকল্পনা ছিল।
পশ্চিমা গণমাধ্যমে কাসেম এবং তার মতো আরও অসংখ্য মর্মস্পর্শী গল্প সাধারণত স্থান পায় না।
ফোনে স্বামীর মৃত্যুর শব্দ শোনা এক গর্ভবতী নারী
৯ জানুয়ারি, ইস্ফাহানের এক যুবতী নারীর জীবন চিরতরে বদলে যায়।তার পুলিশ অফিসার স্বামীকে শহর রক্ষায় পাঠানো হয়েছে জানতে পেরে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। রাত আনুমানিক ৯টার দিকে তিনি স্বামীকে ফোন করেন। ফোন ধরেন এক অপরিচিত পুরুষ। তিনি ছিলেন দাঙ্গাবাজদের একজন।
“আপনি ওই অফিসারের স্ত্রী?”
“হ্যাঁ, তিনি কি কাছে আছেন?”
“হ্যাঁ, আছেন। আপনি শুনতে পারবেন তিনি কীভাবে মারা যাচ্ছেন।”
এরপর ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসে তার স্বামীর চিৎকার, ছুরিকাঘাত ও প্রহারের শব্দ এবং শেষ নিঃশ্বাস। সাত মাসের গর্ভবতী এই নারী সাথে সাথেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে জরুরি সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়। তার স্বামীর দাফনের দিনেও তিনি কথা বলতে পারছিলেন না, খালি চোখে তাকিয়ে থাকতেন। চিকিৎসকদের মতে, এই ভয়াবহ ট্রমা থেকে সেরে উঠতে তার অনেক সময় লাগবে। তার অকালজাত শিশুটিও নিবিড় পরিচর্যায় রয়েছে, বেঁচে থাকা অনিশ্চিত। শিশুটির নানী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমার মেয়ে যেন একসাথে স্বামী ও সন্তান হারানোর বোঝা বইতে না হয়। দয়া করে আমাদের জন্য প্রার্থনা করুন।”
সদ্য চাকরিপ্রাপ্ত এক যুবকের শিরশ্ছেদ
আরেকটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে হামেদান শহরে। এক নার্স শিফট শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। বাসার গ্যারেজের দরজা খোলার অপেক্ষার সময় পার্ক করা একটি গাড়ির ছাদে তিনি একটি ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে পান: একজন মানুষের কর্তিত মাথা। গাড়ির ছাদের ছোট সাইরেন দেখে বোঝা যায়, এটি একজন নিরাপত্তাকর্মীর গাড়ি। পরে শনাক্ত করা হয়, এটি এক ২১ বছর বয়সী নবনিযুক্ত পুলিশ অফিসারের মাথা, যার দেহ পাওয়া গেছে একটি ড্রেনের পাশে।
এ ঘটনায় গ্রেপ্তার এক হামলাকারী স্বীকার করে যে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এই ভয়াবহ ‘নিদর্শন’ রেখে গেছে যাতে সবার মনে আতঙ্ক থাকে। সে জানায়, তাদের একটি দল গড়ে তোলা হয়েছে জার্মানিতে বসবাসরত এক মোসাদ এজেন্টের পৃষ্ঠপোষকতায়, যিনি ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে তাদের অর্থ দিতেন। ভবন পোড়ানো থেকে শুরু করে হত্যা—প্রতিটি সহিংস কাজের জন্য আলাদা পারিশ্রমিক দেওয়া হতো। হত্যার জন্য সর্বোচ্চ টাকা দেওয়া হতো।
সে জানায়, তার দল স্থানীয় এক সুপারমার্কেটের বয়স্ক মালিককেও হত্যা করেছিল, কারণ তিনি দোকান বন্ধ করতে অস্বীকার করেছিলেন।
“সে আমাদের গালি দিতে শুরু করে। আমরা তাকে রাস্তায় টেনে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলি। তারপর নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাকে কয়েকবার গুলি করি।”
মানুষ হত্যা কীভাবে এত সহজ হয়ে গেল—জানতে চাইলে সে বলে, “জার্মানিতে আমাদের হ্যান্ডলার নিশ্চিত করত যে আমরা বাইরে যাওয়ার আগে যেন গাঁজা বা মেথামফেটামিন সেবন করি; এটি একটি কঠোর নিয়ম ছিল।”
নিরপরাধ শিশুদের স্বপ্ন রাস্তায় শেষ
৮-৯ জানুয়ারির সহিংসতার শিকার হয়েছে অনেক নিরপরাধ শিশু। ইস্ফাহানে একটি বাজার থেকে ফেরার পথে গাড়িতে বসে থাকা অবস্থায় ৮ বছর বয়সী এক মেয়ের বুকে লাগে গুলি। কেরমানশাহে, ৩ বছর বয়সী মেলিনা তার বাবাকে সঙ্গে নিয়ে ছোট ভাইয়ের জন্য দুধের ফর্মুলা কিনতে ফার্মেসিতে যাচ্ছিল। পথেই একটি গুলি এসে লাগে তার দেহে। নিশাপুরে, এক ২ বছর বয়সী মেয়ে তার কিশোর ভাইয়ের সাথে গলির প্রবেশপথে আবর্জনা ফেলতে যাওয়ার সময় একটি মলোটভ ককটেলের আঘাতে নিহত হয়। এই শিশুরা, যারা তাদের সাধারণ জীবনযাপন ছাড়া কিছুই করেনি, ইরানের বাইরের শক্তির নির্দেশে পরিচালিত এক নৃশংস সংঘাতের বেদনাদায়ক প্রতীকে পরিণত হয়।
পরিবারগুলোর আকুতি ও প্রশ্ন
৮ ও ৯ জানুয়ারি রাতের দাঙ্গায় হতাহতের পরিবারগুলো কেবল হামলাকারীদের বিচার চাইছেন না। তারা চাইছেন সেইসব শক্তিরও বিচার, যারা এই সহিংসতার পেছনে আছে বলে তারা বিশ্বাস করেন।
মেলিনার বাবা, কন্যার লাশ কোলেই নিয়ে বলেন, “এই সন্ত্রাসীদের হাত পেছনে কারা আছে? যারা বিদেশ থেকে টাকা দিচ্ছে, উসকানি দিচ্ছে, আমাদের দেশে এই আগুন লাগাচ্ছে— তাদেরও বিচার চাই। তারা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আমাদের সাধারণ মানুষকে ক্ষুধার্ত রেখেছে, আবার আমাদের সন্তানদের জীবনও নিচ্ছে।”
এই গল্পগুলো কেবল সংখ্যা নয়। এগুলো কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয়। এগুলো একেকটি পরিবারের ভেঙে পড়া, একেকটি জীবনের নির্মম পরিণতি। আর এই ট্র্যাজেডির মাঝে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকে যায়—যখন বিপদে পড়ে সাধারণ মানুষ, তখন আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা কি তাদের জীবন সহজ করে, নাকি আরও অসহনীয় করে তোলে?