নরসিংদীতে এক কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনায় সালিশ-মীমাংসার চেষ্টায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। একইসঙ্গে কেন এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনটি।
মহিলা পরিষদের নেতারা বলেছেন, দেশের প্রচলিত আইনে ধর্ষণের মতো ফৌজদারি অপরাধে সালিশ বেআইনি, তবুও এ ধরনের উদ্যোগ কেন নেওয়া হচ্ছে, তার জবাব সংশ্লিষ্টদের দিতে হবে।
সোমবার (২ মার্চ) জাতীয় প্রেসক্লাব-এর সামনে দেশব্যাপী নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান ধর্ষণ, হত্যা ও সহিংসতার প্রতিবাদে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আয়োজিত সমাবেশে এ কথা বলা হয়।
সমাবেশে বক্তারা সম্প্রতি নরসিংদীর মাধবদীর দড়িকান্দিতে এক কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। নিহত কিশোরী একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। তার বাবার অভিযোগ, কিছুদিন আগে ছয় যুবক তাকে অপহরণ করে ধর্ষণ করে। বিষয়টি স্থানীয় বিএনপি নেতা ও সাবেক মেম্বার আহম্মদ আলীকে জানানো হলে তিনি সালিশের নামে অভিযুক্তদের সঙ্গে সমঝোতা করে মোটা অঙ্কের টাকা নেন এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে গ্রাম ছাড়ার জন্য চাপ দেন।এর কয়েক দিন পর কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, বাংলাদেশের আইনে ধর্ষণের মতো অপরাধের বিচার কেবল আদালতের মাধ্যমে হতে পারে, কোনোভাবেই সালিশের মাধ্যমে নয়। তাহলে এ ঘটনায় কেন সালিশ হলো?
তিনি সদ্য নির্বাচিত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ছয় মাসের কর্মপরিকল্পনার আওতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে টাস্কফোর্স গঠন করে নারী ও কন্যার প্রতি সহিংসতা রোধে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি’ গ্রহণ করতে হবে।
পাশাপাশি আসন্ন সংসদ অধিবেশনেও বিষয়টি গুরুত্বসহকারে আলোচনার দাবি জানান তিনি।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, প্রতিদিন সংবাদপত্রে বিভিন্ন বয়সী নারী ও কন্যার নির্মম পরিণতির খবর দেখে তারা ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত।
তার মতে, আইন প্রণয়ন ও সংশোধন হলেও সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া এখনও গড়ে ওঠেনি। তিনি এর পেছনে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চর্চায় নারীর প্রতি মর্যাদার ঘাটতিকে দায়ী করেন।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম ও অ্যাডভোকেট মাসুদা রেহানা, আন্দোলন সম্পাদক রাবেয়া খাতুন শান্তি, লিগ্যাল এইড সম্পাদক রেখা সাহা এবং লিগ্যাল অ্যাডভোকেসি ও লবি পরিচালক অ্যাডভোকেট দীপ্তি শিকদার।
বক্তারা জানান, গত ফেব্রুয়ারি মাসে অন্তত ১৮৩ জন নারী ও কন্যা বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে।
তাদের মতে, ধারাবাহিক ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে বিচারহীনতা সমাজকে ভয়াবহ অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব ন্যায়বিচারের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলার আহ্বান জানান বক্তারা।