সম্প্রতি বাংলাদেশে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে হামের প্রকোপ। শিশুদের ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ হামের টিকা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও, তার আগেই অনেক শিশু এই অতি সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১৯ হাজার ১৬১ জন। একই সময়ে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা দুই হাজার ৯৭৩ জন।
এই সময়ে সন্দেহজনক হাম রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১২ হাজার ৩১৮ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড় পেয়েছে নয় হাজার ৭৭২ জন।নিশ্চিত হামে ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং সন্দেহজনক হামে মৃত্যু হয়েছে ১৬৬ জনের।
হাম মূলত ‘মিজেলস’ নামের এক অতিসংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ।হাঁচি, কাশি ও কথা বলার মাধ্যমে বাতাসে ভাইরাসটি ছড়ায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। ভাইরাসটি প্রায় ২ ঘণ্টা বাতাসে সক্রিয় থাকতে পারে। শরীরে ফুসকুড়ি ওঠার ৪ দিন আগে থেকে ৪ দিন পর পর্যন্ত সংক্রমণ ঘটাতে পারে। একজন আক্রান্ত শিশুর মাধ্যমে ১৬ থেকে ১৮ জন কিংবা তার চেয়েও বেশি শিশু আক্রান্ত হতে পারে।
সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণ
নিয়মিত হামের টিকা দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশে প্রতি চার বছর অন্তর হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়। তবে ২০২০ সালের করোনা মহামারি, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ এবং চলতি বছরের শুরুতে নতুন সরকারের নির্বাচন—এসব কারণে টিকাদান কার্যক্রম সময়মতো সম্পন্ন হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানে ব্যত্যয়ই হামের প্রকোপ বৃদ্ধির প্রধান কারণ। শিশুদের টিকাদানের কভারেজ কমে যাওয়ায় দেশে যে হার্ড ইমিউনিটি (দলগত প্রতিরোধ) তৈরি হয়েছিল, তা ভেঙে পড়ে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
এক বছরের বেশি সময় ধরে শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন বন্ধ রয়েছে। বছরে দুবার হওয়ার কথা থাকলেও গত দুই বছরে এটি মাত্র দুবার হয়েছে। ভিটামিন ‘এ’ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এ ছাড়া অপুষ্টিও একটি বড় কারণ। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তারা সহজেই সংক্রমিত হয়। বর্তমানে আক্রান্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু অপুষ্টির শিকার বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, করোনার সময় মাঠপর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়। অনেক শিশু সময়মতো টিকা পায়নি। পরবর্তীতে গণটিকাদান কার্যক্রমও বন্ধ থাকায় টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকে, যা চলতি বছরে হামের বিস্তার ঘটিয়েছে। শিশুরা টিকা না পাওয়ায় এটি মহামারি আকার ধারণ করেছে। কোনো সংক্রমণ অতিরিক্ত হয়ে গেলে ভাইরাসটি তখন আরও মারাত্মক হয়ে ওঠে।
টিকার বয়সের আগে আক্রান্তের কারণ
বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশ অনুযায়ী শিশুদের ৯ মাসে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ হামের টিকা দেওয়া হয়। সংস্থাটির তথ্যমতে, বাংলাদেশে বর্তমানে হামে আক্রান্ত শিশুদের ৬৯ শতাংশের বয়স ২ বছরের নিচে এবং ৩৪ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম।
যেসব শিশুর মায়েরা হামের টিকা নিয়েছেন, সেই শিশুরা জন্মের পর মায়ের কাছ থেকেই হামের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা পায়। এসব শিশুর সাধারণত ছয় মাস পর্যন্ত ভালো প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে। এরপর ধীরে ধীরে এই প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে এবং ১২ মাসের পর তা প্রায় শেষ হয়ে যায়।
টিকা দেওয়ার বয়সের আগেই শিশুদের হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাবিয়ে তুলছে। স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আগে যখন টিকার কভারেজ বেশি ছিল, তখন দেশে হামের বিরুদ্ধে শক্তিশালী হার্ড ইমিউনিটি গড়ে উঠেছিল। তখন হাম সহজে কোনো শিশুকে আক্রান্ত করতে পারত না।
কোনো শিশু অপেক্ষাকৃত দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন হলেও দলগত সুরক্ষার কারণে সে আক্রান্ত হতো না, কিংবা আক্রান্ত হলেও খুব বেশি গুরুতর পর্যায়ে যেত না। বর্তমানে দলগত সুরক্ষা না থাকায় শিশুরা সহজেই আক্রান্ত হচ্ছে। পাশাপাশি দলগত সুরক্ষা কমে যাওয়ায় ভাইরাসটিও আগের তুলনায় বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
টিকা নেওয়ার বয়সের আগে আক্রান্ত হওয়ার কারণ জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, এখন যেসব মায়েরা সন্তান জন্ম দিচ্ছেন, তাদের প্রায় সবাই নিজেরা হামের টিকা নিয়েছেন। ফলে তাদের শরীরে হামের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে, যা সন্তানের শরীরেও আংশিকভাবে সঞ্চারিত হয়। এসব শিশুর জন্মের পর ছয় থেকে ১২ মাস পর্যন্ত এই প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে। তবে প্রথম ছয় মাস এটি বেশি কার্যকর থাকে, এরপর ধীরে ধীরে কমে যায় এবং ১২ মাসের পর প্রায় থাকে না। এ কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ছয় থেকে ১২ মাসের মাঝামাঝি, অর্থাৎ নয় মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেয়।
তিনি আরও বলেন, আগে দেশে যখন হামের বিরুদ্ধে হার্ড ইমিউনিটি ছিল, অর্থাৎ প্রায় ৯৮ শতাংশ শিশু টিকা পেত, তখন ছয় মাস বয়সে কোনো শিশুর প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলেও সে আক্রান্ত হতো না, কারণ সে দলগত সুরক্ষার আওতায় থাকত।
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, এখন হামের বিরুদ্ধে হার্ড ইমিউনিটি ভেঙে পড়ায় যেসব শিশুর প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, তারা সহজেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এটাই নয় মাসের কম বয়সী শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়ার প্রধান কারণ।
শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর গুরুত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভিটামিন ‘এ’ শরীরের বাইরের ও ভেতরের আবরণী কোষগুলোকে সুরক্ষা দেয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, হামের ভাইরাস শরীরের বাইরের ও ভেতরের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতে ফুসফুসের আবরণ নষ্ট হয়ে নিউমোনিয়া হতে পারে। মস্তিষ্কের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রদাহও বাড়তে পারে। শরীরে ভিটামিন ‘এ’ পর্যাপ্ত থাকলে এসব জটিলতার ঝুঁকি কমে যায়। এ কারণেই হামের টিকার সঙ্গে ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানো হয়। দীর্ঘদিন ভিটামিন ‘এ’ না পাওয়ায় অনেক শিশুর শরীরে এর ঘাটতি রয়েছে, ফলে তারা হামে আক্রান্ত হলে জটিলতার ঝুঁকি বেশি থাকে।