ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য বাড়ানো এবং আমদানি প্রক্রিয়ায় নীতিগত স্বচ্ছতা আনতে ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬–২০২৯’ জারি করেছে সরকার। একই সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে পণ্যের উৎপত্তি, মান, সনদ, পরিদর্শন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির শর্ত পালনের বিষয়গুলোকে আরও কাঠামোবদ্ধ করা হয়েছে।
গত সোমবার (২৪ আগস্ট) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জারি করা গেজেটে নতুন আমদানি নীতি প্রকাশ করা হয়। আমদানি ও রপ্তানি (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ১৯৫০-এর ৩(১) ধারার ক্ষমতাবলে প্রণীত এ আদেশ ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
নতুন নীতিতে আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা কাজে লাগানো, পণ্যের মান নিশ্চিত করা এবং ব্যবসায়ীদের জন্য নিয়ম-কানুন আরও স্পষ্ট করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে আমদানি-রপ্তানি খাতে ব্যবসার ধরন ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আসতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ
নতুন আমদানি নীতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে মোটরসাইকেল আমদানির ক্ষেত্রে সিসি (সিলিন্ডার ক্যাপাসিটি) সীমা বাড়ানো। এখন সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় সর্বোচ্চ ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানি করা যাবে।আগের ২০২১–২০২৪ সালের আমদানি নীতি অনুযায়ী সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেল আমদানিতে বিধিনিষেধ ছিল। নতুন নীতিতে সেই সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।
মূল্যসীমা ছাড়াই চুক্তির মাধ্যমে আমদানি
ব্যবসা সহজ করতে আরেকটি বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে পণ্য আমদানির পদ্ধতিতে। নতুন নীতি অনুযায়ী, ঋণপত্র বা এলসি খোলার পাশাপাশি কোনো মূল্যসীমা ছাড়াই ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে পণ্য আমদানি করতে পারবেন শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আমদানিকারকেরা।
আগের নীতিতেও এলসি ছাড়া ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে আমদানির সুযোগ ছিল। তবে বিভিন্ন পণ্য ও খাতের ক্ষেত্রে সীমা ও শর্ত প্রযোজ্য ছিল। নতুন আদেশে এ সুযোগ আরও বিস্তৃত করা হয়েছে।
নীতিতে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল ও সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউস প্রতিষ্ঠার বিধানও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের শিল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমদানি সুবিধা এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ সম্প্রসারণের কথাও বলা হয়েছে।
উৎপত্তি সনদের গুরুত্ব বাড়ছে
নতুন কাঠামোয় পণ্যের উৎপত্তির দেশ ও উৎপত্তি সনদকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কোনো পণ্য কোন দেশে উৎপাদিত বা প্রক্রিয়াজাত হয়েছে, তা নির্ধারণের জন্য এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে এক দেশে উৎপাদিত হয়ে অন্য দেশে প্রক্রিয়াজাত, সংযোজিত বা পুনঃরপ্তানি হওয়া পণ্যের ক্ষেত্রে প্রকৃত উৎপত্তি নির্ধারণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। নতুন বিধানে এসব বিষয় আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হয়েছে।
এর ফলে রপ্তানিকারকদের পণ্যের উৎপত্তি প্রমাণের প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংরক্ষণ এবং সঠিক তথ্য দেওয়ার বিষয়ে আরও সতর্ক হতে হবে। একইভাবে আমদানিকারকদেরও বিদেশি সরবরাহকারীর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় উৎপত্তি সনদ সংগ্রহ করতে হবে।
মান যাচাই ও পরিদর্শনে বাড়তি গুরুত্ব
আমদানি করা পণ্যের মান ও নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন নিয়েও নতুন বিধানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের স্পেসিফিকেশন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষণ ও পরিদর্শনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পণ্যের মান নির্ধারণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পাশাপাশি টেকনিক্যাল ব্যারিয়ার্স টু ট্রেড (টিবিটি), Codex Alimentarius এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর সংশ্লিষ্টতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে আমদানিকারকদের পণ্য দেশে আনার আগে নির্ধারিত মান, পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও সংশ্লিষ্ট সনদের বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। বিশেষ করে খাদ্য, ভোগ্যপণ্য ও মাননিয়ন্ত্রিত পণ্যের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশি পড়তে পারে।
বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা পেতে মানতে হবে শর্ত
নতুন নীতিতে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তির বিষয়টিও আমদানি-রপ্তানি কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সিইপিএ), ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (ইপিএ), প্রেফারেনশিয়াল ট্রেড এগ্রিমেন্ট (পিটিএ) এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তির (আরটিএ) মতো ব্যবস্থার উল্লেখ রয়েছে।
কোনো দেশের সঙ্গে বিশেষ বাণিজ্য সুবিধার আওতায় পণ্য আমদানি বা রপ্তানি করা হলে শুধু চুক্তির সুবিধা নেওয়াই যথেষ্ট হবে না। ওই সুবিধা পাওয়ার জন্য নির্ধারিত শর্ত, পণ্যের উৎপত্তির নিয়ম এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।
ব্যবসায়ীদের নথিপত্রে বাড়তি নজর
নতুন বিধানের বিভিন্ন অংশে আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, ক্রেতা, পণ্যের স্পেসিফিকেশন এবং বাণিজ্যিক তথ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সংগঠন ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে।
ফলে আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায়ীদের তথ্য সংরক্ষণ, সঠিক কাগজপত্র প্রস্তুত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়ার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
শিল্প ও বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাবের আশা
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি আমদানি নীতি শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি আমদানি সহজ করতে পারে। এতে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শিল্প সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সুযোগ রয়েছে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা কাজে লাগানো এবং মানসম্পন্ন পণ্য আমদানির সুযোগ বাড়লে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অংশগ্রহণও বাড়তে পারে।
তবে নতুন নিয়মে উৎপত্তি সনদ, মান যাচাই, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নথিপত্রের ওপর গুরুত্ব বাড়ায় ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতিও বাড়াতে হবে। এসব প্রক্রিয়া যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হলে কিছু ক্ষেত্রে ব্যবসার সময় ও ব্যয় বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বদলাচ্ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বাস্তবতা
বিশ্ববাণিজ্যে এখন শুধু পণ্যের দাম ও সরবরাহ সক্ষমতা নয়; পণ্যের উৎস, মান, ট্রেসেবিলিটি, সনদ এবং বাণিজ্য চুক্তির শর্ত ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের নতুন আমদানি নীতিতেও সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
ফলে ব্যবসায়ীদের জন্য ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ শুধু দ্রুত পণ্য আমদানি বা রপ্তানি করা নয়; প্রতিটি চালানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য, পণ্যের মান, উৎপত্তি এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সঠিকভাবে নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।