ইসরায়েলের লেবানন যুদ্ধ: ‘দাহিয়েহ ডকট্রিন’ কী?

ইসরায়েলের লেবানন যুদ্ধ: ‘দাহিয়েহ ডকট্রিন’ কী?

ইসরায়েল লেবাননে তাদের যুদ্ধ ব্যাপকভাবে জোরদার করেছে, যেখানে দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং দশ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। বিমান হামলায় বেসামরিক অবকাঠামো বাড়িঘর, মসজিদ, হাসপাতাল এবং দক্ষিণ লেবাননের লিতানি নদীর গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ পথগুলো ধ্বংস হয়েছে।

‘দাহিয়েহ’ নামে পরিচিত বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল ব্যাপকভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই আবাসিক এলাকাতেই প্রায় দুই দশক আগে ইসরায়েলি বাহিনী প্রথম ‘দাহিয়েহ ডকট্রিন’ প্রয়োগ করে।

এরপর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী নিয়মিত ও পদ্ধতিগতভাবে এই কৌশল ব্যবহার করেছে, বিশেষ করে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় চালানো হামলায়। গাজায় এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।

বর্তমান যুদ্ধের শুরুতে ৫ মার্চ ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘খুব শিগগিরই দাহিয়েহ গাজার খান ইউনিসের মতো হয়ে যাবে।’

মিডল ইস্ট আই এই বিতর্কিত ইসরায়েলি সামরিক কৌশলটি বিশ্লেষণ করেছে।

দাহিয়েহ ডকট্রিনের উৎপত্তি কোথায়?
দাহিয়েহ ডকট্রিন এমন একটি কৌশল, যেখানে কোনো এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতির অভিযোগ থাকলে সেখানে বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করা হয়।

এর উদ্দেশ্য হলো বেসামরিক জনগণের মধ্যে কষ্ট ও অসন্তোষ সৃষ্টি করে সেই সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা; হোক সেটা লেবাননে হিজবুল্লাহ কিংবা গাজায় হামাস এবং ভবিষ্যতে ইসরায়েলের ওপর হামলা নিরুৎসাহিত করা।

বৈরুতের দক্ষিণে অবস্থিত দাহিয়েহ একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, যেখানে অধিকাংশ বাসিন্দা শিয়া মুসলিম। অন্যান্য লেবাননিও সেখানে বসবাস করেন। এই এলাকায় হিজবুল্লাহর অনেক সমর্থক, ভোটার এবং সদস্য রয়েছে।

কিছু বিশ্লেষক, যেমন মার্কিন অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান মনে করেন, এই কৌশলটি ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাক আক্রমণের সময় ব্যবহৃত ‘shock and awe’ কৌশল থেকে অনুপ্রাণিত।

১৯৯৬ সালে সামরিক লেখক হারলান কে উলম্যান এবং জেমস পি ওয়েড এই ধারণাটি দেন, যেখানে ব্যাপক শক্তি প্রদর্শন ও আঘাতের মাধ্যমে শত্রু ও বেসামরিক জনগণকে স্তম্ভিত ও ভীত করে ফেলা হয়।

এই কৌশল অনুযায়ী শত্রু অঞ্চলের ‘যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিবহন, খাদ্য উৎপাদন, পানি সরবরাহ এবং অন্যান্য অবকাঠামো’ বিঘ্নিত করা হয়।

ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রারম্ভিক আক্রমণে ৬৭০০-এর বেশি ইরাকি বেসামরিক নাগরিক নিহত হন, আর পরবর্তী সংঘাতে মোট নিহতের সংখ্যা অন্তত দুই লাখ বলে ধারণা করা হয়।

Iraq
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে ব্যাপক বিমান হামলার সময় প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ কমপ্লেক্স ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে | ২১ মার্চ ২০০৩।


উলম্যান ও ওয়েড উল্লেখিত ‘শক অ্যান্ড অ্য’ কৌশলের আরও ঐতিহাসিক উদাহরণ হলো ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা হামলা এবং ১৯৯৪ সালে প্রথম চেচেন যুদ্ধে রাশিয়ার গ্রোজনি আক্রমণ।

দাহিয়েহ ডকট্রিনের ভাষ্য কী?
এই কৌশলের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রকাশ্য নথি নেই। বরং ২০০৬ সালে লেবানন যুদ্ধে ইসরায়েলের পর এটি প্রথম বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা।

সেই সময় হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি সেনাদের অপহরণের পর ইসরায়েল দাবি করে, তারা লেবাননে ব্যাপক হামলা চালানোর অধিকার রাখে।

হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযানের নেতৃত্বদানকারী ইসরায়েলি জেনারেল উদি আদাম ২০০৬ সালের জুলাইয়ে বলেন: ‘কোথায় আঘাত করা হবে? একবার লেবাননের ভেতরে ঢুকলে সবকিছুই বৈধ; শুধু দক্ষিণ লেবানন নয়, শুধু হিজবুল্লাহর অবস্থানও নয়।’

৩৩ দিনের সেই যুদ্ধে ইসরায়েল ১২০০-এর বেশি মানুষকে হত্যা করে এবং ৪৪০০-এর বেশি মানুষকে আহত করে। সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয় দাহিয়েহ এলাকায়, যেখানে ইসরায়েলি বোমা হামলায় ১৫ হাজারের বেশি বাড়ি ধ্বংস হয়।

জেনারেল গাদি আইজেনকোট ওই অভিযানে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অপারেশন প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ (২০১৫–২০১৯) এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী (২০২৩–২০২৪) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আইজেনকোট ২০০৮ সালের অক্টোবরে বলেন: ‘বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় যা ঘটেছে, ইসরায়েলের দিকে যেখান থেকেই গুলি ছোড়া হবে, প্রতিটি গ্রামেই তা ঘটবে।

তিনি বলেন, ইসরায়েলের দিকে যেখান থেকে গুলি ছোড়া হবে, প্রতিটি গ্রামের বিরুদ্ধে আমরা অসামঞ্জস্যপূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করব এবং ব্যাপক ধ্বংস ডেকে আনব। আমাদের দৃষ্টিতে এগুলো সামরিক ঘাঁটি। এটি কোনো প্রস্তাব নয়, এটি ইতোমধ্যেই অনুমোদিত একটি পরিকল্পনা।’

Lebanon
ইসরায়েলি বিমান হামলার পর দক্ষিণ বৈরুতের একটি আবাসিক এলাকায় ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক লেবাননি নারী | ২৪ জুলাই, ২০০৬।  


একই সপ্তাহে তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ইসরায়েলি কর্নেল গ্যাব্রিয়েল সিবোনি বলেন, ‘শত্রুতার সূচনায় ইসরায়েলি বাহিনীকে দ্রুত, দৃঢ়ভাবে এবং শত্রুর পদক্ষেপের তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ শক্তি দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে। এই ধরনের প্রতিক্রিয়ার লক্ষ্য হবে এমন মাত্রার ক্ষতি ও শাস্তি দেওয়া, যাতে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়।’

প্রতিবেদনটি আরও বলে, ‘ইসরায়েলকে এমনভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে, যাতে পরিষ্কারভাবে বোঝানো যায় বর্তমান সীমান্ত পরিস্থিতি ব্যাহত করার কোনো প্রচেষ্টা ইসরায়েল মেনে নেবে না।’

আর কোথায় এই কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে?
ইসরায়েল ১৯৬৭ সাল থেকে দখল করে রাখা ফিলিস্তিনি অঞ্চলে বারবার বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছে।

গাজায় মানবিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি ইসরায়েল প্রায় ৮০ শতাংশ ভবন ধ্বংস করেছে বলে জাতিসংঘ স্যাটেলাইট সেন্টার জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং বাজার।

২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর অভিযানের মাত্র তিন দিন পর ইসরায়েলি সামরিক মুখপাত্র ড্যানিয়েল হাগারি বলেন, ‘নির্ভুলতা ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রার মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করলেও, এই মুহূর্তে আমাদের লক্ষ্য সর্বোচ্চ ক্ষতি সাধন করা।’

চলমান যুদ্ধ বিস্তৃত হওয়ার পর ইসরায়েল আবারও দাহিয়েহ এলাকায় হামলা চালায়। গাজায় আগের যুদ্ধগুলোতেও ইসরায়েল বেসামরিক জনগণ ও অবকাঠামোকে ব্যাপকভাবে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।

২০০৮-২০০৯ সালের অভিযানে ইসরায়েল ১৪০০-এর বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে, চার হাজারের বেশি বাড়ি ধ্বংস করে এবং বেসামরিক এলাকায় সাদা ফসফরাস ব্যবহার করে, যা মারাত্মক দগ্ধতা সৃষ্টি করতে পারে। ওই সংঘাতে ১৩ জন ইসরায়েলি নিহত হয়।

২০১৪ সালেও ইসরায়েল গাজায় হামলা চালায়, যেখানে ২০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়, যাদের দুই-তৃতীয়াংশই বেসামরিক নাগরিক। এর মধ্যে ৫০০-এর বেশি শিশু এবং প্রায় ৩০০ নারী ছিলেন।

এই কৌশল কি আন্তর্জাতিক আইনে বৈধ?
বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক চুক্তিগুলোর অধীনে স্পষ্টভাবে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে নিষিদ্ধ।

জেনেভা কনভেনশনের চতুর্থ কনভেনশনের ৪৮ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: ‘সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলো সবসময় বেসামরিক জনগণ ও যোদ্ধাদের মধ্যে পার্থক্য করবে।’

৫১ নম্বর অনুচ্ছেদে এমন হামলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা ‘বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, আহত হওয়া বা বেসামরিক স্থাপনার ক্ষতি ঘটাতে পারে এবং যা প্রত্যাশিত সামরিক লাভের তুলনায় অতিরিক্ত।’

রোম সংবিধিও গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও আগ্রাসনের মতো অপরাধ সংজ্ঞায়িত করে এবং বেসামরিকদের ওপর হামলা নিষিদ্ধ করে।

এতে বলা হয়েছে, ‘এমন হামলা চালানো যাবে না, যেখানে আগে থেকেই জানা থাকে যে এতে বেসামরিক প্রাণহানি বা অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হবে এবং যা সামরিক লাভের তুলনায় অতিরিক্ত।’

গাজায় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
জাতিসংঘের গোল্ডস্টোন রিপোর্টে দাহিয়েহ ডকট্রিনকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়, গাজায় ইসরায়েলের কৌশল ছিল ‘বেসামরিক জনগণকে শাস্তি দেওয়া, অপমান করা এবং আতঙ্কিত করা।’

এতে আরও বলা হয়: ‘গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর ব্যবহৃত কৌশলগুলো আগের চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, বিশেষ করে ২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধের সময়। তখন ‘দাহিয়েহ ডকট্রিন’ নামে একটি ধারণা তৈরি হয়, যেখানে অসামঞ্জস্যপূর্ণ শক্তি প্রয়োগ, বেসামরিক অবকাঠামোর ব্যাপক ধ্বংস এবং বেসামরিক জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টি করা হয়। মিশনটি তাদের নিজস্ব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, যে কৌশলকে সবচেয়ে কার্যকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল, বাস্তবে সেটিই প্রয়োগ করা হয়েছে।’

এই কৌশলটি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকেও সমালোচনার মুখে পড়েছে, যার মধ্যে রয়েছেন ফিলিস্তিনি মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের সাবেক বিশেষ প্রতিবেদক রিচার্ড ফক।

তিনি ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে লেখেন, ‘আইজেনকোটের পক্ষ থেকে দাহিয়েহ ডকট্রিনকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার সামান্যতম চেষ্টাও দেখা যায়নি, যেখানে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শক্তি প্রয়োগে সামঞ্জস্য বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।’

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS