দুটি পর্বতমালা, দুটি মরুভূমি, দুটি সাগর: ইরানের ভূগোলই তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র

দুটি পর্বতমালা, দুটি মরুভূমি, দুটি সাগর: ইরানের ভূগোলই তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র

ইরানে সম্ভাব্য স্থল আক্রমণের আগে শত শত মার্কিন সেনা যখন পরিবহন বিমানে করে উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন তারা হয়তো জানালার বাইরে নিচের ভূপ্রকৃতির দিকে একবার তাকাতে পারে।

বাঁকানো সমুদ্র, যেখানে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য দ্বীপ; শত শত কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলরেখা, যার পাশে খাড়া পাথুরে দেয়াল; আর এমন সব পর্বত, যা যে কোনো অনুপ্রবেশকারীর ওপর আধিপত্য বিস্তার করে।

এমন ভূগোল থাকলে সামরিক ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা কেন বলছেন যে স্থল অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে, তা সহজেই বোঝা যায়।

ইরান একটি বিশাল দেশ।এর দুটি দীর্ঘ পর্বতমালা রয়েছে; উত্তরে কাস্পিয়ান সাগর এবং দক্ষিণে ওমান সাগর ও উপসাগর।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, একবার স্থলযুদ্ধ শুরু হলে এর গতিপথ ও স্থায়িত্ব পূর্বানুমান করা কঠিন হয়ে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল অ্যান্ড ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইনস্টিটিউটের গবেষক আরমান মাহমুদিয়ান বলেন, ‘ইতিহাসে দেখা যায়, স্থল আক্রমণ শুরু হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন হয়ে যায়।’

ইরানি বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থলযুদ্ধ শুরু হলে তিনটি প্রধান সম্ভাব্য দৃশ্যপট দেখা দিতে পারে: উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীর দ্বীপ দখল, ইরানের দক্ষিণ উপকূলে আক্রমণ অথবা পশ্চিমাঞ্চলের কুর্দি অধ্যুষিত এলাকা দিয়ে আগ্রাসন।প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে গুরুতর ঝুঁকি ও জটিলতা।

হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণ ও দ্বীপ দখল
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার চেয়েও বেশি চাপ সৃষ্টি করেছে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়া।

যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল, বিশ্বব্যাপী ব্যবহারের প্রায় পাঁচভাগের একভাগ এই প্রণালী দিয়ে যেত।

কিন্তু সংঘাত শুরু হওয়ার পর ইরান এই জলপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং কার্যত পথটি বন্ধ করে দিয়েছে, কেবল ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ কিছু দেশের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে।

Geography


কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপদে চলাচলের জন্য কিছু জাহাজের কাছ থেকে ইরান ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত আদায় করেছে।

এই প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক তেল-গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরি করেছে পথটি পুনরায় খুলে দিতে।

এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র খারগ দ্বীপে হামলা চালিয়েছে, যা ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই দ্বীপ দখল করলে তেমন লাভ হবে না, বরং উল্টো ফলও হতে পারে।

মাহমুদিয়ান বলেন, ‘ইরান হয়তো দ্বীপে লড়াইই করবে না। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে দ্বীপ দখল করতে দেবে, তারপর সেখানেই তাদের লক্ষ্যবস্তু বানাবে।’

একই সমস্যা কেশম, হরমুজ ও লারাক দ্বীপেও দেখা যাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব দ্বীপ দখল করলে তেলের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে নতুন সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।

দক্ষিণ উপকূলে আক্রমণ
ইরানের দক্ষিণ উপকূল ইরাক সীমান্তের কাছ থেকে শুরু হয়ে পাকিস্তান সীমান্ত পর্যন্ত ১৮০০ কিলোমিটারের বেশি বিস্তৃত।

এত দীর্ঘ উপকূল প্রতিরক্ষা করা কঠিন হলেও আক্রমণকারী বাহিনীর জন্যও এটি সমান চ্যালেঞ্জ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি স্থল অভিযান চালায়, তাহলে হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণে নিতে এই উপকূল গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হতে পারে। তবে এমন অভিযান দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে।

Geography


মাহমুদিয়ান বলেন, ‘আপনি উপকূল দখল করতে পারেন, কিন্তু আপনার বাহিনী সবসময় আক্রমণের মুখে থাকবে। তাদের সুরক্ষায় আরও ভেতরে অগ্রসর হতে হবে, আর তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যাবে।’

ইরানের বিশাল আয়তন এখানে বড় ভূমিকা রাখবে। দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনা থেকে তারা হামলা চালিয়ে যেতে সক্ষম।

কুর্দি অঞ্চল দিয়ে আক্রমণ
আরেকটি সম্ভাব্য পথ হলো পশ্চিম দিক থেকে, জাগরোস পর্বতমালা ও কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চল দিয়ে আক্রমণ।

কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, ইরাকি কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে এতে ব্যবহার করা হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিকল্পনাও খুব কার্যকর হবে না।

মাহমুদিয়ান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত কুর্দি বাহিনীকে সামনে এগিয়ে দেবে, কারণ তারা ভূখণ্ড চেনে। কিন্তু এতে তাদের বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি থাকবে।’

আরও গভীরে প্রবেশ করলে পরিস্থিতি তাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

ইরানের ভূগোলের শক্তি
ইরানের আয়তন ১৪ লাখ বর্গকিলোমিটারের বেশি, যা বিশ্বে ১৭তম বৃহত্তম দেশ। এখানে দুটি বড় মরুভূমি রয়েছে—দাশত-এ কাভির ও লুত মরুভূমি।

২০০০ মিটারের বেশি উচ্চতার ৩৯০টির বেশি পর্বত রয়েছে, যার মধ্যে ৯২টি ৪০০০ মিটারেরও বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ দামাভান্দও এখানে অবস্থিত।

এই ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য স্থলযুদ্ধে ইরানের পক্ষে বড় সুবিধা এনে দেবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোও পাহাড়ের নিচে অবস্থিত, যা আক্রমণ করা কঠিন এবং প্রতিরক্ষা করা সহজ।

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল কী?
এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল এখনও পরিষ্কার নয়। যদি লক্ষ্য হয় শাসন পরিবর্তন, তবে ধারাবাহিক বিমান হামলা ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের হত্যার পরও ইরানের ক্ষমতা কাঠামো ভাঙেনি।

আর যদি লক্ষ্য হয় চাপ সৃষ্টি করে আলোচনায় বাধ্য করা, তাতেও এখন পর্যন্ত তেমন সাফল্য দেখা যায়নি। বরং এটি ইরানের নেতৃত্বকে আরও কঠোর ও অনমনীয় করে তুলতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন, যেকোনো দখলদারিত্ব ইরানি জাতীয়তাবাদকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে।

ইতিহাস বলছে, ইরান দখল অবস্থায় কখনও আলোচনায় বসে না।

মাহমুদিয়ান বলেন, ‘ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ও আমরা দেখেছি, নিজেদের ভূখণ্ড দখলে থাকলে ইরান কখনও আলোচনা বা শান্তিতে রাজি হয়নি।’

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সুস্পষ্ট বৃহৎ কৌশল নেই। ‘রেজিম পরিবর্তন’ শুরুতে লক্ষ্য হিসেবে বলা হলেও, তা দ্রুতই বাস্তবতা থেকে সরে গেছে।

একজন বিশেষজ্ঞের ভাষায়, ‘এটি কোনো কৌশল নয়, এটি শুধু একটি আশা।’

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS