ওয়ান-ইলেভেনের নেপথ্যে ছিল একটি ‘সমন্বিত কুচক্রী’। দেশকে বিরাজনীতিকরণে সশস্ত্র বাহিনীর কিছু অতিমাত্রার উচ্চাবিলাসী কর্মকর্তার পাশাপাশি বিশেষ ভূমিকা ছিল তৎকালীন প্রভাবশালী আমলা, পুলিশ কর্মকর্তা, অন্তত ১০ জন এনজিও এবং উন্নয়ন সংস্থার প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনীতিবিদসহ ঢাকার অন্তত পাঁচটি দেশের দূতাবাসের।
বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকাকালেই ওয়ান-ইলেভেনের প্লট তৈরি করা হলেও সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিরা ছিলেন ঘোর অন্ধকারে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে রিমান্ডে থাকা দুই লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, শেখ মামুন খালেদ এবং বরখাস্তকৃত লে. কর্নেল আবজাল নাছেরের জবানিতে উঠে এসেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে আমরা অনেক তথ্যই পাচ্ছি। তবে যাচাইবাছাই ছাড়া এগুলো নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। বর্তমানে আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলায় আসা অভিযোগ নিয়ে।
প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে সূত্র বলছে, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ওপর অতিমাত্রায় বিশ্বাসের কারণে কোনো তথ্যই পায়নি তৎকালীন বিএনপি সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিরা।তাদের অন্ধকারে রেখে একের পর এক সাজানো হয় ওয়ান-ইলেভেনের প্লট। সারা দেশে সিরিজ বোমা হামলা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাসহ সর্বশেষ ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে লগি-বৈঠার সমাবেশ।
পুলিশের তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (প্রশাসন) নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, এসবি প্রধান বাহারুল আলম, সিটি এসবির তৎকালীন এসপি গোলাম রসুল নিয়মিত ডিজিএফআই অফিসে যাতায়াত করতেন। পুলিশের এই ত্রিরত্ন বিএনপির সঙ্গে সখ্যতা ছিল এমন অফিসারদের চিহ্নিত করে ক্রমাগত ওএসডি এবং অগুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পোস্টিং করিয়েছেন।
সাবেক আমলাদের মধ্যে আলী ইমাম মজুমদার, আবদুল করিম, প্রয়াত সা’দত হোসেনসহ অন্তত ১০ জন প্রভাবশালী কর্মকর্তা ওয়ান-ইলেভেন প্রক্রিয়ার বিষয়টি অবগত ছিলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেছেন, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং মামুন খালেদকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদে শুরুতে বিব্রতবোধ করেছেন। তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এখন এগুলো যাচাইবাছাই করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ওয়ান-ইলেভেনকে টার্গেট করে অনেক আগেই সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়।রক্ষীবাহিনীর অফিসার হওয়ার পরও কেবলমাত্র প্রয়াত সাঈদ এস্কান্দারের ভায়রা হওয়ার জন্য সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা কাঠামোতে নিয়ে আসা হয়। ডিজিএফআইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যুরোর পরিচালক, কুমিল্লার জিওসি এবং সর্বশেষ নবম ডিভিশনের জিওসি করা হয়। তার পরামর্শেই সিনিয়র কর্মকর্তাদের পাশ কাটিয়ে মইন উ আহমেদকে সেনাপ্রধান করা হয়। তার সময় থেকেই ডিজিএফআইকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা হয়।
একটি রাজনৈতিক দলের সুপারিশে এটিএম আমিনকে ডিজিএফআইয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়। ক্রমাগত তিনি দুর্নীতির বরপুত্র হয়ে ওঠেন। মইন উ আহমেদের একান্ত ইচ্ছায় তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে হাত মিলিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় নিয়ে আসেন। তবে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী চেয়েছিলেন ‘মার্শাল ল’। বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যান মইন উ আহমেদ ও মাসুদ উদ্দিন। বিষয়টির সুরাহা করতে দুটি প্রভাবশালী দেশের দূতাবাসের দ্বারস্থ হন তারা। বিষয়টির সমন্বয় করেন এটিএম আমিন।
জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে সূত্র বলছে, ভয়ংকর বিতর্কিত ভূমিকা পালন করে বেসরকারি সংস্থা সুজন ও সিপিডি। ‘সুশাসন’ ইস্যুতে তাদের মাধ্যমে চালানো হয় ধারাবাহিক কর্মসূচি। সেমিনার, আলোচনা ও প্রচারণার মাধ্যমে একটি মতামতধারী গোষ্ঠী গড়ে তোলা হয়। বাদ ছিল না গণমাধ্যমও। বিশেষ করে দুটি মিডিয়া ওয়ান-ইলেভেনের নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সৌজন্যে: বাংলাদেশ প্রতিদিন