ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলার প্রথম ছয় দিনে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের খবরচ হয়েছে ১২.৭ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে সেই ব্যয় সম্ভবত ১৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং এখনো বেড়েই চলেছে। প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই বিপুল যুদ্ধব্যয় আসলে কোথায় যাচ্ছে?
এখন পর্যন্ত ইরানে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, আর পেন্টাগনের মতে যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহেই দেশটিতে ১৫ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের মিনাব শহরের একটি মেয়েদের স্কুল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালিত বলে ধারণা করা ওই হামলায় প্রায় ১৭৫ জন শিশু ও শিক্ষক নিহত হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের খরচ প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি ডলার করে বাড়ছে।
মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরুর এক সপ্তাহ পর পেন্টাগনের কর্মকর্তারা কংগ্রেস সদস্যদের একটি গোপন বৈঠকে জানান, প্রথম ছয় দিনেই যুদ্ধের খরচ ১১.৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
তবে এটাই পুরো চিত্র নয়। বৈঠকের তথ্য জানেন এমন সূত্রগুলো দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছে, এই হিসাব মূলত অস্ত্র ব্যয়ের মধ্যে সীমিত ছিল। এতে অঞ্চলে মোতায়েন বাহিনীর খরচ, চিকিৎসা ব্যয় বা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক বিমান প্রতিস্থাপনের খরচ অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
ছয় দিনের মাথায় সিএসআইএস মোট ব্যয় ১২.৭ বিলিয়ন ডলারের হিসাব নির্ধারণ করে।
বর্তমানে এই ব্যয় ১৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং যুদ্ধব্যয় বেড়েই চলেছে।
হোয়াইট হাউস নিজস্ব কোনো ব্যয়ের হিসাব দেয়নি। পেন্টাগন ও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) মন্তব্যের জন্য একে অপরের দিকে ইঙ্গিত করেছে।
যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অস্ত্রভাণ্ডারের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অস্ত্রগুলো ব্যবহার করে—দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং রাডার। এতে দ্রুত অস্ত্র মজুদ কমে যেতে থাকে।পরে তুলনামূলক কম দামের স্বল্পপাল্লার অস্ত্র ব্যবহার শুরু হলেও ততক্ষণে অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর চাপ পড়ে গেছে।
ব্যয়ের বিশদ চিত্র
২৮ ফেব্রুয়ারি রাত ১টা ১৫ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে। একই দিনে একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র শাজারাহ তাইয়্যেবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আঘাত হানে, যেখানে ১৭৫ জন নিহত হয়।
একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন ডলার।
যুদ্ধের ছয় দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ৩০০টির বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে বলে সিএসআইএস জানিয়েছে।
=> মোট খরচ: ১.২ বিলিয়ন ডলার
তবে শুধু টমাহক নয়, ছয় দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ২৫০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়।
=> আক্রমণাত্মক অস্ত্র ব্যয়: ৫.৫ বিলিয়ন ডলার
৩ মার্চের মধ্যে ইরান পাল্টা হিসেবে ২৫০০ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এগুলো প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয় প্রায় ৫.৭ বিলিয়ন ডলার, যেখানে থাড (THAAD)–এর মতো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়—
=> যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষতি: ১.৪ বিলিয়ন ডলার
=> অপারেশন ব্যয়: ২৭ মিলিয়ন ডলার
সব মিলিয়ে প্রথম ছয় দিনের মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১২.৭ বিলিয়ন ডলার।
সিএসআইএস তাদের হিসাব করেছে পেন্টাগনের দেওয়া ১১.৩ বিলিয়ন ডলারের প্রাথমিক হিসাব থেকে শুরু করে, সঙ্গে যুক্ত করেছে প্রতিরক্ষা বাজেট, কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের তথ্য ও সামরিক কর্মকর্তাদের বক্তব্য।
তবে প্রকৃত ব্যয় নির্ভর করছে কোন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে এবং অন্যান্য সামরিক বাস্তবতার ওপর। ফলে এই যুদ্ধের প্রকৃত খরচ আরও বেশি হতে পারে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান