নীরবেই হারিয়ে যাবেন সাইফুল আলম নীরব?

নীরবেই হারিয়ে যাবেন সাইফুল আলম নীরব?

ঢাকার রাজনীতিতে একসময় মাঠ কাঁপানো নাম সাইফুল আলম নীরব। ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে এসে জাতীয়তাবাদী ধারার রাজনীতিতে নিজের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন তিনি।যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং পরে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন তার রাজনৈতিক পরিচিতিকে সুদৃঢ় করে।

রাজপথের আন্দোলন, তৃণমূলের সঙ্গে সংযোগ এবং সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে তিনি দ্রুতই রাজধানীকেন্দ্রিক রাজনীতির আলোচনায় উঠে আসেন।

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

যদিও তিনি জয়ী হতে পারেননি, তবুও ওই নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে তার উপস্থিতি স্পষ্ট হয়।তবে এরপরের সময়টা ছিল তার জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। মামলা, কারাবাস, দলীয় দ্বন্দ্ব এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা মিলিয়ে তিনি ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতির মূলধারা থেকে সরে যেতে থাকেন।

তার বিরুদ্ধে নাশকতা, পুলিশের কাজে বাধা, হামলা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে ৪৫৭টি মামলা রয়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে রাজধানীর তেজগাঁও ও ধানমন্ডি থানায় করা নাশকতার পৃথক মামলায় আদালত তাকে ৩ বছরের কারাদণ্ড দেন।

তেজগাঁও থানার একটি নাশকতা মামলায় আদালত তাকে ২ বছর ৬ মাসের কারাদণ্ড দেন। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে রাজধানীর সেতু ভবনে হামলা ও ভাঙচুরের মামলায় তাকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। প্রায় ১৫ মাসের বেশি সময় কারাগারে থাকার পর ২০২৪ সালে জামিনে মুক্তি পেলেও আইনি জটিলতা পুরোপুরি কাটেনি। এসব কারণেই তার রাজনৈতিক কার্যক্রমে ছন্দপতন ঘটে।

এমন প্রেক্ষাপটে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে। বড় দলগুলো যখন নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে ব্যস্ত, তখন সাইফুল আলম নীরব একটি ভিন্ন পথ বেছে নেন।

দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে কিংবা দলীয় সমর্থন থেকে দূরে সরে গিয়ে তিনি দলের বাইরে থেকেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। ফলে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করায় ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরবকে বহিষ্কার করা হয়।

এই সিদ্ধান্ত ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি। দলীয় প্রতীক ও সংগঠনের পূর্ণ সমর্থন ছাড়া নির্বাচনে লড়াই করা সবসময়ই কঠিন, বিশেষ করে রাজধানীর মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে।

নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি সক্রিয় থাকার চেষ্টা করলেও আগের মতো সাংগঠনিক শক্তি ও কর্মী সমর্থন দৃশ্যমান ছিল না।

ফলাফলও আসে প্রত্যাশার বাইরে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। শুধু পরাজয়ই নয়, ভোটের ব্যবধান ও মাঠের বাস্তবতা স্পষ্ট করে দেয় যে, দলীয় ছায়া ছাড়া তার রাজনৈতিক শক্তি অনেকটাই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক খালিদ হোসেনের মতে, দলের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করা সাধারণত স্বল্পমেয়াদে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান রক্ষার একটি কৌশল হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে দলীয় আস্থা ও সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দলীয় শৃঙ্খলার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি বিচ্যুতি হিসেবে বিবেচিত হলেও, রাজনীতির বাস্তবতায় শৃঙ্খলা ও প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্যই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে।

তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত সবসময় স্থায়ী বিচ্ছিন্নতার দিকে নিয়ে যায় না। রাজনীতিতে স্থায়ী শত্রুতা খুব কমই দেখা যায়; সময়, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সাংগঠনিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে পুনর্বাসনের সুযোগ সবসময়ই খোলা থাকে। ফলে বিদ্রোহী অবস্থান যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি রাজনৈতিক সমীকরণের পরিবর্তনে পুনরায় মূলধারায় ফিরে আসার সম্ভাবনাও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরাজয় নীরবের জন্য একটি বড় ধাক্কা। কারণ, এটি প্রমাণ করেছে যে তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা থাকলেও দলীয় কাঠামো এবং প্রতীকের গুরুত্ব বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে কতটা গভীর। একই সঙ্গে এটি তার দলীয় অবস্থানকে আরও দুর্বল করে তুলতে পারে।

তবে অন্য একটি বিশ্লেষণও রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, দলের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করা ছিল তার জন্য ‘শেষ চেষ্টা’, নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একটি উদ্যোগ। যদিও ফলাফল তার পক্ষে যায়নি।

দলীয় কর্মীদের মতে, নীরবের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো—তিনি রাজপথের সাহসী সৈনিক; শত প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি মাঠ ছাড়েননি। কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করে রেখেছেন। ফলে পড়েছেন শত শত মামলায়।

রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় ঢাকার বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া নাশকতা, বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা, পুলিশের কাজে বাধা, হামলা এবং ভাঙচুর সংক্রান্ত অভিযোগে তার নাম বহু মামলায় এসেছে।

রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকা অনেক নেতার মতো তার বিরুদ্ধেও ‘গায়েবি মামলা’ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার অভিযোগ রয়েছে, এমন দাবি বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা করে থাকেন।

স্থানীয় বিএনপি নেতা খায়রুল বাসার বলেন, কারাবাস তার রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় অধ্যায়। দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পর তিনি কারাগারে যান এবং দীর্ঘ সময় বন্দি ছিলেন। প্রায় ১৫ মাসের বেশি সময় কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। কারাগারে থাকার সময়ও তার অনুসারীরা বিভিন্ন সময়ে মুক্তির দাবিতে কর্মসূচি পালন করেছে।

ছাত্রদল নেতা সবুজ জানান, বিগত দিনগুলোতে নীরব ভাইয়ের ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি কর্মীদের ছায়া দিয়ে রেখেছেন। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি মাঠ ছেড়ে পালিয়ে যাননি; সব সময় কর্মীদের পাশে ছিলেন।

তবে রাজনীতিতে তার পুরোপুরি অনুপস্থিতি নেই, স্থানীয় পর্যায়ে তার একটি নীরব নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয় বলে ধারণা করা হয়।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার অবস্থান কিছুটা অস্পষ্ট। তিনি প্রকাশ্যে খুব বেশি বক্তব্য দিচ্ছেন না, বড় কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও দৃশ্যমান নন।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক নেতা দীর্ঘ সময় নীরব থাকার পর আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। সেই দিক থেকে দেখলে নীরবের নীরবতা হয়তো পুরোপুরি সরে যাওয়া নয়, বরং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ বা পুনর্গঠনের একটি ধাপও হতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, সাইফুল আলম নীরবের ক্যারিয়ার একদিকে যেমন উত্থান-পতনের গল্প, অন্যদিকে তেমনি বাংলাদেশের সংঘাতময় রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘ নীরবতার পর তিনি কি আবারও আলোচনায় ফিরবেন, নাকি ধীরে ধীরে আড়ালেই থেকে যাবেন—এই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS