রাজধানীতে ইফতার ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রতিযোগিতামূলক মার্কেটিং, নতুন স্বাদের পরীক্ষা এবং ব্র্যান্ড পজিশনিংয়ের লড়াই। সেই দৌড়ে এগিয়ে আছে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরা (আইসিসিবি) প্রাঙ্গণে বসা ইফতার বাজার, যেখানে বিক্রির হিসাব মাপা হয় ঘণ্টায় আর জনপ্রিয়তা নির্ধারিত হয় সারির দৈর্ঘ্যে।
শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৪টার পর থেকেই ক্রেতাদের ঢল নামে। অধিকাংশই অফিসফেরত; লক্ষ্য দ্রুত কেনাকাটা সেরে প্যাকেট নিয়ে বাসায় ফেরা।
তবে বাজারের ভেতরে হাঁটলে বোঝা যায়, ক্রেতারা শুধু খাবার কিনছেন না-তারা ব্র্যান্ডও বেছে নিচ্ছেন।
মাস্টার শেফ সুব্রত স্টলে দেখা গেছে সবচেয়ে দীর্ঘ সারি। কাবাব, মেজবানি, বিশেষ মসলার গরু ও মুরগির পদ আকর্ষণীয়ভাবে সাজানো। এক ক্রেতা বলেন, ‘নামটা পরিচিত, তাই ভরসা পাই।অতিথি এলে এখান থেকেই নিই।’ বিক্রেতাদের ভাষ্য, পুরান ঢাকার তেহারি-বিরিয়ানি ও জনপ্রিয় কাবাব বাজার বসার দুই ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। দ্রুত বিক্রিই তাদের ব্র্যান্ড ভ্যালুর প্রমাণ বলে মনে করছেন তারা।
পুরান ঢাকার ইফতার পছন্দ ইউসুফ পরিবারের সদস্যরা রাজধানীর খিলক্ষেতের বাসিন্দা।
জ্যাম ঠেলে পরিবার নিয়ে পুরান ঢাকায় যাওয়া সহজ নয় বলে ইফতারের স্বাদ নিতে তারা এসেছেন এই বাজারে। বিকেল ৫টার একটু আগে এলেও ততক্ষণে অনেক খাবারই শেষ। শেষ পর্যন্ত ইউসুফ আহমেদ ‘হ্যারিটেজ’ স্টল থেকে মেজবানি, কাবাব, দুই ধরনের জিলাপি, বুট-মুড়ি ও রেশমি পেঁয়াজু কিনে ইফতার টেবিলে বসেন। তিনি বলেন, ‘সব দোকান ঘুরে দেখলাম খাবারের মান ভালো। হ্যারিটেজের সুনাম আগেও শুনেছি।আজ তাই সপরিবারে এখানে ইফতার করতে এলাম।’

অন্যদিকে ঘরোয়া স্বাদের অবস্থান তৈরি করেছে ‘ফ্রেন্ডস কিচেন’। তারা ঘরে তৈরি খাবার বিক্রি করছে। তাদের দই বড়া বেস্টসেলার; সঙ্গে রয়েছে কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যবাহী ছানা মাঠা। এক নারী ক্রেতা বলেন, ‘বাচ্চারা বাইরের সব খাবার খায় না, কিন্তু এখানকার দই বড়া নিয়মিত নিই।’ বিক্রেতারা জানান, প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবার প্রস্তুত করা হয় এবং সন্ধ্যার আগেই বেশিরভাগ শেষ হয়ে যায়।
বসুন্ধারা থেকে আসা এক নারী ক্রেতা বলেন, ‘তাদের মাঠা খুব ভালো। এক বোতল মাঠাই ইফতারে তৃষ্ণা মেটাতে যথেষ্ট।’
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ক্রেতাই খাবার প্যাক করে নিয়ে যাচ্ছেন। তবে বসে ইফতার করার জন্যও রয়েছে নির্দিষ্ট ব্যবস্থা। পরিবার বা বন্ধুরা চাইলে সেখানেই ইফতার সেরে নিতে পারেন।
শরবত ও আইসক্রিমের আলাদা স্টোরও মার্কেটিং কৌশলের অংশ। মূল খাবারের সঙ্গে ‘কুলিং আইটেম’ যোগ করে বিক্রি বাড়ানো হচ্ছে। শরবতের স্টলে দেশি তাজা ফলের জুস ৬০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
সাধারণ ইফতার বাজারের তুলনায় পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনায় রয়েছে ভিন্নতা। আয়োজকরা শতভাগ পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি করেছেন। কিছুক্ষণ পরপর পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ফ্লোর পরিষ্কার করছেন। ভিড় হলেও যাতে গা-ঘেঁষাঘেঁষি না হয়, সে জন্য কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
সব মিলিয়ে আইসিসিবির ইফতার বাজার এখন শুধু মৌসুমি আয়োজন নয়; এটি হয়ে উঠেছে রমজানকেন্দ্রিক ব্র্যান্ড প্রতিযোগিতার এক প্রাণবন্ত প্ল্যাটফর্ম, যেখানে দুই ঘণ্টার বিক্রিই নির্ধারণ করে কোন স্টল সবচেয়ে সফল।