আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে নৌপথে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে সরকার সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক প্রস্তুতিমূলক সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা জানান।
সভায় মন্ত্রী বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে নৌপথে যাত্রীচাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও স্বস্তি নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার।
১৫ রমজান থেকে ঈদের পর তৃতীয় দিন পর্যন্ত ঢাকার জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাট পর্যন্ত সড়ক যানজটমুক্ত রাখতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সদরঘাট এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ট্রাফিক পুলিশ, নৌপুলিশ, আনসার ও কমিউনিটি পুলিশ সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবে।
নৌদুর্ঘটনা প্রতিরোধে আগামী ১৬ থেকে ২৫ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দিন-রাত সার্বক্ষণিক বালুবাহী বাল্কহেড ও ডিঙ্গি নৌকা চলাচল বন্ধ থাকবে। রাতের বেলায় স্পিডবোট চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে।দিনের বেলায় স্পিডবোটে যাত্রীদের লাইফ জ্যাকেট পরিধান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
১৭ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় ও দ্রুত পচনশীল পণ্যবাহী ট্রাক ছাড়া সাধারণ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ফেরিতে পারাপার বন্ধ রাখা হবে, যাতে যাত্রী পরিবহন নির্বিঘ্ন থাকে।
নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, অনুমোদিত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বা মালামাল বহন কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। লঞ্চের ছাদে যাত্রী উঠানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
বিআইডব্লিউটিএ অনুমোদিত ভাড়ার তালিকা সব নদীবন্দর, টার্মিনাল ও নৌযানে দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট নৌযানের রুট পারমিট ও লাইসেন্স বাতিলসহ মালিক-চালকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে ফেরিঘাট, লঞ্চঘাট ও স্পিডবোট ঘাটে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হবে বলে তিনি জানান।
অভ্যন্তরীণ নৌপথে ফিটনেসবিহীন নৌযান ও ফেরি চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী চলাচল নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।সিরিয়াল ভঙ্গ বা অনিয়মে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নদীর মাঝপথ থেকে যাত্রী ওঠানো বন্ধে নজরদারি জোরদার করা হবে।
সভায় জানানো হয়, নৌপথে ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও যাত্রী হয়রানি প্রতিরোধে বিশেষ করে রাতের বেলায় টহল বাড়ানো হবে।
এছাড়াও, ১৫ রমজান থেকে ঈদের পর তৃতীয় দিন পর্যন্ত প্রতিটি লঞ্চে ন্যূনতম চারজন আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডের সমন্বয়ে প্রতিটি ঘাটে ভিজিল্যান্স টিম গঠন করা হবে। পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে কেন্দ্রীয় মনিটরিং টিম গঠন করে সার্বিক পরিস্থিতি তদারকি করা হবে।
দুর্ঘটনা মোকাবেলায় উদ্ধারকারী নৌযান প্রস্তুত রাখা হবে। গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দরে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে ভাসমান নৌ-ফায়ার স্টেশন স্থাপন করা হবে।
চাঁদপুরের মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনায় ঘূর্ণাবর্ত এলাকা চিহ্নিতকরণসহ বিভিন্ন নৌরুটে নাব্য চ্যানেল মার্কিং নিশ্চিত করা হবে। প্রয়োজনীয় খনন, পন্টুন স্থাপন ও ঘাট উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করা হবে।
আরও জানানো হয়, নদীবন্দর ও টার্মিনালগুলোতে পানীয় জল, স্যানিটেশন, মোবাইল চার্জিং, ব্রেস্ট ফিডিং কর্নারসহ নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। সদরঘাটসহ সব নদীবন্দর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে এবং ধূমপান নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হবে।
ঈদে অতিরিক্ত যাত্রীচাপ এড়াতে ঢাকা ও গাজীপুর মহানগর এলাকায় গার্মেন্টস শ্রমিকদের পর্যায়ক্রমে ছুটি দেওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। লঞ্চ ও ফেরিঘাট থেকে দেশের অভ্যন্তরে যাত্রীদের যাতায়াত সহজ করতে বিআরটিসির পর্যাপ্ত ফিডার বাস সার্ভিস চালুর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্ত্রী বলেন, “ঈদযাত্রায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না। যাত্রীদের নিরাপত্তা ও স্বস্তি নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর।”
জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এবং যাত্রীসেবা সংক্রান্ত বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র হটলাইন ১৬১১৩ নম্বরে যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সভায় নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, প্রতিমন্ত্রী মো. রাজীব আহসান, নৌপরিবহন সচিব ড. নূরুন্নাহার চৌধুরী, এনডিসিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, অধীন দপ্তর-সংস্থার প্রধান, জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ পুলিশ, কোস্টগার্ড, নৌপুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।