ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের প্রবেশমুখে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। হাসপাতালের পিচঢালা সড়কে শুয়ে থাকা অবস্থায় প্রাইভেটকারের চাপায় নিভে গেল এক বৃদ্ধার জীবন।ভবঘুরে নাম-পরিচয়বিহীন সেই বৃদ্ধার বয়স আনুমানিক ৭০ বছর। এই মৃত্যুর ব্যাপারে হাসপাতালের ক্যাম্প পুলিশ বলছে, ‘তেমন কিছু নয়, অচল মানুষ’।আর আনসার সদস্যরা বলছেন, ‘সবকিছু দেখা সম্ভব নয়।’
গতকাল বুধবার (১৫ এপ্রিল) রাত আনুমানিক ৩টার দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রবেশের পরপরই পিচঢালা সড়কে এই ঘটনা ঘটে।রোগীদের আনা-নেওয়ারসহ অন্যান্য কাজেও হাসপাতালের এই প্রধান গেট দিয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষ ও শতাধিক যানবাহন চলাচল করে।
পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাড্ডা থেকে এক গুরুতর অসুস্থ রোগী নিয়ে দ্রুতগতিতে হাসপাতালে প্রবেশ করেছিল একটি প্রাইভেটকার।কিন্তু হাসপাতালের গেটেই পুলিশ ক্যাম্পের সামনে পিচঢালা রাস্তায় ময়লাযুক্ত কাপড়ে মুড়িয়ে পড়েছিলেন অজ্ঞাতপরিচয় ওই বৃদ্ধা। কিন্তু তার এভাবে পড়ে থাকাকে ‘পরিত্যক্ত কোনো বস্তা’ ভেবে গাড়ি ওপর দিয়েই চলে যায়। কিন্তু তখনই চালক কোনো মানুষকে চাপা দেওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারেন এবং বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে জরুরি বিভাগে ভর্তি করেন। তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই সেই বৃদ্ধা মারা যান।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) ঢাকা মেডিকেল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ মো. ফারুক ভবঘুরে ওই বৃদ্ধার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘তেমন কিছু না, নিহত নারী অচল মানুষ ও ভবঘুরে ছিলেন। প্রাইভেটকার চালক তাকে দেখতে না পাওয়ায় চাপা পড়ে মারা গেছেন।’
‘হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সেই গেট দিয়ে প্রতিদিন শতশত মানুষ ও শত যানবাহন চলাচলের স্থানে, তাও আবার পুলিশ ক্যাম্পের সামনে পিচঢালা সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে শুয়ে থাকা নারীর মৃত্যুর দায়ভার কার’—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সেটা তো আর আমি বলতে পারব না। তবে ওই নারী অচল ছিলে, ঠিকমতো চলাচল করতে পারতেন না। মনে হয় একপর্যায়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে আর চলতে না পেরে সেখানেই শুয়ে পড়েন।’
ঘটনার পরপর প্রাইভেটকার চালককে শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
অন্যদিকে পুলিশ ক্যাম্পের সামনে এই ঘটনাটি ঘটলেও একই স্থানে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে থাকেন হাসপাতালের দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা।
এই ব্যাপারে হাসপাতালের আনসার সদস্যদের প্রধান প্লাটুন কমান্ডার (পিসি) শফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, মধ্যরাতের পরে জরুরি বিভাগের সড়কে প্রাইভেটকারের চাপায় এক বৃদ্ধা নারী মারা গেছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, দুর্ঘটনার আগে সেই নারীকে দেখতে পেয়ে সেখানে দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা তাকে সরিয়ে দেওয়ার অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু পারেনি।
‘নিহত নারী তো অচল ছিলেন, কিভাবে চেষ্টা করেছে সরিয়ে দেওয়ার’—এই প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, ‘এই কথা তো সেখানে দায়িত্বরত আনসাররাই ভালো বলতে পারবেন। আমি তো অনেক কাজে ব্যস্ত থাকি, সবকিছু আমার পক্ষে দেখা সম্ভব নয়।’
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গতকাল রাতের দিকে যানবাহন চলাচলের স্থানে অচেতন অবস্থায় সেই বৃদ্ধা নারী পড়ে থাকলেও তাকে সরিয়ে নেওয়া বা চিকিৎসার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। গভীর রাতে এক রোগীকে নিয়ে প্রাইভেটকার হাসপাতালে প্রবেশের সময় অসাবধানতাবশত গাড়ির চাপায় সেই নারীর মৃত্যু হয়। ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগেও সেই বৃদ্ধা নারীকে একই জায়গায় শোয়া অবস্থায় দেখেছেন অনেকেই।
সেই প্রত্যক্ষদর্শীরা সরাসরি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলেন, বর্তমানে আরও তিনজন ভবঘুরে শুয়ে আছে হাসপাতাল চত্বরে এক কোণে। তারাও কিন্তু হামাগুড়ি দিতে দিতে পিচঢালা সড়কে চলে আসতে পারেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গ সূত্রে জানা যায়, নিহত নারীর লাশের ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ ফ্রিজে সংরক্ষণ করা হবে। পরে কয়েকদিনের মধ্যে স্বজনদের খোঁজ না পাওয়া গেলে নিয়ম অনুযায়ী দাফনের জন্য লাশ আঞ্জুমানে হস্তান্তর করা হবে।