গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনার বিরোধিতা করা দেশগুলোর ওপর নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, কোনো দেশ যদি গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে তার পরিকল্পনার সঙ্গে একমত না হয়, তাহলে তিনি তাদের ওপর শুল্ক বসাতে পারেন। গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি স্বশাসিত অঞ্চল।
তবে কোন কোন দেশ এই শুল্কের আওতায় পড়তে পারে বা কী আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে তিনি এমন কর বসাবেন, সে বিষয়ে ট্রাম্প কিছু বলেননি।
ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড ছাড়াও আরও কয়েকটি দেশ ট্রাম্পের এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও অনেকেই গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের ধারণা নিয়ে সন্দিহান। ট্রাম্প যখন এই মন্তব্য করছিলেন, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের একটি দ্বিদলীয় প্রতিনিধিদল গ্রিনল্যান্ড সফর করছিল অঞ্চলটির প্রতি সমর্থন জানাতে।
১১ সদস্যের ওই দলে রিপাবলিকানরাও ছিলেন, যারা জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিতে গ্রিনল্যান্ড দখলের আহ্বান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।প্রতিনিধিদলটি গ্রিনল্যান্ডের সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেনের সঙ্গে বৈঠক করেন।
দলনেতা ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস কুনস বলেন, এই সফরের উদ্দেশ্য স্থানীয় মানুষের কথা শোনা এবং সেই মতামত ওয়াশিংটনে পৌঁছে দেওয়া, যাতে উত্তেজনা কিছুটা কমানো যায়।
ট্রাম্প বারবার বলে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এটি ‘সহজ পথে’ অথবা ‘কঠিন পথে’ পেতে পারে, যা দ্বীপটি কেনা বা শক্তি প্রয়োগের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শুক্রবার গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আয়োজিত হোয়াইট হাউসের বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, “গ্রিনল্যান্ড যদি কেউ আমাদের সঙ্গে না মেনে চলে, তাহলে আমি তাদের ওপর শুল্ক বসাতে পারি। কারণ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার।”
গ্রিনল্যান্ডের জনসংখ্যা কম হলেও এটি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। উত্তর আমেরিকা ও আর্কটিক অঞ্চলের মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং ওই অঞ্চলের নৌযান পর্যবেক্ষণে এর কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।
বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত পিটুফিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের শতাধিক সেনা স্থায়ীভাবে মোতায়েন রয়েছে।এটি একটি ক্ষেপণাস্ত্র নজরদারি কেন্দ্র, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্র পরিচালনা করে আসছে।
ডেনমার্কের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র চাইলে গ্রিনল্যান্ডে আরও সেনা মোতায়েন করতে পারে। কিন্তু ট্রাম্প বলেছেন, রাশিয়া বা চীনের সম্ভাব্য হামলা থেকে রক্ষা করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ডের ‘মালিকানা’ নিতে হবে।
ডেনমার্ক সতর্ক করে বলেছে, গ্রিনল্যান্ডে সামরিক পদক্ষেপ নিলে ন্যাটো জোট ভেঙে পড়তে পারে। কারণ ন্যাটোর মূল নীতি হলো, বাইরের আক্রমণে সদস্য রাষ্ট্রগুলো একে অপরকে সহায়তা করবে। কিন্তু কোনো সদস্য যদি আরেক সদস্যের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করে, সে ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি ন্যাটো কখনো হয়নি।
ইউরোপীয় মিত্ররা ডেনমার্কের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তারা বলেছে, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, বরং যৌথভাবে ন্যাটোর দায়িত্ব।
এই প্রেক্ষাপটে ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ গ্রিনল্যান্ডে সীমিত সংখ্যক সেনা পাঠিয়েছে, যাকে ‘রেকি মিশন’ বলা হচ্ছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ জানিয়েছেন, শিগগিরই স্থল, আকাশ ও নৌবাহিনীর সরঞ্জাম পাঠানো হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস প্রতিনিধিদলের এই সফর এমন এক সময়ে হলো, যখন ওয়াশিংটনে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও ট্রাম্পকে তার পরিকল্পনা থেকে সরানো যায়নি।
গ্রিনল্যান্ডের সংসদ সদস্য আজা কেমনিৎস বলেন, মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে বৈঠক তাকে আশাবাদী করেছে। তিনি বলেন, আমাদের বন্ধু দরকার, আমাদের মিত্র দরকার।
হোয়াইট হাউসের অবস্থান আর ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের অবস্থানের মধ্যে বড় পার্থক্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা একটা দীর্ঘ দৌড়, ছোট কোনো দৌড় নয়। ২০১৯ সাল থেকেই আমরা যুক্তরাষ্ট্রের চাপ দেখছি। এখনই সব শেষ হয়ে গেছে—এটা ভাবা হবে সরলতা।
তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় বদলাচ্ছে। তাই যত বেশি সমর্থন পাওয়া যায়, ততই ভালো।
এদিকে রিপাবলিকান সিনেটর লিসা মারকাওস্কি গ্রিনল্যান্ড দখলের যেকোনো চেষ্টা ঠেকাতে একটি দ্বিদলীয় বিলের সহ-উদ্যোক্তা। আবার একজন রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত করার পক্ষে আলাদা বিল উত্থাপন করেছেন।
গ্রিনল্যান্ডে ট্রাম্পের বিশেষ দূত জেফ ল্যান্ড্রি ফক্স নিউজকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ডেনমার্ক নয়, গ্রিনল্যান্ডের নেতাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা।
তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি, পরিস্থিতি এগোলে একটা চুক্তি হবে। প্রেসিডেন্ট বিষয়টি নিয়ে খুবই সিরিয়াস।
ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বুধবার হোয়াইট হাউসে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে বৈঠক করেন।
ডেনিশ এক কর্মকর্তা জানান, ওই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ‘মধ্যপন্থা’ খোঁজার প্রস্তাব দেয়, যাতে ট্রাম্পের পাশাপাশি ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডও সন্তুষ্ট হয়। তবে সেখানে গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সেনা পাঠানোর বিষয়টি আলোচনায় আসেনি।
তবুও ওই কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের যে কথা বলছেন, ডেনমার্ক সেটিকে খুবই গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। তার ভাষায়, এই বিষয়ে আমাদের ধারণা হলো— তিনি যা বলেন, সেটাই তিনি বোঝান।
সূত্র: বিবিসি