রমজানে রাজধানীর ইফতার বাজার মানেই একদিকে ঐতিহ্যের টান, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রিত আয়োজনের স্বস্তি। এই দুই ধারার স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায় পুরান ঢাকার অলিগলির বাজার আর আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটি বসুন্ধরা (আইসিসিবি) প্রাঙ্গণে বসা ইফতার বাজারের মধ্যে।
পুরান ঢাকার চকবাজার বা নাজিরাবাজারে ইফতারের সময় মানুষের ঢল নামে বিকেল থেকেই। সরু রাস্তা, গা-ঘেঁষাঘেঁষি ভিড় আর ডাকাডাকির মধ্যেই তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।সেখানে কেনাকাটা এক ধরনের ঐতিহ্যের অংশ। অন্যদিকে আইসিসিবিতে ভিড় থাকলেও তা নিয়ন্ত্রিত। নির্দিষ্ট প্রবেশপথ, নিরাপত্তাকর্মীর তদারকি ও বসে ইফতার করার আলাদা জোন—সব মিলিয়ে পরিবারবান্ধব পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চোখে পড়ে। এখানে হাঁটার জায়গা তুলনামূলক বেশি, পরিচ্ছন্নতার দিকেও নিয়মিত নজরদারি রয়েছে।
পুরান ঢাকায় প্রধান আকর্ষণ ঐতিহ্যবাহী বোরহানি, কাবাব, মোরগ পোলাও, শাহী জিলাপি কিংবা বুটের ডাল। স্বাদের খ্যাতিই মূল শক্তি। বেশিরভাগ দোকান বহু বছরের পুরোনো, গ্রাহকভিত্তিও স্থায়ী। আইসিসিবির বাজারে ঐতিহ্যবাহী আইটেমের পাশাপাশি আছে ফিউশন ও নতুন পরীক্ষামূলক পদ চিজি কাবাব, বিশেষ মশলার গ্রিল, ভিন্নধর্মী পিয়াজু কিংবা প্রিমিয়াম প্যাকেজিংয়ে মেজবানি।
এখানে উপস্থাপন ও ব্র্যান্ডিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক স্টল নিজেদের আলাদা করে তুলতে ডিজিটাল ব্যানার, স্টাফদের ইউনিফর্ম ও ব্র্যান্ডেড প্যাকেট ব্যবহার করছে।

পুরান ঢাকার বাজারে তুলনামূলক কম দামে বড় পরিমাণ খাবার পাওয়া যায় বিশেষ করে স্থানীয় ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের জন্য এটি আকর্ষণীয়। দরদামও কিছু ক্ষেত্রে সম্ভব। আইসিসিবিতে দামের পরিসর কিছুটা বিস্তৃত।৬০ টাকার শরবত থেকে শুরু করে ৩০০ টাকা বা তার বেশি মূল্যের আইটেমও রয়েছে। এখানে মূলত অফিসফেরত কর্মজীবী, মধ্য ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবার এবং তরুণদের উপস্থিতি বেশি। প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ ক্রেতাই খাবার প্যাক করে নিয়ে যান।
পুরান ঢাকায় বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বিক্রি চলতে থাকে, অনেক দোকান রাত অবধি খোলা থাকে। আইসিসিবিতে বিক্রির প্রধান চাপ থাকে দেড় থেকে দুই ঘণ্টায়। এই সময়েই অধিকাংশ জনপ্রিয় আইটেম শেষ হয়ে যায়। ফলে এখানে বিক্রি অনেকটাই ‘টাইম-সেন্সিটিভ’।
অভিজ্ঞতার পার্থক্য
পুরান ঢাকায় গেলে ঐতিহ্য, ইতিহাস আর মানুষের ভিড় সব মিলিয়ে এক অন্যরকম আবহ পাওয়া যায়। আইসিসিবিতে গেলে মেলে তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক, পরিকল্পিত ও ব্র্যান্ড-কেন্দ্রিক অভিজ্ঞতা। সব মিলিয়ে বলা যায়, দুই বাজারই আলাদা দর্শনের প্রতিনিধিত্ব করে। পুরান ঢাকা বহন করছে রমজানের শতবর্ষী খাদ্য ঐতিহ্য, আর আইসিসিবি তুলে ধরছে আধুনিক নগরজীবনের সংগঠিত, ব্র্যান্ড-নির্ভর ইফতার সংস্কৃতি। ক্রেতারা এখন নিজেদের প্রয়োজন, বাজেট ও অভিজ্ঞতার পছন্দ অনুযায়ী বেছে নিচ্ছেন তাদের ইফতারের ঠিকানা।