কোনো কিছুতেই থামছে না স্বর্ণ চোরাচালান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান, ঘন ঘন আটক ও বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ জব্দের পরও থামছে না এই অবৈধ ব্যবসা।বরং প্রতিদিন নিত্যনতুন কৌশলে আকাশ, জল ও স্থলপথে দেশের ভেতরে প্রবেশ করছে শত শত কোটি টাকার অবৈধ স্বর্ণ। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, মাঠপর্যায়ের বাহক বা কুরিয়াররা ধরা পড়লেও বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে সিন্ডিকেটের মূল হোতারা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে চোরাকারবারিরা প্রতিনিয়ত ব্যবহার করছে নতুন সব কৌশল। মোজা, অন্তর্বাস কিংবা বিশেষ বেল্টের ভেতরে লুকিয়ে এবং ক্ষেত্রবিশেষে শরীরের বিভিন্ন অংশে বিস্কুট আকারে স্বর্ণ বহন করা হচ্ছে।আন্তর্জাতিক ফ্লাইটগুলোর সিটের কুশন, টয়লেট বা বিভিন্ন গোপন অংশে স্বর্ণ লুকিয়ে রাখা এবং পরবর্তীতে বিমানবন্দর পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা গ্রাউন্ড স্টাফদের মাধ্যমে তা বাইরে পাচার করা হচ্ছে।
প্রবাসীদের জন্য নির্ধারিত ব্যাগেজ বিধিমালার অপব্যবহার করে বৈধ কোটার আড়ালে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে স্বর্ণ নিয়ে আসা থেকে শুরু করে আকাশপথের পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে স্থলপথে এবং সমুদ্র উপকূলীয় রুট ব্যবহার করে বড় চালান প্রবেশ করানো হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দর ও স্থল সীমান্তে অভিযান চালিয়ে বাহকদের আটক করছে। কিন্তু সিন্ডিকেটের গডফাদাররা ধরা পড়ছে না। মূল হোতারা সরাসরি চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত না থাকায় নিরাপদ দূরত্বে থেকে ফোন বা অনলাইনের মাধ্যমে পুরো চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করছে।
এই কাজে ধরা পড়ছে স্বল্প আয়ের প্রবাসী বা সাধারণ কুরিয়াররা, যারা চক্রের মূল মালিকদের আসল পরিচয় বা ঠিকানা পর্যন্ত জানে না। মাঝেমধ্যে কিছু মাঝারি সারির ব্যবসায়ী আটক হলেও দুর্বল আইনি প্রক্রিয়া ও জামিনের সুযোগ নিয়ে তারা দ্রুত বেরিয়ে এসে আবার পুরোনো ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। দুবাই, সিঙ্গাপুর, ভারত ও বাংলাদেশের একটি প্রভাবশালী চক্র মিলেই এই সিন্ডিকেট পরিচালনা করছে, যা ছিন্ন করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বেশ সময়সাপেক্ষ ও জটিল হয়ে পড়েছে।
ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় ৬৯৮ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৫৫ কেজি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জব্দ স্বর্ণের পরিমাণ ৪১৭ কেজি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬৯ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। আর চলতি বছরের এ পর্যন্ত জব্দ হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬৩ কেজি স্বর্ণ।
এসব স্বর্ণ জব্দের ঘটনায় ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের এই সময় পর্যন্ত স্বর্ণ চোরাচালানের অভিযোগে বিমানবন্দর থানায় ৫৪০টি মামলা করা হয়েছে। তবে অনেক ঘটনায় কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ায় বেশির ভাগ মামলার আসামি অজ্ঞাতপরিচয়।
স্বর্ণ পাচারের রুট হিসেবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রগুলো শাহজালাল বিমানবন্দরকে ব্যবহার করছে। বেশির ভাগ চালান আসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে। পাশাপাশি সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও কুয়েত থেকে আসা ফ্লাইটেও স্বর্ণ আসে। চোরাকারবারিরা কখনো যাত্রীর শরীরে, কখনো বিমানের সিট, টয়লেট, বর্জ্য ট্রলি বা কার্গো অংশে স্বর্ণ লুকিয়ে আনে। একের পর এক চালান ধরা পড়ার পরও চক্রটি কেন বারবার এই রুট ব্যবহার করছে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, দৃশ্যত অনেক চালান ধরা পড়লেও হয়তো এর চেয়ে বড় বড় চালান প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিরাপদে বের করে নিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে বারবার তারা এই বিমানবন্দরকে বেছে নিচ্ছে।
তবে বিমানবন্দরগুলোতে যতই কড়াকড়ি বা আধুনিক স্ক্যানার বসানো হোক না কেন, চক্রের মূল গডফাদাররা পর্দার আড়ালে থাকায় শুধু বাহক ধরে পুরোপুরি চোরাচালান রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ব্যাপারে কাস্টমসের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার সোনা ও বাহকদের আটক করছি, যা আমাদের কঠোর নজরদারির প্রমাণ। তবে এই ব্যবসার মূল অর্থায়নকারী ও সিন্ডিকেটের বড় মাথাদের ধরতে গোয়েন্দা কার্যক্রম আরও ব্যাপক পরিসরে এবং আন্তঃসংস্থা সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিচালনা করা জরুরি।
শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ বলেন, বিমানবন্দরকে চোরাকারবারিমুক্ত রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আমাদের নজরদারির কারণেই স্বর্ণের চালানগুলো ধরা পড়ছে। সিন্ডিকেট ও চোরাকারবারিদের ঠেকাতে নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।