সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিকের মধ্যে পরিচয় শনাক্ত হওয়া নয়জনের লাশ দেশে ফিরেছে। তাদের মধ্যে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার সাতজন, নাটোরের নলডাঙ্গার একজন এবং রাজশাহীর বাগমারার একজন রয়েছেন।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রিয়জনের লাশ ফিরে পেলেও নয়টি পরিবারে এখন শোকের ছায়া। আর পরিচয় শনাক্ত না হওয়া বাকি সাত শ্রমিকের স্বজনেরা এখনো অপেক্ষায় রয়েছেন প্রিয়জনের লাশ দেশে ফেরার।
নিহত নয়জনের প্রতিটি পরিবারের জন্য লাশ পরিবহন ও দাফন খরচ বাবদ ৩৫ হাজার টাকা এবং এককালীন আর্থিক সহায়তা হিসেবে ৩ লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। অর্থাৎ প্রতিটি পরিবার মোট ৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা করে পাবে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৪০ নম্বর ফ্লাইটে সৌদি আরব থেকে নয়জনের লাশ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। সেখানে উপস্থিত থেকে লাশহগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
লাশ গ্রহণের পর বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন তারা। এ সময় প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী জানান, নিহতদের পরিবারের পাশে সরকার রয়েছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রত্যেক পরিবারকে ৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যবস্থাপনায় লাশগুলো নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আগুনে প্রাণ গেল ১৬ বাংলাদেশির
গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের শিফা এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। সে সময় কারখানার ভেতরে ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক ছিলেন। আগুনে দগ্ধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতে কাজ শেষে শ্রমিকেরা কারখানার ভেতরেই ঘুমিয়ে ছিলেন। আগুন লাগার পর কারখানার মূল ফটক বাইরে থেকে তালাবদ্ধ থাকায় তারা বের হতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় তাদের প্রাণে বাঁচার সুযোগ হয়নি।
এ ঘটনায় সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রথমে আঙুলের ছাপ পরীক্ষার মাধ্যমে নয়জনের পরিচয় নিশ্চিত করে। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের লাশ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
আত্রাইয়ের সাত পরিবারে কান্না
দেশে আসা নয়জনের মধ্যে সাতজনই নওগাঁর আত্রাই উপজেলার। তাদের মধ্যে চারজন একই গ্রামের এবং দুজন সহোদর বলে জানা গেছে। লাশ দেশে আসার খবরে স্বজনেরা বিমানবন্দরে ছুটে যান। প্রিয়জনকে শেষবারের মতো দেখতে অপেক্ষায় থাকেন পরিবারের সদস্যরা।
আত্রাইয়ের নিহত সাতজন হলেন-উদনপৈ গ্রামের ময়ন উদ্দিনের ছেলে মো. ফরিদ, গণ্ডগোহালী গ্রামের সাইদুর প্রামাণিকের ছেলে রুবেল প্রামাণিক, গুফফার প্রামাণিকের ছেলে মোহন আলী, ময়ন আলীর ছেলে সুমন আলী, মৃত বজলুর রহমানের ছেলে কলিমউদ্দিন, ডুবাই গ্রামের বাদল তরফদারের ছেলে সোহেল রানা এবং পারকাসুন্দা গ্রামের তমেজ উদ্দিন সরকারের ছেলে আব্দুল জলিল সরদার।
অন্য দুজন হলেন নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার মহিষডাঙ্গা গ্রামের আশরাফুল ইসলামের ছেলে রবিউল ইসলাম এবং রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার মুর্শগ্রাম গ্রামের কলিমউদ্দিন মাশির ছেলে মো. শ্যামল উদ্দিন মাশি।
নিহতদের মধ্যে পরিচয় শনাক্ত না হওয়া একজন মিনহাজের মা পারুল বিবি এখনো ছেলের লাশের অপেক্ষায় রয়েছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘হামার ছাওয়ালের লাশ নাকি শনাক্ত হয়নি, এজন্য পরে আসবে। সরকারের কাছে আবদার, হামার ছেলের লাশ য্যান দ্রুত নিয়ে আসে। শেষবারের মতো ছেলেটাক এক নজর দেখতে মন স্থির রাখতে পারোছি না।’
তার মতো আরও ছয় পরিবারের অপেক্ষারও শেষ হয়নি। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের লাশ দেশে ফেরানোর আশ্বাস দিয়েছে সরকার।
ডিএনএ পরীক্ষায় শনাক্ত হবে বাকি সাতজন
প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, বাকি সাতজনের আঙুলের ছাপ পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তত্ত্বাবধানে স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরীক্ষা শেষ করে লাশগুলো দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ‘কোনো মৃত্যুই কাম্য নয়। আমাদের প্রবাসী ভাইয়েরা বিদেশে যান, অনেক কষ্টের কাজ করে পরিবারের জন্য টাকা পাঠান। যারা মারা গেছেন, তাদের মধ্যে যাদের লাশ এখনো দেশে আনতে পারিনি, তাদের লাশ দেশে আনতে সৌদি দূতাবাসের সবাই নিরলসভাবে কাজ করছেন। আগুনে তাদের মৃত্যু হওয়ায় ডিএনএ পরীক্ষা করতে হবে। পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছে। দ্রুত তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।’
লাশ পৌঁছে দেবে সরকার
নিহত নয়জনের লাশ শুধু দেশে ফিরিয়েই দায়িত্ব শেষ করছে না সরকার। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহগুলো সরাসরি তাদের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সমন্বয় করে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে লাশগুলো স্বজনদের কাছে বিনা খরচে পৌঁছে দেওয়া হবে। শনাক্ত হওয়া সাতজনের লাশ গ্রহণের জন্য স্বজনদের খবর দেওয়া হয়েছে।
প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে শুক্রবার রাতের মধ্যে লাশগুলো নিজ নিজ গ্রামে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিহত নয়জনের প্রতিটি পরিবারকে মোট ৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এর মধ্যে লাশ পরিবহন ও দাফন খরচ বাবদ ৩৫ হাজার টাকা এবং এককালীন অনুদান হিসেবে ৩ লাখ টাকা দেওয়া হবে।
একই সঙ্গে লাশ পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও নিয়েছে সরকার। এতে শোকাহত পরিবারগুলো অন্তত প্রিয়জনের লাশ দেশে এনে শেষ বিদায়ের সুযোগ পাচ্ছে।
তবে স্বজনদের কষ্ট এখানেই শেষ নয়। নয়জনের লাশ দেশে ফিরলেও বাকি সাতজনের পরিবার এখনো তাকিয়ে আছে ডিএনএ পরীক্ষার ফলের দিকে। তাদের একটাই অপেক্ষা-কবে নিশ্চিত হবে প্রিয়জনের পরিচয়, কবে ফিরবে নিথর দেহ, আর কবে শেষবারের মতো আপনজনকে বিদায় জানাতে পারবেন তারা।
এ ঘটনায় বিমানবন্দরে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক মো. আসাদুজ্জামান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (কনস্যুলার ও কল্যাণ) দেওয়ান আলি আশরাফ এবং ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি আরবের ডেপুটি চিফ অব মিশন ইব্রাহীম আলাহমারি।