তুষারধসের পর হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া প্রায় ১০০ মিটার উঁচু পানির ঢেউয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে নেপাল। চীনের তিব্বত অংশে তুষারধসের কারণে ভোটেকোশি নদীর একটি শাখা লহেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে যায়। পরে সেই বাধা ভেঙে বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, পাথর ও কাদা নেমে এসে তছনছ করে দিয়েছে নদীর তীরবর্তী জনপদ। এতে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৫৯ জন নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ১ হাজারের মতো মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে নেপাল পুলিশ।নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি পর্যটক ও নিরাপত্তাকর্মীরাও রয়েছেন।
বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুওয়াগাড়ির কাছে তিমুরে প্রথম আঘাত হানে ভয়াবহ এই পানির স্রোত।সেখানে শত শত মানুষের বসতি ছিল। কোনো বৃষ্টিপাত না থাকায় স্থানীয়রা এমন দুর্যোগের কোনো পূর্বাভাসও পাননি।ফলে মানুষ যখন নিজেদের দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত ছিলেন, তখনই উজান থেকে পানির বিশাল ঢেউ ধেয়ে আসে।
রাসুওয়ার প্রধান শুল্ক কর্মকর্তা রাজেন্দ্র ধুঙ্গানা জানান, সকালে মাটি কাঁপতে দেখে তিনি প্রথমে ভূমিকম্প হয়েছে বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু বাইরে বেরিয়ে তিনি দেখতে পান, উজান থেকে ধোঁয়ার মতো কিছু সঙ্গে নিয়ে প্রায় ১০০ মিটার উঁচু পানির দেয়াল বাজারের দিকে ধেয়ে আসছে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তিমুরে বাজার এলাকা পানির নিচে চলে যায়।
পানির স্রোত থেকে বাঁচতে ধুঙ্গানা ও আরও কয়েকজন কাছের জঙ্গলে আশ্রয় নেন। এ সময় সীমান্তের শুল্ক চৌকিতে অপেক্ষমাণ তিন শতাধিক ট্রাক ও পণ্যবাহী যানও স্রোতে ভেসে যায়।
পরে স্রোত স্যাফ্রুবেশি ও ভাটির দিকে ছড়িয়ে পড়লে নদীর দুই তীরের প্রায় সবকিছুই এর পথে পড়ে। মানুষ, গবাদিপশু, বাড়িঘর, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা ভেসে যায়। নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিখোঁজদের মধ্যে ৩৯১ জন বিদেশি এবং ৪৪ জন নিরাপত্তাকর্মী রয়েছেন।
বন্যায় নয়টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের নয়টি শাখা ধ্বংস হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে ১৯টি যান চলাচলযোগ্য সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার মহাসড়ক পানির স্রোতে ভেসে গেছে। বেসরকারি ও সরকারি সম্পদের মোট ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এখনো করা সম্ভব হয়নি।
নিখোঁজ মানুষের বিপুল সংখ্যা এবং ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা বিবেচনায় বুধবারের এই বন্যাকে নেপালের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী দুর্যোগগুলোর একটি বলে মনে করছেন নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা। এমনকি এটি ১৯৯৩ সালের ভয়াবহ বন্যার পর দেশটির সবচেয়ে বড় দুর্যোগ হয়ে উঠতে পারে। ওই বন্যায় সারলাহী, রাউতাহাট ও মাকওয়ানপুরে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছিলেন।
নুওয়াকোটের বিদুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের চেয়ারম্যান রবীন্দ্র নেপাল জানান, সোলে থেকে আক্কারে বাজার পর্যন্ত কয়েক শ বাড়ি বন্যায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অনেকে নিরাপদে যেতে পারলেও বহু প্রবীণ ও শিশু এখনো নিখোঁজ। যোগাযোগব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তিনিও পৌর ভবনে আটকা পড়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা গোকার্ণ অধিকারী জানান, তার গ্রামে প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। পরিচিত অধিকাংশ মানুষেরই খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু বাড়ি দাঁড়িয়ে থাকলেও সেগুলো কাদা ও ধ্বংসাবশেষে পুরোপুরি ঢেকে গেছে।
একই নদীতে গত বছরও ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। গত বছরের ৮ জুলাই লহেন্দে নদীর বন্যায় অন্তত ১১ জন নিহত হন এবং বিভিন্ন এলাকায় সড়কের অংশ ভেসে যায়। নেপাল ও চীনকে সংযুক্ত করা মিতেরি সেতুও তখন পানির স্রোতে ভেসে গিয়েছিল। তবে গত বছরের ধ্বংসযজ্ঞ কাটিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার আগেই এবার আরও ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে।
কর্তৃপক্ষ বলছে, আকস্মিক বন্যার বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য ও আগাম সতর্কবার্তা না থাকাই এবার এত বেশি প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির অন্যতম কারণ। তিব্বত থেকে বন্যার সূত্রপাত হলেও নেপালের রাসুওয়া জেলা প্রশাসন আগে থেকে এ বিষয়ে কোনো তথ্য পায়নি।
নেপালের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক মূল্যায়নেও তুষারধসের বিষয়টি উঠে এসেছে। প্ল্যানেট ল্যাবসের উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে তারা জানিয়েছে, রাসুওয়াগাড়ি সীমান্ত চৌকি থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে তিব্বতের অংশে তুষারধসের কারণে লহেন্দে নদীতে বিপুল ধ্বংসাবশেষ নেমে আসে। ২৫ ও ২৬ আগস্টের উপগ্রহচিত্রে তুষারধস এবং এর পরবর্তী বন্যার চিত্রও দেখা গেছে।
দুর্যোগের পর নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগ এবং চীনের আবহাওয়া প্রশাসনের কর্মকর্তারা বুধবার বিকেলে ভার্চুয়াল বৈঠক করেন। পরে চীন নেপালকে জানিয়েছে, সীমান্তের ওপারে নদীর পানির প্রবাহ বাড়তে শুরু করলে তারা দ্রুত নেপালকে তথ্য দেবে।
নেপাল ও চীনের মধ্যে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও জরুরি সাড়া দেওয়ার বিষয়ে আগে থেকেই একটি সমঝোতা রয়েছে। ২০১৯ সালে তৎকালীন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রদীপ গিয়াওয়ালির চীন সফরের সময় দুই দেশের স্বরাষ্ট্র ও জরুরি ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই হয়। এতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলা, তথ্য বিনিময়, প্রশিক্ষণ, দুর্যোগ পর্যবেক্ষণ এবং ঝুঁকি হ্রাস প্রকল্প বাস্তবায়নের মতো নয়টি ক্ষেত্রে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছিল।
তবে বুধবারের বিপর্যয় দেখিয়ে দিয়েছে, কাগজে সমঝোতা থাকলেও বাস্তবে সীমান্ত পেরিয়ে দ্রুত সতর্কবার্তা দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি।
নেপালের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগের জ্যেষ্ঠ জলবিদ বিনোদ পারাজুলি জানান, বুধবার সকাল ৮টা ৫৬ মিনিটে তারা বন্যার তথ্য পান। রাসুওয়া জেলা প্রশাসন ও জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তথ্যটি তাদের কাছে পৌঁছায়। তথ্য পাওয়ার মাত্র চার মিনিটের মধ্যে তারা ভাটির এলাকার জন্য সতর্কবার্তা পাঠান। কিন্তু ততক্ষণে বন্যার পানি রাসুওয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় পৌঁছে গেছে।
ভোটেকোশি নদীর উজানে স্থাপন করা স্বয়ংক্রিয় বন্যা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলোও পানির স্রোতে ভেসে গেছে। সাধারণত নদীর পানির উচ্চতা বাড়তে শুরু করলে এসব কেন্দ্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্কবার্তা পাঠায়। কিন্তু এবার বন্যা এত দ্রুত ও শক্তিশালী ছিল যে সতর্কবার্তা পাঠানোর আগেই কেন্দ্রগুলো ধ্বংস হয়ে যায়।
পারাজুলি বলেন, রাসুওয়ায় সময়মতো সতর্কবার্তা দিতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। তবে নুওয়াকোটসহ ভাটির এলাকার মানুষকে সতর্ক করা সম্ভব হয়েছিল। এর ফলে সম্ভবত কয়েক শ মানুষ প্রাণে বেঁচেছেন।
দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন বিপর্যয় ঠেকাতে হিমালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাস্তব সময়ের তথ্য সংগ্রহের জন্য সেন্সর, ক্যামেরা ও উন্নত পর্যবেক্ষণব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। তবে বিপদের উৎস যদি সীমান্তের ওপারে হয়, তাহলে শুধু নেপালের নিজস্ব সতর্কবার্তা ব্যবস্থা দিয়ে এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তুষারধস বা অন্য কোনো বিপজ্জনক ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে সেই তথ্য দুই দেশের মধ্যে আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
এদিকে কর্তৃপক্ষ ভাটির এলাকায় সতর্কবার্তা পাঠানোর দাবি করলেও উত্তর্গয়া গ্রামীণ পৌরসভার বাসিন্দাদের অনেকেই সময়মতো সেই সতর্কতা পাননি। স্থানীয় শিক্ষক সোমলাল দাঙ্গোল জানান, বন্যার পর শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসতে যাওয়া একটি স্কুলবাসেরও এখন পর্যন্ত খোঁজ পাওয়া যায়নি। বেত্রাবতী ও সোলে বাজারও পুরোপুরি পানির স্রোতে ভেসে গেছে।
তিনি বলেন, ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ যে কী ঘটেছে, তা বোঝার মতো অবস্থায়ও মানুষ নেই।
তথ্যসূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট, বিবিসি ও আল জাজিরা