মিশিগানের ডেমোক্র্যাটদের প্রাথমিক নির্বাচনে চমক দেখিয়ে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন আবদুল এল সাইদ। সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বামপন্থী মতাদর্শের এই রাজনীতিবিদ আগামী নভেম্বরে মিশিগান থেকে সিনেটর পদে নির্বাচন করবেন।নির্বাচনে জয়ী হলে তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর।
অগাস্টের শুরুতে ডেমোক্র্যাটদের মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার পর বিজয় ভাষণে নিজের পরিবারের অতীতের গল্প তুলে ধরেন আবদুল এল সাইদ।তিনি বলেন, তার কাজিনদের মতো তারও মিশরে ট্যাক্সি চালক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইতিহাসের এক দুর্ঘটনায় তার বাবা যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েটে অভিবাসী হয়ে আসেন এবং তিনি আমেরিকান হিসেবে পরিচিতি পান।
তবে মিশরীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান বা মুসলিম রাজনীতিবিদ হওয়াই তাকে আলোচনায় আনার একমাত্র কারণ নয়। তার রাজনৈতিক অঙ্গীকার, ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান এবং বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনীতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন বন্ধের দাবি তাকে মিশিগানের ডেমোক্র্যাটদের মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে দেয়।
তার নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম প্রধান বক্তব্য ছিল-রাজনীতি থেকে অর্থ সরিয়ে মানুষের পকেটে ফিরিয়ে দেওয়া এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ ভোটারদেরও আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেন তিনি।
ইসরায়েলসহ যেকোনো দেশের সেনাবাহিনীতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নের বিরোধিতা করেছেন এল সাইদ। ইসরায়েলের সেনাবাহিনীকে অর্থ সহায়তা দেওয়াকে তিনি মার্কিন করের অর্থ ব্যবহারের সবচেয়ে খারাপ দিকগুলোর একটি হিসেবে সমালোচনা করেছেন।
দলীয় নেতৃত্বের সমর্থন ছাড়াই উত্থান
মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় ধরনের সমর্থন পাননি আবদুল এল সাইদ। এ কারণে তাকে ‘বহিরাগত’ হিসেবেও পরিচিত হতে হয়েছে।
তবে বামপন্থী রাজনীতির অনুসারী এল সাইদকে সমর্থন দিয়েছেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রভাবশালী বামপন্থী নেতা বার্নি স্যান্ডার্স ও আলেক্সান্দ্রিয়া ওসারিও-কর্টেজের মতো নেতারা।
আগামী নভেম্বরে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সিনেটর পদের নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের মুখোমুখি হবেন এল সাইদ। মাইক রজার্সকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
রাজনীতিতে যেভাবে উঠে এলেন
একচল্লিশ বছর বয়সী আবদুল এল সাইদকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বহিরাগত বলা হলেও মূলধারার রাজনীতিতে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ শুরু হয় ২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে।
সেবার তিনি পরাজিত হলেও মোট ভোটের ৩০ শতাংশের বেশি পেয়েছিলেন। ওই নির্বাচনেও তার প্রধান অঙ্গীকার ছিল সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং রাজনীতিতে বড় বড় পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানের অর্থের প্রভাব কমানো।
ধারণা করা হয়, রাজনীতিতে আসার প্রাথমিক অনুপ্রেরণা তিনি পেয়েছিলেন ২০০৭ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সঙ্গে সাক্ষাতের পর।
ওই বছরের এপ্রিলে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিল ক্লিনটন। সেখানে শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী হিসেবে বক্তব্য দেন আবদুল এল সাইদ। তার বক্তব্যের প্রশংসা করেন ক্লিনটন। পরে তিনি আলাদাভাবেও এল সাইদের সঙ্গে দেখা করে তার প্রশংসা করেন।
এর প্রায় এক দশক পর, ২০১৭ সালে মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনে লড়ার ঘোষণা দেন এল সাইদ। নির্বাচনে অংশ নিতে তিনি ডেট্রয়েট শহরের জনস্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালকের পদ ছাড়েন।
২০১৫ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সে ডেট্রয়েটের জনস্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বড় শহরে এমন পদে দায়িত্ব নেওয়া সবচেয়ে কম বয়সী ব্যক্তিদের একজন ছিলেন এল সাইদ। দায়িত্ব পালনের সময় শিশু মৃত্যুহার কমানো, শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে চশমা দেওয়া এবং শতাধিক স্কুলে সীসার মাত্রা পরীক্ষা করার মতো বেশ কিছু উদ্যোগ নেন তিনি।
এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যেও ব্যাপক সমর্থন পান এল সাইদ।
ইসরায়েল ইস্যুতে স্পষ্ট অবস্থান
চলতি বছরের এপ্রিলে মিশিগানের প্রাথমিক নির্বাচনে প্রার্থিতা ঘোষণার পর আবারও আলোচনায় আসেন এল সাইদ। প্রচারণায় নিজেকে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো একজন শ্রমজীবী নেতা হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। একই সঙ্গে ইসরায়েলপন্থী অর্থদাতা ও দলীয় রাজনীতির প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হন।
তার এমন অবস্থানের কারণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে আক্রমণ করেন।
মিশিগানের ডেমোক্র্যাটদের মনোনয়ন জয়ের পর ট্রাম্প বলেন, এল সাইদ ইহুদিদের ভালোবাসেন না এবং ইসরায়েলকে ঘৃণা করেন।
তবে এ ধরনের সমালোচনার জবাব দিয়েছেন এল সাইদ। মিশিগানের ইহুদি ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছেন, তিনি তাদের ঠিক ততটাই নিরাপত্তা দিতে চান, যতটা নিরাপত্তা তিনি তার দুই মেয়ের জন্য চান।
ইসরায়েলকে অর্থায়নের বিরোধিতা
বিশ্লেষকদের মতে, মিশিগানের ডেমোক্র্যাটদের প্রাথমিক নির্বাচনে এল সাইদের জয় পাওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ইসরায়েল ইস্যুতে তার অবস্থান।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ এবং ইসরায়েলকে অর্থায়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক নিয়ে তার অবস্থানের কারণে মিশিগানের ইহুদি সম্প্রদায়ের একাংশ তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। আবার অন্য একটি অংশ তার বিরোধিতাও করেছে।
তার প্রতিদ্বন্দ্বী হেইলি স্টিভেন্সের নির্বাচনী প্রচারণার অর্থের বড় একটি অংশ এসেছে ইসরায়েলপন্থী আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির কাছ থেকে। হেইলি স্টিভেন্সও ইসরায়েলকে কোনো শর্ত ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
অন্যদিকে এল সাইদ ইসরায়েল, মিশর, সৌদি আরব, পাকিস্তান, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারসহ বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনীকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নের বিরোধিতা করেছেন।
তার বক্তব্য, মার্কিন নাগরিকরা কর দেন দেশের রাস্তা, স্কুল ও জনসেবায় অর্থ ব্যয় করার জন্য; অন্য দেশের সেনাবাহিনীকে ট্যাংক বা অস্ত্র কেনার অর্থ জোগাতে নয়।
ট্রাম্পবিরোধী ভোটও বড় শক্তি
ইসরায়েল ইস্যুর পাশাপাশি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির সমালোচনাও এল সাইদকে ভোটারদের কাছে জনপ্রিয় করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরের কর্মকাণ্ডে যারা অসন্তুষ্ট, তাদের একটি অংশ এল সাইদকে সমর্থন করেছে।
এক সাক্ষাৎকারে এল সাইদ বলেন, মাইক রজার্স ও ট্রাম্পবাদের বিরুদ্ধে তারা ঐক্যবদ্ধ। ভবিষ্যতে ট্রাম্পকে জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি এমন একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের লক্ষ্য রয়েছে, যিনি গণতন্ত্রের মূলনীতিতে বিশ্বাস করেন এবং মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে চান।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি আরও বলেছিলেন, যারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখোমুখি হতে সক্ষম একজন সিনেটর চান, তাদের জন্য তিনি সেই প্রার্থী।
মিশিগানের জয় বদলে দিতে পারে ডেমোক্র্যাটদের রাজনীতি
আবদুল এল সাইদের সম্ভাব্য বিজয় শুধু মিশিগান নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আগামী নভেম্বরে সিনেট নির্বাচনে এল সাইদ জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার নজির গড়বেন তিনি। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দেওয়া মিশিগান ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে চলে এলে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ক্ষেত্রেও দলটি বড় সুবিধা পেতে পারে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, মিশিগানে এল সাইদের জয় হলে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য ডেমোক্র্যাটরা মধ্যপন্থী নেতাদের বদলে বামপন্থী চিন্তাধারার প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করতে পারে। ফলে এল সাইদের এই উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি