দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও ভয়াবহ ঋণ কেলেঙ্কারিতে ডুবতে বসা ব্যাংকবহির্ভূত চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে (এনবিএফআই) সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অকার্যকর’ ঘোষণা করে প্রশাসক বসিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন’ অনুযায়ী নেওয়া এই পদক্ষেপে প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতকারীদের সুরক্ষার বিষয়টি আমলে নেওয়া হলেও, দুশ্চিন্তায় রয়েছেন পুঁজিবাজারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা।
এর কারণ হলো, আইনি প্রক্রিয়ায় এসব কোম্পানির নিট সম্পদ মূল্য ঋণাত্মক দেখিয়ে শেয়ারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সমস্ত পাওনা বা বিনিয়োগ শূন্যে নামিয়ে আনার প্রস্তুতি চলছে।
গত ৯ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ সভার নির্দেশনার আলোকে রেজল্যুশনের আওতায় আনা এবং প্রশাসক নিয়োগ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড, এফএএস (ফাস) ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এই তিন প্রতিষ্ঠানের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শত কোটি টাকারও বেশি পুঁজি সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। শুধু আভিভা ফাইন্যান্স লিমিটেড পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুশাসনের অভাব, স্বজনপ্রীতি এবং বেনামি ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ভিত্তি ভেঙে পড়েছে। সিংহভাগ ঋণই আজ খেলাপি ও আদায় অযোগ্য।আমানতকারীদের টাকা বা বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ তো দূরের কথা, স্বাভাবিক কার্যক্রম বা দৈনন্দিন খরচ চালানোর সক্ষমতাও হারিয়েছিল প্রতিষ্ঠানগুলো। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক এগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশাসক নিয়োগ করতে বাধ্য হয়।
আইন অনুযায়ী কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংক যখন রেজল্যুশন বা অবসায়নের প্রক্রিয়ায় যায়, তখন প্রথমে পাওনাদার ও আমানতকারীদের দায় মেটানো হয়। পুঞ্জীভূত ক্ষতি এবং ঋণের বোঝা এত বেশি যে, মোট সম্পদ দিয়ে দায়দেনা মেটানোর পর শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোনো পজিটিভ নেট অ্যাসেট ভ্যালু অবশিষ্ট থাকে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অকার্যকর’ ঘোষণা করায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ ঝুঁকিপূর্ণ এই কোম্পানিগুলোর শেয়ার কেনাবেচা স্থগিত করে দিয়েছে, ফলে বিনিয়োগকারীরা চাইলেও শেয়ার বিক্রি করে বের হতে পারছেন না। আইনি প্রক্রিয়ায় পরিশোধিত মূলধন এবং সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের অংশ সমন্বয় করায় বিনিয়োগ পুরোপুরি শূন্যে নেমে আসছে। এতে করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। কষ্টার্জিত অর্থ শূন্যের মধ্যে চলে আসায় হতাশা প্রকাশ করেছেন তারা।
এর আগেও শরিয়াহভিত্তিক ৫টি ব্যাংক একীভূত হলে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়। আবার এর সঙ্গে নতুন করে আরো তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান যুক্ত হলো। বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাদের মতে, ‘অপরাধ করেছে পর্ষদ, সাজা ভোগ করছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা।’ কেন?-এই প্রশ্ন এখন লাখো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর। তারা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদী লভ্যাংশ বা নিরাপদ আয়ের আশায় বৈধ উপায়ে শেয়ার কেনা সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আইনি মারপ্যাঁচে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। ব্যাংক খাতের একীভূতকরণের সময়ও সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের কোনো সুরক্ষা দেওয়া হয়নি। এনবিএফআই খাতের এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘অকার্যকর’ ঘোষণার ক্ষেত্রেও একই ধারায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সম্পূর্ণ উপেক্ষিত রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, ‘একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের দায় কোনোভাবেই শুধু সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপর চাপানো গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা চাই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও দায়ের পূর্ণাঙ্গ, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন হোক এবং শেয়ারহোল্ডারদের প্রকৃত অবস্থান স্পষ্ট করা হোক।’
বছর শেষে ভালো লভ্যাংশের আশায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত মৌলভিত্তি সম্পন্ন শেয়ার হিসাবে স্বীকৃত ব্যাংক বা আর্থিক খাতের কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করে থাকে। অথচ বর্তমানে একের পর এক এই খাতের বিনিয়োগকারীদের শেয়ার শূন্য ঘোষণা হচ্ছে, বিনিয়োগ ফেরত না দিয়ে বিনিয়োগকারীদের রাস্তায় বসিয়ে দিচ্ছে। যেখানে কোম্পানিগুলো অব্যবস্থাপনা, মালিক পক্ষের স্বেচ্ছাচারিতার বিচার হওয়া মূল পদক্ষেপ হওয়া দরকার ছিল। সেখানে বিনিয়োগকারীদের বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে। এমতাবস্থায় বিনিয়োগকারীদের পুঁজি রক্ষায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নিয়ে অতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত পরিষদের সভাপতি আ ন ম আতাউল্লাহ নাঈম।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যেখানে সুশাসনহীনতা ও দুর্নীতিই পতনের মূল কারণ, সেখানে অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত না করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শাস্তি দেওয়া অন্যায়। এভাবে বারবার বিনিয়োগকারীদের পুঁজি শূন্য করা হলে ভবিষ্যতে কেউ আর দীর্ঘমেয়াদী বা মৌলিক শেয়ারে বিনিয়োগ করতে সাহস পাবে না বলেও তারা মনে করেন।
অন্যদিকে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সংকটে থাকা এসব প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন বা অবসায়নের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন বলেও তারা আশা প্রকাশ করেন।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ‘অকার্যকর’ ঘোষিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বেশি শেয়ার রয়েছে ফাস ফাইন্যান্সে। এই প্রতিষ্ঠানে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানা ৭৯ দশমিক ২২ শতাংশ। অন্যদিকে, উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের শেয়ার মাত্র ১৩ দশমিক ২ শতাংশ শেয়ার। বাকি ৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে। এই প্রতিষ্ঠানটি অকার্যকর হওয়ায় এর প্রায় ৮০ শতাংশ মালিকানা থাকা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পুঁজি শূন্য হয়ে যাচ্ছে।
ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ক্ষেত্রেও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশ ৪৪ দশমিক ৪২ শতাংশ। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে আরও ১৪ দশমিক ০৩ শতাংশ শেয়ার। অন্যদিকে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে ৪১ দশমিক ৫৫ শতাংশ শেয়ার। ফারইস্ট ফাইন্যান্সে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা ৪৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশ ১৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে রয়েছে ৩৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ শেয়ার। এই বিপুল সংখ্যক শেয়ারধারী বিনিয়োগকারীরা এখন অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বলে জানা গেছে।